বৈরাম খাঁ: মৃত্যুই যার আত্মনিবেদনের পুরষ্কার - প্রিয়লেখা

বৈরাম খাঁ: মৃত্যুই যার আত্মনিবেদনের পুরষ্কার

Sanjoy Basak Partha
Published: October 7, 2017

মোঘল সম্রাট আকবরের জয়জয়কার দুনিয়াখ্যাত। মাত্র ১৩ বছর বয়সেই সিংহাসনে বসা এই সম্রাটের কীর্তির কথা স্বীকার করেছেন সকল ইতিহাসবিদই। তবে আকবরের এমন সাফল্যের পেছনে অবদান ছিল একজন নিবেদিতপ্রাণ পুরুষের, তিনি বৈরাম খাঁ। শুধু আকবরের শাসনামলের জন্যেই নয়, বৈরাম খাঁ বিখ্যাত হয়ে থাকবেন আকবরের পিতা সম্রাট হুমায়ূনের বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবেও।

বৈরাম খাঁর জন্ম ১৫০১ সালে আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশে। কারা কোনলু প্রদেশের বাহারলু তুর্কোমান গোত্রের অধিভুক্ত ছিলেন তিনি। প্রতিদ্বন্দ্বী গোত্র একে কোনলুদের দ্বারা পরাজিত হওয়ার পূর্বে কারা কোনলু গোত্র বেশ কয়েক দশক পশ্চিম পারস্য শাসন করেছে। বৈরাম খাঁর পিতা সাইফ আলী বেগ বাহারলু ও দাদা জানালী বেগ বাহারলু সম্রাট বাবরের কর্মচারী ছিলেন। বৈরাম খাঁর দাদার বাবা, পীরালি বেগ বাহারলু ছিলেন সম্রাট বাবরের স্ত্রী পাশা বেগমের ভাই।

পূর্বপুরুষদের মত বৈরামও ১৬ বছর বয়সে সম্রাট বাবরের কর্মচারী হিসেবে নিযুক্ত হন। ১৫২৭ সালে সম্রাট বাবর ও রাজপুত সৈন্যদের মাঝে রাজস্থানের ভরতপুর জেলার অদূরে খানওয়া গ্রামে অনুষ্ঠিত ‘খানওয়া’ যুদ্ধে বৈরাম খাঁ তাঁর বীরত্ব প্রদর্শন করেন। পানিপথের যুদ্ধের পর খানওয়া যুদ্ধ ছিল ভারতবর্ষের ইতিহাসে খুবই গুরুত্বপূর্ণ এক যুদ্ধ। মূলত এই যুদ্ধে জয়ের মাধ্যমেই ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্যের গোরাপত্তন হয়। এছাড়া ১৫২৯ সালে বাবর ও সুলতান মাহমুদ লোদির মধ্যকার ‘ঘাগড়া’ যুদ্ধেও অংশ নেন বৈরাম।

বাবরের কর্মচারী হিসেবে শুরু করলেও বৈরাম খাঁর মোঘল সাম্রাজ্যে তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রাখতে শুরু করেন বাবরপুত্র সম্রাট হুমায়ূনের শাসনকাল থেকে। হুমায়ূনের সেনাবাহিনীর অংশ হয়ে তিনি বেনারস, বাংলা ও গুজরাট দখলের অভিযানে অংশ নেন। হুমায়ূনের ভাইয়েরা, বিশেষ করে কামরান মীর্জা কয়েকবারই হুমায়ূনের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে হুমায়ূনকে শের শাহের হাতে তুলে দিতে চেয়েছিলেন। বৈরাম খাঁ সে বিপদে হুমায়ূনের একমাত্র নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন। শের শাহ যখন হুমায়ূনকে হটিয়ে দিল্লীর মসনদ দখল করে নেন, হুমায়ূন ও তাঁর পত্নী হাসিনা বানুর ছায়াসঙ্গী হয়ে ছিলেন এই বৈরাম খাঁ।

পারস্যতে সম্রাট শাহ তামাস্পের আশ্রয়ে থাকাকালীন সময়ে সম্রাট হুমায়ূনের একমাত্র পরম বিশ্বস্ত সঙ্গী ছিলেন বৈরাম খাঁ-ই। সম্রাটের ভাই কামরান মীর্জাকে নিজ বুদ্ধিমত্তায় পরাজিত করে কান্দাহার দুর্গ দখল করেন বৈরাম খাঁ। এরপর ১৫৫৬ সালে সম্রাট হুমায়ূন যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন সিকান্দর শাহের বিশাল বাহিনীকে বলতে গেলে একা হাতে পরাজিত করে দিল্লীতে মোঘল সাম্রাজ্যের পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন বৈরাম খাঁ। এই যুদ্ধে বৈরাম খাঁ ব্যর্থ হলে হয়তো আর কখনোই ভারতবর্ষে মোঘল সাম্রাজ্য অধিষ্ঠিত হতে পারত না।

সম্রাট হুমায়ূন যখন মৃত্যুবরণ করেন, তাঁর একমাত্র উত্তরাধিকারী শিশুপুত্র আকবর তখন কেবল তের বছরের এক নাবালক। মারা যাওয়ার আগে তাই হুমায়ূন নিজে ঘোষণা দিয়ে বৈরাম খাঁকে আকবরের অভিভাবক নিযুক্ত করে যান, এবং এও বলে যান, যতদিন না সিংহাসনে বসার উপযুক্ত হবেন আকবর, ততদিন আকবরের পেছনে থেকে মোঘল সাম্রাজ্য পরিচালনা করবেন বৈরাম খাঁ ই।

সম্রাটের এই বিশ্বস্ততার প্রতিদান ভালোভাবেই দিচ্ছিলেন বৈরাম খাঁ। কিন্তু আকবরের মাতা হাসিনা বানু ও সম্রাট আকবরের আমীরদের মনে সম্রাট হুমায়ূনের দিয়ে যাওয়া এই সিদ্ধান্ত বিরুপ প্রভাব ফেলে। হাসিনা বানু নিজেই সন্দিহান ছিলেন, বৈরাম খাঁ আদৌ কোনোদিন তার পুত্র আকবরের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবেন কিনা। বৈরাম খাঁর বীরত্ব একেবারে কাছ থেকে দেখা হাসিনার আশঙ্কা ছিল, প্রতাপশালী বৈরাম হয়তো আকবরকে তার হাতের পুতুল বানিয়ে রেখে নিজেই সাম্রাজ্য দখল করে নেবেন।

আদতে বৈরাম খাঁয়ের মনে এমন কোন দুরভিসন্ধি ছিল না। তিনি চেয়েছিলেন আকবরকে সিংহাসনের যথাযোগ্য উপযুক্ত করে গড়ে তুলে তাঁর হাতে ক্ষমতা তুলে দেবেন। কিন্তু সে সুযোগ কিংবা সময় কোনটাই তিনি পাননি। বৈরাম খাঁকে ক্ষমতা থেকে দূরে রাখবার জন্য আকবর কৌশলে বৈরাম খাঁকে বয়স হয়েছে বলে বিশ্রামে যাওয়ার প্রস্তাব করেন। শুধু তাই নয়, বিশ্রাম নেয়ার জন্য ভারতবর্ষ নয়, বরং বৈরাম খাঁকে মক্কা যেতে হবে বলেও জানিয়ে দেন আকবর। সম্রাটের আদেশ মেনে নিয়ে মক্কা রওনা হন তিনি। কিন্তু আকবর তাঁর ‘পথের কাটা’ কে একেবারেই নিশ্চিহ্ন করে দিতে চাইছিলেন। মক্কা যাওয়ার পথে তাই সম্রাটের প্রেরিত গুপ্তঘাতকের হাতেই মৃত্যু হয় মোঘল সাম্রাজ্যের এই নিবেদিতপ্রাণ সেবকের।

বৈরম খাঁয়ের যে ক্ষমতা দখলের কোন উদ্দেশ্য ছিল না, তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধ। সম্রাট হুমায়ূনের মৃত্যুর এক বছর না ঘুরতেই দিল্লী দখল করে বসেন আদিল শাহ সুরীর মুখ্যমন্ত্রী হিমু। আকবরের তখনো যুদ্ধ জয়ের মত দক্ষতা কিংবা অভিজ্ঞতা কোনটাই ছিল না। বৈরম খাঁ তাই নিজ দায়িত্বে পানিপথের দ্বিতীয় যুদ্ধে জয়লাভের মাধ্যমে দিল্লীর গদি আবার মোঘলদের হাতে ফেরত আনেন।

বৈরাম খাঁর বিশ্বস্ততা ও নৈপুণ্যের জন্য সম্রাট হুমায়ূন তাঁকে সর্বোচ্চ সম্মান ‘খান-ই-খানান’ এ ভূষিত করেন, যার অর্থ ছিল রাজাদের রাজা। বৈরম খাঁয়ের নামের ‘খাঁ’ অংশটিও একটি উপাধি, যেটি দিয়েছিলেন পারস্যের অধিপতি শাহ তামাস্প। বংশগতভাবে তাঁর নাম বৈরম বেগ ই ছিল।

যার সাহস, বিচক্ষণতা এবং বুদ্ধিমত্তা ছাড়া মোঘল সাম্রাজ্য হয়তো আর কখনো প্রাণ ফিরে পেত না, সেই বৈরাম খাঁকেই কিনা প্রাণ দিতে হয়েছিল তাঁর নিজের লোকের হাতেই। সম্রাট আকবরের আলোকিত শাসনকালে সবচেয়ে বড় কলঙ্কের দাগও বোধহয় এটিই!