দুঃস্বপ্নে ঘেরা ব্রাজিলের স্বর্পদ্বীপ ‘লা দি কুইমাদা গ্রান্দে’ - প্রিয়লেখা

দুঃস্বপ্নে ঘেরা ব্রাজিলের স্বর্পদ্বীপ ‘লা দি কুইমাদা গ্রান্দে’

farzana tasnim
Published: November 4, 2017

আপনি যদি অফিডিওফোবিয়ায় আক্রান্ত হন, তবে নিঃসন্দেহে ধরণীতে আপনার জন্য সবচেয়ে ভংকর জায়গাটির নাম লা দি কুইমাদা গ্রান্দে। সাও পাওলো থেকে প্রায় ৯০ মাইল দূরে অবস্থিত এই দ্বীপটিতে আস্তানা গেড়েছে বিষধর সব সাপেরা। ওহ, বলা হয়নি অফিডিওফোবিয়া হলো সাপের ভয় থেকে সৃষ্ট হওয়া এক ধরনের ফোবিয়া। কাজেই আপনি যদি এই ফোবিয়ায় আক্রান্ত হন, অর্থাৎ আপনি যদি সাপের ভয়ে ভীত হন, তবে জীবনে আর যেখানেই যান না কেন, মনের ভুলেও লা দি কুইমাদা গ্রান্দে দ্বীপে পা রাখবেন না। স্থানীয়রাই দ্বীপটিকে ঘিরে এত আতংকগ্রস্ত থাকে যে গুজব রটে গেছে, এই দ্বীপে একবার যে যায় সে আর জ্যান্ত ফিরে আসতে পারে না। তাই ক্রমে ক্রমে দ্বীপটির নাম হয়ে গেছে ‘পৃথিবীর ভয়ংকরতম দ্বীপ’

বিজ্ঞানীদের মতে, ১১০ একরের দ্বীপটিতে প্রায় ৪,০০০ হাজার সাপ বাস করে। অর্থাত কম করে হলেও প্রায় প্রতি ছয় গজ পর পর একটি সাপ আপনার চোখে পড়তে বাধ্য। ওয়াল স্ট্রিট জার্নালে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই দ্বীপে সাপের পরিমাণ স্পেনের অধিবাসীদের প্রতিভার পরিমাণের চেয়ে অনেক বেশি!

লা দি কুইমাদা গ্রান্দের সাপগুলোকে শুধু সাপ বললে এক প্রকার অপমান করা হবে। দ্বীপটি আসলে গোল্ডেন ল্যাঞ্চহেডের স্বর্গ। বলে রাখা ভালো, সাপের জগতে গোল্ডেন ল্যাঞ্চহেডের মতো এমন বিষধর সাপ পৃথিবীতে খুব কমই আছে। স্মিথসোনিয়ানের মতে, পৃথিবীর অন্যান্য সাপের চেয়ে এর বিষ প্রায় পাঁচগুণ বেশি শক্তিশালী। গোল্ডেন ল্যাঞ্চহেডের কামড়ে যেকোনো আকৃতির প্রাণী ধরাশায়ী হতে বাধ্য। এক ঘণ্টার মধ্যে আক্রান্ত প্রাণীর মৃত্যু অনিবার্য, কেননা এখনো পর্যন্ত এই সাপের বিষের কোনো প্রতিষেধক আবিষ্কৃত হয়নি। এই বিষ মানুষের মাংস গলিয়ে ফেলার ক্ষমতা রাখে বলেও শোনা যায়।

পুরো দ্বীপে আর কোনো প্রাণী নেই। না একটি মানুষ, না অন্য কোনো প্রজাতির কোনো একটি প্রাণী। সারা দ্বীপ জুড়ে কিলবিল করে বেড়াচ্ছে খালি সাপ আর সাপ। তাই স্থানীয়রা দ্বীপটিকে ডাকে ‘আইল্যান্ড অফ স্নেক’ বলে। কিন্তু অতিথি পাখিরা তো আর সে কথা জানে না। কাজেই তারা যখন এখানে এসে গাছের ডালে আশ্রয় নেয়, সাথে সাথে গাছ বেয়ে উপরে উঠে শিকার ধরে ফেলে জনাব ল্যাঞ্চহেড। বিজ্ঞানীদের মতে, অভিযোজনের প্রক্রিয়ায় পাখি আর গাছ বেয়ে ওঠা পোকামাকড় শিকার করতেই গাছে ওঠা আয়ত্তে করে ফেলেছে দ্বীপের অধিবাসীরা।

ব্রাজিলের জনগণের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া গল্প অনুযায়ী লা দি কুইমাদা গ্রান্দে দ্বীপের সাপেরা ভিলেনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। সবচেয়ে প্রচলিত একটি গল্প অনেকটা এরকম- একবার এক জেলে মাছ ধরার নৌকা নিয়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর সময় লা দি কুইমাদা গ্রান্দে দ্বীপটিতে পাকা কলা দেখতে পেয়ে সেখানে কিছুক্ষণ জিরিয়ে নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। দ্বীপে নামার পরপরই সাপের কামড়ে নীল হয়ে যায় তার গোটা শরীর। এক ঘণ্টার মধ্যে তার সারা শরীর রক্তে ভেসে যায়। আর মৃতদেহ ভেসে ভেসে চলে আসে উপকূলে। তারপর থেকে স্থানীয়রা আর কখনো ওই দ্বীপে নামার সাহস করেনি।

পরবর্তীতে দ্বীপে লাইট হাউস নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়া হলে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে একটি দলকে পাঠানো হয় লা দি কুইমাদা গ্রান্দে দ্বীপে। সাপের কথা তারা শুনেছেন ঠিকই, কিন্তু গুজব ভেবে বাড়তি কোনো সতর্কতা অবলম্বন করার প্রয়োজন মনে করেননি। ফলে মারা পড়েন সবাই। এরপর এক দম্পতি দুই বাচ্চা নিয়ে সেখানে রাতযাপন করেন। পরদিন সকালে উদ্ধার করা হয় তাদের চারজনের মরদেহ। এই দুটি ঘটনার পর সরকারের পক্ষ থেকে স্বয়ংক্রিয় লাইট হাউসের ব্যবস্থা করা হয়। আর ১৯২০ সাল থেকে দ্বীপটিতে জনসাধারণের প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেয়া হয়েছে।

আজ থেকে ১১ হাজার বছর আগে মুল ভূখণ্ড থেকে দ্বীপটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার পরপরই সেখানে আধিপত্য বিস্তার করে সাপেরা। এখনো পর্যন্ত জারি আছে সেই প্রথা। ভয় পেয়েছেন? পাওয়াই স্বাভাবিক। কাজেই বিদেশে ঘুরতে যাওয়ার আগে ভেবেচিন্তে দেখুন কোনোভাবে আপনার যাত্রাপথ লা দি কুইমাদা গ্রান্দেতে গিয়ে পড়ে কিনা!