বাঙালির প্রথম সার্কাস অভিযান – সাহস ও দেশপ্রেমের এক আশ্চর্য সংমিশ্রন - প্রিয়লেখা

বাঙালির প্রথম সার্কাস অভিযান – সাহস ও দেশপ্রেমের এক আশ্চর্য সংমিশ্রন

Ranju Prasad Mandal
Published: November 20, 2017

সময়টা উনিশ শতকের শেষভাগ বা বিশ শতকের শুরুতে। স্থান কলকাতার গড়ের মাঠ। আলো ঝলমলে সার্কাসের তাবু দর্শকের ভিড়ে ফেটে পড়ে প্রায়। বিশেষ আসনে বসে আছেন সম্মানীয় অতিথিরা। চারিদিকে ভিড় করে থাকা উৎসুক দর্শকের মধ্যে লালমুখো গোরা সাহেবদের সংখ্যাও খুব কম নয়। ক্ল্যারিওনেট ও আরো নানাবিধ বাদ্য বাজছে বহুক্ষণ। এবার সে আওয়াজ মৃদু হল। খেলা শুরুর ঘন্টা বাজল। আর সাথে সাথেই রঙ্গমঞ্চে আবির্ভাব হল একদল অশ্বারোহীর। প্রশিক্ষিত ঘোড়াদের নিয়ে শুরু হল তাদের নানারকম খেলা। আরে সমস্ত খেলোয়ারই যে বাঙালি! এমনকি লাগাম ছাড়াই ঘোড়ার খেলা দেখানো ওই শ্যামতনু মহিলাদ্বয়ও যে নিখাদ বঙ্গতনয়া! মনে রাখবেন আপনি পিছিয়ে গেছেন প্রায় ১৫০ বছর। আপনি দেখছেন প্রোফেসর প্রিয়নাথ বসুর ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’-এ।

প্রিয়নাথ বসু (Wikimedia.org)

কর্মবিমুখ, পরিশ্রমবিমুখ বলে বাঙালির দুর্নাম বহুদিনের। কিন্তু কিছু কিছু মানুষের কর্মোদ্যোগ সেই দুর্নামের মুখে এক একটি সজোর চপেটাঘাত। তেমনই একজন মানুষ হলেন প্রিয়নাথ বসু। তাঁর জন্ম ১৮৬৫ সালে। পিতার নাম মনমোহন বসু। মনমোহন বসু ছিলেন বিখ্যাত কবি ও নাট্যকার। তাঁর বহু গান সে সময় ন্যাশনাল থিয়েটারে গাওয়া হত। স্বদেশী ভাবধারার একজন অন্যতম প্রচারকও ছিলেন তিনি। প্রিয়নাথ ছিলেন মনমোহন বসুর কনিষ্ঠ পুত্র। স্বদেশী ভাবধারার উন্মেষ ও সুস্থ সবল বাঙালি সমাজ তৈরির উদ্দেশ্যে সেই সময় গৌরহরি মুখোপাধ্যায় কলকাতার বিভিন্ন এলাকায় ব্যায়াম ও জিমন্যাস্টিকের আখড়া তৈরি করেন। প্রিয়নাথ বসু ছিলেন তারই ছাত্র। পরবর্তীতে বহু আখড়ার দায়িত্বও নেন তিনি। সেখান থেকেই প্রিয়নাথের মনে জন্ম নেয় ‘বাঙালির সার্কাস’-এর স্বপ্ন। প্রথাগত পড়াশোনায় মন নেই দেখে মনমোহন ছেলেকে ভর্তি করে দেন আর্ট কলেজে। কিন্তু যার মনে শিকড় গেঁড়ে বসেছে সার্কাসের স্বপ্ন পড়াশোনা তাকে আটকাবে কি করে। কলকাতায় বিদেশী সার্কাসের দল এলেই ছুটে যান প্রিয়নাথ। আর একটু একটু করে বাড়তে থাকে স্বপ্নের পরিধি।

প্রিয়নাথ বসু ও তার গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের কিছু কুশীলব (Wikimedia.org)

বাঙালির প্রথম সার্কাস শুরু হয় নবগোপাল মিত্রের হাতে। তবে সেখানে একটি ঘোড়া ও দুই একজন সদস্য নিয়ে কিছু জিমন্যাস্টিকের খেলাই দেখানো হত। নবগোপাল মিত্রের জামাই রাজেন্দ্রলাল সিংহ ১৮৮৩ সালে কিছু বিদেশি খেলোয়ারের সাহায্যে শুরু করেন ‘গ্রেট ইন্ডিয়ান সার্কাস’। তবে তা ছিল মূলত বিদেশি জিমন্যাস্টদের খেলা। এই সময়েই সীমিত মূলধন, অসীম সাহস, অনেক স্বপ্ন আর সার্কাসের প্রতি ভালোবাসা সম্বল করে ঘর ছাড়লেন প্রিয়নাথ। ছোট্ট দল নিয়ে বাংলার ছোট ছোট জমিদার বাড়িতে খেলা দেখিয়ে জমানো পুঁজি নিয়ে কলকাতায় ফিরে আরো কিছু সদস্য জড়ো করে ১৮৮৭ সালে শুরু করলেন ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’। জন্ম হল বাঙালির নিজস্ব সার্কাসের। বাংলার বিভিন্ন প্রান্তে সাফল্যের সাথে খেলা দেখিয়ে বেড়ালেন তারা। ১৮৮৮ সালে রংপুরে তাজহাট জমিদার বাড়িতে খেলা দেখিয়ে প্রাপ্য টাকার উপরে পেলেন প্রচুর উপঢৌকন। এবার বিপুল উদ্যমে বাংলার সীমা অতিক্রম করলো প্রিয়নাথ বসুর দল। লাহৌর, করাচি, রাওয়ালপিন্ডি, বোম্বাই, গোয়ালিয়র অবিভক্ত ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে শুরু হল তাদের সদর্প পদচারণা। ১৮৯৬ সালে রেওয়া-এর মহারাজা তাদের খেলায় খুশি হয়ে উপহার দেন একজোড়া বাঘ। তাদের নাম দেওয়া হল লক্ষ্মী ও নারায়ণ। অবিলম্বে গ্রেট বেঙ্গলের অন্যতম আকর্ষন হয়ে উঠল বাঘের খেলা। সার্কাসের অন্যতম খেলোয়ার ছিলেন বাদলচাঁদ। বাঘেরা ছিল তার নিতান্ত পোষ মানা। খাঁচার ভিতর ঢুকে রীতিমতো ‘বাঘের সাথে কুস্তি’ জুড়ে দিতেন তিনি। এমনকি খেলার শেষে সম্মিলিত দর্শকের আর্ত চিৎকারকে উপেক্ষা করে বাঘের মুখে ঢুকিয়ে দিতেন নিজের মাথা!

গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস দলের বিখ্যাত জিমন্যাস্টিকের খেলা (Wikimedia.org)

এ সার্কাস দলের অন্যতম আকর্ষণ ছিলেন ‘সুশীলাসুন্দরী’। তিনি ছিলেন সার্কাসের দলে খেলা দেখানো প্রথম ভারতীয় মহিলা। বাঙালি মেয়ে মাত্রই অবগুন্ঠিতা- এ অপবাদ তিনি দূর করেন। সুশীলাসুন্দরী এবং তার বোন কুমুদিনী দুজনেই গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসে খেলা দেখাতেন। তিনি খালি হাতে বাঘের খাঁচায় ঢুকতেন এবং নানা রকমের কসরত দেখাতেন। এছাড়া ট্র্যাপিজ ও জিমন্যাস্টিকের খেলা দেখাতেও তিনি ছিলেন বিশেষ পারদর্শী। জীবন্ত সমাধিস্থ হওয়ার আর একটি বিপজ্জনক খেলাও সে সময় খুব জনপ্রিয়তা অর্জন করে। সুশীলাসুন্দরীর খ্যাতি সেই সময়ে এতই বৃদ্ধি পেয়েছিল যে সবসময় ভারতীয়দের নিন্দা করা ‘ইংলিশম্যান’ পত্রিকার সম্পাদকও লিখতে বাধ্য হন- ‘হিন্দু স্ত্রীলোকদিগের দুর্নাম যে তাঁহারা বড় ভীরু, কিন্তু এই সুশীলাসুন্দরী একগাছি ছড়ি পর্যন্ত না লইয়া, নির্ভয়ে ব্যাঘ্র-বিবরে প্রবেশপূর্ব্বক দুইটি বাঘের সহিত খেলায় এরূপ অমিত সাহসের পরিচয় দেন, যে তাহা দেখিলে সত্যই চমকিত হইতে হয়।’ কিন্তু এই বাঘের খেলাই তার মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। দুটি বাঘের একটি মারা যাওয়ার পর ‘ফরচুন’ নামের নতুন একটি বাঘকে নিয়ে খেলা দেখানো শুরু করেন সুশীলা। কিন্তু তার আঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হন তিনি। অবশেষে মাত্র ৪৫ বছর বয়সে ১৯২৪ সালে মৃত্যু বরণ করেন তিনি।

সুশীলাসুন্দরীর বিখ্যাত বাঘের খেলা (Scroll.in)

শুধু বাদলচাঁদ বা সুশীলাসুন্দরীই নন, এ দলের সম্পদ ছিলেন আরো অনেকে। তা সে হাতির পিঠে বসে বাঘের খেলা দেখানো মৃন্ময়ীই হোন বা চোখে রুমাল বেঁধে ঘোড়ার পিঠে অবলীলায় লাফ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়া বিখ্যাত জকি মন্মথনাথ দে। বুকে পেতে রাখা তক্তার ওপর হেঁটে যাওয়া হাতীর ভার অবলীলায় সহ্য করে নেওয়া ভবেন্দ্রমোহন সাহা বা ব্যাক ফ্লাইং এবং ডবল সমার্সল্টে বিখ্যাত জিমন্যাস্ট পান্নালাল বর্দ্ধনের কথাই বা কেমন করে ভোলা যায়। তবে শুধু জিমন্যাস্টিক বা বিভিন্ন হিংস্র পশুর খেলাই নয় এ দলের বিশিষ্টতা ছিল জাদুকর গণপতি চক্রবর্তীর নানারকমের জাদুর খেলাতেও। ভারতীয় ম্যাজিশিয়ানদের জগতে গণপতি চক্রবর্তী এক বিশিষ্ট নাম। তার ‘ইলিউশন বক্স’, ‘ইলিউশন ট্রি’ অথবা তাসের নানারকমের খেলার জনপ্রিয়তা ছিল প্রবাদপ্রতীম।

জাদুকর গণপতি চক্রবর্তী (tulikolom.com)

কিন্তু সর্বোপরি এ দলের মূল চালক ছিলেন প্রিয়নাথ বসু। তিনি শুধু একজন অসামান্য জিমন্যাস্ট ও শিক্ষকই ছিলেন না ছিলেন স্বদেশিকতার একজন অসামান্য পূজারী ও প্রচারক। বাঙালিদের আত্মশক্তিতে অনুপ্রাণিত করা ছিল তার অন্যতম উদ্দেশ্য। তাই খেলার মাঝে তিনি স্বদেশপ্রেমের উদ্দীপনামূলক একটি বক্তৃতা দিতেন এবং তার শেষে গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করতেন ‘বন্দেমাতরম’। সাথে সাথে সমস্ত তাবু গর্জে উঠত সহস্র দর্শকের ‘বন্দেমাতরম’ ধ্বনিতে। এই সার্কাসের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেতে থাকে দ্বিগুন, চতর্গুণ হারে। হিন্দু পেট্রিয়ট পত্রিকায় গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস সম্মন্ধে লেখা হয় -The Circus is indeed the pride of the Bengalees . ভারতের সীমানা ছাড়িয়ে জাভা, মালয়, সুমাত্রা, ব্রক্ষ্মদেশ পর্যন্ত খেলা দেখায় প্রিয়নাথ বসুর দল। প্রিয়নাথ বসু তার সার্কাস দলের প্রথম দিকের যাত্রার বেশ কিছুটা লিখে গেছেন ১৯০২ সালে প্রকাশিত ‘প্রোফেসর বোসের অদ্ভুত ভ্রমণ বৃত্তান্ত’ বইতে।

সংবাদপত্রে প্রকাশিত গ্রেট বেঙ্গল সার্কাসের বিজ্ঞাপন (Twitter)

অসীম সাহসী এই উদ্যোগী বাঙালি প্রিয়নাথ বসুর মৃত্যু ঘটে বাংলা থেকে অনেক দূরে সিঙ্গাপুরে ১৯২০ সালের ২১শে মে। নিজের সার্কাসের দল নিয়ে সেখানেই ছিলেন তিনি। সেখানেই জন্ডিসে আক্রান্ত হয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আক্ষরিক অর্থেই তিনি ছিলেন সার্কাসের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। তার মৃত্যুর সাথে সাথেই দলীয় বিবাদ, মালিকানা সমস্যা ইত্যাদির প্রভাবে ভেঙ্গে যায় ‘গ্রেট বেঙ্গল সার্কাস’। শেষ হয়ে যায় বাঙালির সার্কাস তথা উদ্যমশীলতার এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তথ্যসূত্রঃ
১। ‘বাঙালীর সার্কাস’, অবনীন্দ্রকৃষ্ণ বসু, গাঙচিল।
২। শার্দূলসুন্দরী, শীর্ষ বন্দ্যোপাধ্যায়, আনন্দ পাবলিশার্স।
৩। এ বার বাঘের খেলা, অময় দেব রায়, আনন্দবাজার পত্রিকা।