নেতৃত্বের গুণাবলী কী করে অর্জন করবেন? - প্রিয়লেখা

নেতৃত্বের গুণাবলী কী করে অর্জন করবেন?

ahnafratul
Published: February 21, 2018

দিকপ্রদর্শক কিংবা পথপ্রদর্শক যাই বলুন না কেন, সবাই একজন নেতার অপেক্ষায় থাকে। দুর্দশা, খারাপ অবস্থা থেকে কাটিয়ে ওঠার জন্য চাই একজন যোগ্য নেতাকে। খেলার মাঠে মাশরাফির নেতৃত্বকে বলুন কিংবা রাজনীতির মাঠে চৌকস নেতাকে, সকলেই চায় একজন যোগ্য নেতার ছায়াতলে থেকে সামনে এগিয়ে যাবার, বাঁধা বিপত্তিকে কাটিয়ে ওঠার। প্রশ্ন হচ্ছে, একজন নেতা তাহলে কীভাবে গড়ে উঠতে পারেন? একটা সত্য কথা হচ্ছে, শিখিয়ে পড়িয়ে কিংবা কোর্স করে কেউ নেতা হতে পারবেন না। আমাদের চারপাশে আমরা নানা ধরনের কোর্সের সুযোগ পাই। সাত দিনে চৈনিক ভাষা শিক্ষা, একমাসে ইংরেজীতে দক্ষ হয়ে ওঠা ইত্যাদি সম্পর্কিত নানা ধরনের বই বাজারে রয়েছে। চোখ বন্ধ একবার ভাবুন তো! এক সপ্তাহে নেতা হয়ে ওঠার সহজ উপায় কিংবা কী করে নেতা হবো- এই ধরনের কোনো বই চোখে পড়েছে কী না? পড়ে নি, তাই তো? বিভিন্ন দেশের খ্যাতিমান নেতৃবৃন্দের দিকে তাকিয়ে দেখুন। মানুষকে সামনে পথ প্রদর্শন করা কিংবা তাদেরকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবার চিন্তা ছিল তাদের রক্তের মাঝেই। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ক্যারিশম্যাটিক একজন নেতা, যার বজ্রকন্ঠের ডাক শুনে এদেশের মানুষ নির্দ্বিধায় ছুটে গিয়েছিল অন্যায়ের প্রতিবাদে নিজেদের দাবী আদায়ের লক্ষ্যে।
জন সি ম্যাক্সওয়েলের একটি কথা রয়েছে। তা হচ্ছে, ‘একজন নেতাকে অবশ্যই মানুষের কাছাকাছি যেতে হবে। তবে তাদেরকে অনুপ্রাণিত করবার লক্ষ্যে যেতে হবে বহুদূর।’


তাহলে কীভাবে নেতা হওয়া যায়, এর কোনো উপায়ই কি নেই? উপায় নেই, তবে সামান্য কিছু ধারণা হয়তো আপনাকে দেয়াই যায়, যা নিয়ে মনের মুকুরে একটু হলেও ভাবনা চিন্তা করতে পারবেন নিজের সম্পর্কে। আপনি সত্যই নেতা হয়ে ওঠার যোগ্য কি না বা আপনার মাঝে সে গুণাবলী রয়েছে কিনা, সেটি নিয়েই আজকের প্রিয়লেখায় সামান্য আয়োজন-
বাঁধা বিপত্তি কাঁধে তুলে নিতে আগ্রহী?

শুধুমাত্র নেতা হয়ে অন্যের ওপর ছড়ি ঘোরালেই আপনার দায়িত্ব শেষ হয়ে যাবে না; বরং অন্যের জন্য নিজেকে কতটা ঝুঁকির মুখে ফেলতে আপনি রাজী আছেন, সেটি দেখতে হবে। অন্যায়ের বিরোধিতা করতে গেলে কিংবা সংকটমুখর পরিস্থিতি থেকে উদ্ধার পাবার জন্য আপনাকে নিতে হতে পারে অনেক কঠিন সিদ্ধান্ত, অনেক বড় বড় ঝুঁকি। এই ঝুঁকিগুলো নিজের কাঁধে বইবার মতো ভার আছে তো?

ভয়কে জয় করতে হবে ভালোবাসা দিয়ে
ভালোবাসা কেবলমাত্র প্রেয়সীর প্রতিই না, ভালোবাসা থাকতে হবে কাজের প্রতি। ভালোবাসা থাকতে হবে নিজের সহকর্মীদের প্রতি এবং যেখানে কাজ করেন, সে জায়গার প্রতি। কর্মমুখর একটি পরিবেশে কাজ করতে গেলে অনেক সময়ই আপনার ওপর আসতে পারে নানা ধরনের ভয়। হুমকির জন্য কেউ আপনাকে আযত্ন লালন করে আসা কর্ম থেকে সরিয়ে দিতে পারে, নানা ধরনের অপবাদ দিয়ে করে দিতে পারে মুখকে চিরদিনের জন্য বন্ধ। এসবকিছুকে ভয় পেলে চলবে না, বরং ভালোবাসা দিয়ে সবকিছুকে জয় করে নিয়ে হবে। মহাত্মা গান্ধীর কথা ভাবুন। অন্যায়ের বিরোধিতা করবার জন্য তিনি কখনো অস্ত্র হাতে তুলে নেন নি। কেউ এক গালে মারলে অপর গাল এগিয়ে দাও- এই ধরনের শিক্ষাই তিনি দিয়ে এসেছেন মানুষকে আজীবন।

নেতা মানে কী?
আপনি একজন প্রতিষ্ঠানের নেতা বা একদল মানুষের নেতা। তারমানে এই নয় যে যা বলছেন, তাই মানুষ সবসময় মেনে নেবে। কখনো কখনো নেতার দেখানো পথও ভুল হতে পারে। সেক্ষেত্রে নেতার যোগ্য অনুসারীরাই বলে দিতে পারবে কোন পথে চললে বইতে পারে শান্তির সুবাতাস। নেতা হয়েছি বলে তালগাছটি সবসময় আমার- এমন মনোভাব থাকা কখনো উচিত নয়। সবসময় মানুষের কাছাকাছি অবস্থান করা উচিত। যদি অধস্তনদের সাথে একটা দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়, তাহলে ঐ নেতার পেছনে মানুষ বেশিদিন কাজ করতে চায় না।

সময় শেষ, নেতৃত্বও শেষ?
বিভিন্ন মৌসুমে বাজারে নানা ধরনের ফল ফলাদি ও শাকসবজি পাওয়া যায়। মানুষ এই খাবারগুলোর পেছনে রীতিমতো পয়সা খরচ করতে থাকে। আমের সময়ে আম, জামের সময়ে জাম, ফুলকপির সময়ে ফুলকপি। মৌসুম শেষ হয়ে গেলে কখনো এদের পেছনে মানুষের সাময়িক হাহাকার আর দেখা যায় না। জীবন জীবনের নিয়মে চলে। নতুন কিছুর সন্ধান করতে থাকে মানুষ। মনে রাখবেন, আপনি এই ফল কিংবা শাকসবজির মতো নন। বিপদ সাময়িকভাবে কেটে গেলে মানুষ যেন আপনাকে খুঁজে না পায়, এমন কাজ কখনো করবেন না। আসন্ন বিপদ কিংবা পরিস্থিতির মোকাবিলা করবার জন্য সবসময় নিজেকে তৈরি রাখবেন, প্রস্তুত করবেন। তাহলেই পাবেন মানুষের যোগ্য সম্মান।

লজ্জা পাচ্ছেন নিজেকে নিয়ে?
আমাদের চারপাশে এমন অনেক মানুষ রয়েছেন যারা নিজেকে নিয়ে লজ্জা পান, মেলে ধরতে পারেন না। ধরুন, অনেক বন্ধু নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন। বরাবরেই মতোই মুখচোরা বলে আপনি চুপচাপ সকলের কথা শুনছেন। এমন সময় কেউ একটি সমস্যা সামনে নিয়ে এলো। আপনি সমাধানটি জানেন। কিন্তু বলতে পারলেন না। ঠিক একইসময়ে আপনার ভাবনাটিই কেউ বলে দিয়ে বাহবা কুড়িয়ে নিল সকলের। এমন কখনো হয়েছে আপনার সাথে? নিজেকে নিয়ে আফসোস করেছেন? আমি বলব, সমস্যাটি আপনার। নিজেকে মানুষের সামনে প্রকাশ করুন, ভাবনাগুলো শেয়ার করুন। নেতা আপনি হতে না চাইলেও মানুষ আপনার কথাকে দাম দেবে, বিপদে আপদে পরামর্শ চাইতে আসবে। দেখতে দেখতে হয়ে উঠবেন সকলের ভরসা ও আস্থার প্রতীক।

অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দিন, সম্ভব হলে মেনে চলুন
বাঙালিদের নিয়ে একটি কথা প্রচলিত আছে। আমরা নাকি কেবল নিজেদের কথাকে প্রতিষ্ঠিত করতেই ব্যস্ত হয়ে যাই। অন্যের মতামতকে গুরুত্ব দিতে চাই না, দিতে জানি না। অনেকাংশেই কথাটি সত্য। তবে তাই বলে আপনি এই কথার পেছনে পড়ে থাকবেন কেন? সকলে আপনার মতামতকে গুরুত্ব দিচ্ছে। অবশ্যই এটি বাহবা পাবার মতো একটি কাজ। কিন্তু আপনিও তো ভুল হতে পারেন। মানুষের কাছে তখন নিজেকে বড় করে জাহির না করে ভুল স্বীকার করে নিন, অন্যের দেয়া মতামতকেও সমান গুরুত্বের সাথে মেনে নিতে শিখুন। মনে রাখবেন, আজকে যাদের সামনে আপনি নিজেকে নেতা মনে করছেন, তারাই কিন্তু নেতৃত্বের আসনে আপনাকে বসিয়েছে। তাদের ভাবনাকে মূল্য দিতে শিখুন।

বিষাক্ত পরিবেশকে মধুর করে তুলতে জানেন তো?
একবিংশ শতাব্দীর একজন নেতা হিসেবে অবিসংবাদিতভাবেই আপনার কাঁধে কিছু দায়িত্ব এসে যায়। এই দায়িত্বগুলো কিন্তু পূর্বপুরুষদের কাছে ছিল না। সময়ের সাথে সাথে আপনার কাঁধে এসে পড়েছে। বর্তমানের মানুষ অনেক বেশি যান্ত্রিক, অনেক বেশি প্রতিযোগিতামূলক। এদের সাথে টেক্কা দিয়ে চলতে হলে আপনাকে ভাবতে হবে এদের নিয়েই। বুদ্ধি, মানসিক বল ও প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এক ঝটকায় আপনাকে তুলে নিয়ে যেতে পারে শ্রেষ্ঠত্বের আসনে। কর্মমুখর বিষাক্ত পরিবেশটিকে নিজের যোগ্যতাবলে করে নিতে হবে হাসিমুখর, প্রাণচাঞ্চল্যে ভরপুর।

পরিশেষে বলতে হয়, কিছু কথার মাধ্যমে আপনি নেতা বনে যাবেন না। উপযুক্ত স্থান কাল পাত্রভেদে যদি আপনি নিজেকে প্রকাশ করতে পারেন, আপনার মাঝে লুকিয়ে থাকা প্রতিভা দেখাতে পারেন, ঠিক তখনি আপনার মাঝে আবির্ভূত হবে একটি শক্তিশালী স্বত্বা; যা আপনাকে পৌঁছে দেবে সফলতা ও মানুষের বিশ্বাসের দ্বারপ্রান্তে।