ভূতুড়ে বাড়ি বরেলি রেক্টোরির এক করুণ ইতিহাস - প্রিয়লেখা
ভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরি

ভূতুড়ে বাড়ি বরেলি রেক্টোরির এক করুণ ইতিহাস

প্রিয়লেখা.কম
Published: March 23, 2018

‘ ভূতের বাড়ি ’ কিংবা ‘ ভূতুড়ে বাড়ি ’এই দুটো শব্দ শোনার সাথে সাথে শরীরটা একটুও ছমছম করে ওঠে না, এমন দুঃসাহসীদের জন্য এই লেখা নয়। এই লেখাটি আমার মতো সাহসীদের জন্য, যাদের অপার্থিব বিষয়ের একটু আঁচ পেলেই মেরুদণ্ড বেয়ে গড়িয়ে পড়ে শীতল ধারার স্রোত। সাথে সাথে হয়ত আপনার মনে এটিও চলে আসতে পারে, ভূতুড়ে আখ্যানের সাথে করুণ ইতিহাসের সম্পর্কটা ঠিক কোথায়? জমবে কি? চলুন , আর কথা না বাড়িয়ে জেনে আসি গ্রেট ব্রিটেনের সেরা ভূতুড়ে বাড়ি সম্পর্কে ।

ভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরি (Borley Rectory)

গ্রেট ব্রিটেনের এমন কোন রহস্যপ্রিয় মানুষ নেই, যিনি ভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরি সম্পর্কে জানেন না । স্টউর নদী বিধৌত ইংল্যান্ড এর পূর্বাঞ্চলের এক ছোট্ট প্রদেশ, এসেক্স। এই এসেক্সের মাঝেই ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বরলি নামক গির্জার পাশে হল রোডের প্রান্ত ঘেঁষে রেক্টোরি নির্মিত হয়েছিল । গির্জার প্রধান পুরোহিত বা যাজককে রেক্টোর বলা হয় এবং তার বাসভবন রেক্টোরি। এই বাসভবনটি নির্মাণ করেন রেভারেন্ড হেনরি ডাওসন এলিস বুল ।

ভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরি

মহারাণী ভিক্টোরিয়ার আমলের এই বাসভবন  নির্মিত হয়েছিল ১৮৬৩ সালে। গথিক স্থাপত্যবিদ্যার সাথে ভিক্টোরিয়ান স্থাপত্যশৈলীর অনুপম মিশেলে বাসভবনটির নকশা করেছিলেন অগাস্টাস পুগিন। পুগিন মশাইয়ের তো আর জানা ছিল না যে তার হাড়ভাঙা পরিশ্রমের ফসলের কপালে জুটবে কালিমার ছাপ? বরলির নামেই দেয়া জুড়ে দেয়া হবে ইংল্যান্ডের ইতিহাসে সবচেয়ে ভয়ানক বাড়ির তকমা? আর তিনি বোধহয় বাসভবনটির নকশা করার আগে এই জায়গাটির চাঞ্চল্যকর এবং রোমহর্ষক ইতিহাসকেও আমলে নেননি।

মি . অগাস্টাস পুগিন এর করা বরলি রেক্টোরির নীচতলার নকশা

মি . অগাস্টাস পুগিন এর করা বরলি রেক্টোরির নীচতলার নকশা

একটু পেছন থেকেই শুরু করা যাক । ভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরির  ইতিহাস নিয়ে ঘাঁটতে গেলে সর্বাধিক পুরনো যে ঘটনাটি পাওয়া যায় তার সময়কাল ১০৬৬। বরলি রেক্টোরি এখন যে জায়গায় অবস্থিত, সেখানে একটি খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ছিল। রেক্টোর এ. সি. হ্যানিং এর মতে,  সেটি ছিল কাঠের তৈরি। তলদেশে সুড়ঙ্গ এবং ব্যাংকের ভল্টরুম এর মতো ঘর ছিল । কালের বিবর্তনে ত্রয়োদশ শতাব্দীতে কাঠের তৈরিউপাসনালয়ের জায়গা দখল করে একটি আধুনিক উপাসনালয়।চারপাশে তত্ত্বাবধায়কের বাসভবন এবং অন্যান্য দালানও ছিল ।

ক্যালেন্ডারের পাতা বদলে আসে ১৩৬২ সাল । তখনকার বেনেডিক্টাইন সন্ন্যাসীরা এ জায়গাটিতে একটি মঠ স্থাপন করেছিল। মঠের এক সন্ন্যাসীর সাথে প্রায় ৭ মাইল দক্ষিণ-পূর্বের এক সন্ন্যাসীনির প্রণয় হয়। তৎকালীন রক্ষণশীল সমাজে তাদের এই প্রণয়ের কোনো গ্রহণযোগ্যতা যে নেই , তা তারা নিজেরাও জানতেন । তবে প্রেম একবার হয়ে গেলে তা কি কোন কিছু মানে ? ইতিহাস সাক্ষী – মানে না । তারা দুজন নিজেদের সামাজিক অবস্থান খুব ভাল করেই জানতেন। সামাজিক অবস্থান থেকে দূরে চলে এলে জীবন একটি অনিশ্চিত দোলাচলে দুলতে থাকবে, সেটিও বেশ ভালোই বুঝতে পেরেছিলেন।তবে ভালোবাসার এই আবেগের সাথে জীবন সংশয় ছিল তুচ্ছ। মরিয়া হয়ে উঠেছিলেন তারা। ঠিক করলেন, দুজন পালিয়ে যাবেন। এমনকি সে সন্ন্যাসীর এক গাড়োয়ান বন্ধু পর্যন্ত রাজি হয়ে যায় তাদের পালানোর পরিকল্পনায় সাহায্য করতে। কিন্তু ভাগ্য সহায় ছিল না। তাদের পালানোর পরিকল্পনা বয়োজ্যেষ্ঠ সন্ন্যাসীরা আগেই টের পেয়ে গিয়েছিলেন এবং হাতেনাতে ধরার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত ছিলেন। ফাঁকি দিতে পারলেন না। ধরা পড়ে গেলেন।গাড়োয়ান বন্ধুকে করা হল শিরঃশ্ছেদ। সন্ন্যাসীকে নির্মমভাবে ঝুলিয়ে মারা হলো । সবচেয়ে ভয়ানক শাস্তিটা দেয়া হল সন্ন্যাসীনিকে । মাটির তলদেশে থাকা ভল্টরুম এর একটিতে তাকে নিয়ে গিয়ে জ্যান্ত ইট তুলে গেঁথে দেয়া হলো। তারপর থেকেই যেন সব দুর্গতির সূচনা ।

এই ভয়াবহ ঘটনা বেশিদিন ধামাচাপা থাকেনি । আস্তে আস্তে তা  মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ে । সাধারণ মানুষ ভয়ে আতঙ্কে এই জায়গাটির আশে পাশে ঘেঁষতে চাইত না। সে যাই হোক, পরবতীতে ১৮৬২ সালে যখন রেভারেন্ড হেনরি ডাওসন এলিস বুল এখানকার রেক্টোর হয়ে এলেন, তখন তিনি  ভগ্নদশায় থাকা উপাসনালয়কে নতুন করে সাজানোর জন্য অগাস্টাস পুগিনকে দায়িত্ব দিলেন । অগাস্টাস পুগিন এই স্থাপনা বানাতে সময় নিলেন ১ বছর । সময়ের সাথে সাথে অনেক কিছু বদলে গেলেও সব কিছু যে বদলে যায়নি তার প্রমাণ রেক্টোরির বাসিন্দারা কয়েক দিনের মধ্যেই পেতে শুরু করলেন।

ভূতুড়ে বাড়ি রেক্টোরিতে বসবাস করতে থাকা বাসিন্দারা প্রায়ই বিভিন্ন রকমের ব্যাখ্যাতীত ঘটনার সামনে পড়তে লাগলেন । রেক্টোরিতে বসবাসরত ধর্মোপদেষ্টা এবং তাদের পরিবারবৃন্দ ঘটনাগুলো আঁচ করতে পারলেও এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন । সত্য কি আর এড়িয়ে যাওয়া যায় ? অবশেষে ১৮৮৫ সালে রেক্টোরিতে একটি কাজে এসে পি. শ্য. জেফ্রি নামের এক ভদ্রলোক কিছু অলৌকিক ঘটনা প্রত্যক্ষ করেন এবং সবাইকে জানিয়ে দেন । একই বছর কলচেস্তার গ্রামার স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষক এক সন্ন্যাসীনিবেশী ছায়াকে একাধিকবার প্রত্যক্ষ করেন। এছাড়াও রেক্টোরিতে বসবাস করতে থাকা বাসিন্দারা বিভিন্ন রকমের ভৌতিক কার্যকলাপ এর সামনে পড়তে লাগলেন । সবচেয়ে তাদের উপদ্রব করত যে বিষয়টি, তা হলো, রাতের খাবার খাওয়ার সময় তারা দেখতে পেতেন যে ডাইনিং রুম এর জানালা দিয়ে এক সন্ন্যাসীনি মলিন মুখে তাদের দিকে তাকিয়ে রয়েছে । এই বিষয়টি এতটাই সমস্যা সৃষ্টি করতে শুরু করল যে এক সময় জানালাটি ইট তুলে গেঁথে দিতে বাধ্য হলেন তারা।

ভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরিভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরিভূতুড়ে বাড়ি বরলি রেক্টোরিসেই অভিশপ্ত জানালা ক্রস দিয়ে চিহ্নিত করা হয়েছে  ইট তুলে গেঁথে দেবার পর

দিন যেতে লাগল । ১৮৯২ সালের ৭ই মে বরলিরেক্টোরির “ Blue Room “ খ্যাত ঘরে রেভারেন্ড হেনরি ডাওসন এলিস বুল মারা যান । তার স্থলাভিষিক্ত হন তার ছেলে রেভারেন্ড হ্যারি । এর পরবর্তী উল্লেখযোগ্য ঘটনা ১৯০০ সালের ২৮ শে জুলাই। সেদিন হেনরি ডাওসনের তিন মেয়ে একসাথে একটি ভয়ানক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন। তারা দেখেন,সন্ন্যাসীনির বেশে বীভৎস এক মহিলা রেক্টোরির পশ্চাৎ ভাগের সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে ।রেভারেন্ড হ্যারিও বেশ কিছু ভয়ানক দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেন । এক সময় রেভারেন্ড হ্যারি বলতে শুরু করেন যে তার নাকি আত্মার সাথে যোগাযোগ হয়। ১৯২৭ সালের ৯ জুন রেভারেন্ড হ্যারি রহস্যজনক ভাবে তার বাবার মতোই “ Blue Room “ এ মারা যান ।

বরলি রেক্টোরির Blue Room– বাবা ছেলের রহস্যজনক মৃত্যুর নীরবতম সাক্ষীবরলি রেক্টোরির Blue Room– বাবা ছেলের রহস্যজনক মৃত্যুর নীরবতম সাক্ষী

হ্যারির রহস্যজনক মৃত্যুর পর বছরখানেক এই  ভূতুড়ে বাড়ি খালি পড়েছিল। ২রা অক্টোবর ১৯২৮ রেভারেন্ড এরিক স্মিথ সস্ত্রীক এসে উঠেন বরলি রেক্টোরিতে । এর পরপরই তারা ভৌতিক  অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হন । তারা শুনতে পান কেউ যেন তাদের কানে ফিসফিস করে বলছে “Don’t Carlos, don’t.”উল্লেখ্য,রেভারেন্ড হেনরি সাহেব এর ডাকনাম ছিল carlos . এছাড়াও জোরে ডোরবেল বেজে উঠা, ছোট ছোট নুড়ি পাথর ছুঁড়ে মারা, পদশব্দ শুনতে পাওয়া , চাবি হারিয়ে যাওয়া , হঠাৎ করে কোনো ঘরে বাতি জ্বলে উঠা ইত্যাদি নানা রকম আতঙ্কে ছিলেন এরিক দম্পতি।

১৯৩০ সালের অক্টোবর মাসে রেভারেন্ড লিওনেল ফয়েস্তার সস্ত্রীক এখানে এসে ওঠেন। ১৯৩০ থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত এখানে বহু বিচিত্র ঘটনা ঘটতে থাকে । সবচেয়ে রোমহর্ষক ঘটনা ছিল তাদের অবস্থানকালের শেষ দিকে। রেভারেন্ড লিওনেল ফয়েস্তার এর স্ত্রী মারিয়ানকে উদ্দেশ্য করে কিছু লেখা বরলি রেক্টোরির দেয়ালে দেয়ালে এবং অনেক সময় খালি সাদা কাগজের উপর উদয় হতে থাকে, যা আজ অবধি এক বিরাট রহস্য।

সাদা কাগজের উপর উদয় হতে থাকা কিছু লেখাসাদা কাগজের উপর উদয় হতে থাকা কিছু লেখা

১৯৩৫ সালে রেভারেন্ড লিওনেল ফয়েস্তার শারীরিক অবস্থার অবনতির দরুন তারা এখান থেকে চলে যান । ততদিনে মানুষের মুখে মুখে বরলি রেক্টোরির কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে । রেভারেন্ড লিওনেল ফয়েস্তার চলে যাওয়ার পর বিখ্যাত আধিভৌতিক বিশেষজ্ঞ হেনরি প্রাইস এবং তারদল এখানে এসেছিলেন ঘটনাগুলো সম্পর্কে গবেষণা করতে।তারা ও অনেক ব্যাখ্যাতীত ঘটনার সামনে পড়লেন, মাথামুণ্ডু কিছু খুঁজে পেলেন না। তারা চলে যাওয়ার পর ক্যাপ্টেন উইলিয়াম গ্রেগসন নামের এক ভদ্রলোক বরলি রেক্টোরি কিনে নেন । তিনি এবং তার পরিবার ছিল এখানে বাস করা শেষ পরিবার । ১৯৩৯ সালের ২৭ ফেব্রূয়ারী  ভয়াবহ এক অগ্নিকান্ডে এই ভবনটি মারাত্নকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় । যদিও শোনা যায় যে  ভুলবশত একটি তেলের ল্যাম্প ফেলে দিয়ে গ্রেগসনই অগ্নিকান্ডের সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। তবে আজ অবধি সে অগ্নিকান্ডের প্রকৃত কারণ কেউই জানে না।

অগ্নিকান্ডের পর বরলি রেক্টোরির ভগ্নদশাঅগ্নিকান্ডের পর বরলি রেক্টোরির ভগ্নদশা

অগ্নিকান্ডে এই ভবনটির গঠনবিন্যাস মারাত্নক ভাবে ব্যহত হয় । বহু বছরের বহু জমানো কষ্টের ভার এই  ভগ্নদশা যেন আর নিতে পারছিল না। অবশেষে ১৯৪৪ সালে এটি চূড়ান্তভাবে আত্মসমর্পণ করে । কালের সাক্ষী হয়ে যুঝতে থাকা বরলি রেক্টোরি বইতে পারেনি নিজের শরীরে জমে থাকা ইতিহাসের কালিমা ধূলিকণা। কী হয়েছিল সেখানে? আসলেই কি সেখানে বাস করত অতৃপ্ত কোনো আত্মা, নাকি সবই মর্ত্যের মানুষের চোখের ভ্রম? কে জানে কোনটা সত্য আর কোনটা মিথ্যে!