দশটি গাড়ির লোগো ও তার ব্র্যান্ডিং ডিজাইন - প্রিয়লেখা

দশটি গাড়ির লোগো ও তার ব্র্যান্ডিং ডিজাইন

Afreen Houqe
Published: March 9, 2020

গাড়ির নাম শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে উঠে একজন মানুষের বিলাসবহুল জীবন ,তার রুচি তার ব্যাক্তিত । মোটামুটি একটি গাড়ি অনেকসময় একজন মানুষের জীবনযাপন কেমন হতে পারে সেটি জানান দেয়। যেমন ল্যাম্বারগিনি ইতালিয়ান সুপারকার আর বিখ্যাত ব্র্যান্ড, আবার দৈনন্দিন জীবন যাপনে আমেরিকার কঠিন পরিশ্রমী মানুষের পছন্দ ফোরড, আর ব্রিটিশ বনেদি চলনে তাদের পছন্দ জ্যাগুয়ার।

এই ব্র্যান্ডগুলো থেকে অন্য ব্র্যান্ড কারে নিজেকে মানিয়ে নেয়া খুব কঠিন, এমনকি যদি কার কোম্পানি নিজেও পরিবর্তন আনে গাড়ির মডেলে বা নতুন ইন্ডাস্ট্রিতেও প্রবেশ করে তখনো। অধিকাংশ গাড়ির ইন্ডাস্ট্রিতে তাদের লোগো সবথেকে বড় ভূমিকা রাখে তাদের ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি তৈরি করতে। এমনকি কখনো কখনো কিন্তু শুধুমাত্র গাড়ির লোগোটিকেই সর্বাধিক প্রাধান্য দেয়া হয়ে থাকে, উদাহরণ তো চোখের সামনেই মার্সিডিজ বেঞ্জ যার লোগোটি সবসময় সব গাড়ির সামনেই তাদের ব্র্যান্ড আইডেন্টিটি বহন করে আসছে।

চলুন দেখি বিশ্বে শীর্ষে থাকা কিছু গাড়ির লোগো

 

মার্সিডিজ বেঞ্জ (Mercedes-Benz)

লিস্টে আমার কাছে সবার থেকে বেশী প্রিয় মার্সিডিজ বেঞ্জ। যদিও উল্লেখ করা সব কয়টিই আমার প্রিয় তবে মার্সিডিজ বেঞ্জ সবার থেকে একটু ভিন্ন অন্তত আমার দৃষ্টিতে। থ্রি পয়েন্টেড স্টার মার্সিডিজ বেঞ্জের লোগো অদ্ভুত এক আকর্ষণ , দেখলে অনেকটা এমন মনে হয় আকাশ পানি মাটি সবজায়গায় এই লাক্সারিয়াস গাড়ি শোভা বর্ধন করতে ব্যাস্ত। স্টার এর চারপাশে সার্কেল যদিও পরে যুক্ত করা হয় ,এই লোগোটি রেজিস্টার হয় ১৯০৯ সালে। মজার ব্যাপার হলও অনেকেই জানেন না মার্সিডিজ বেঞ্জের কিন্তু চার স্টার বিশিষ্ট একটি লোগো রেজিস্টার করা থাকলেও সেটি কখনো ব্যবহার হয়নি। গ্যাস ইঞ্জিন ফ্যাক্টরির টেকনিক্যাল ডিরেক্টর Gottlieb Daimler এর মাথায় সর্বপ্রথম এই স্টার ব্যবহারের আইডিয়াটি আসে। যখন সে এই কাজটি করতে শুরু করেন তখন সিটি পোস্টকার্ডে একটি বাড়ির সামনে তারা আঁকেন আর তার স্ত্রীকে বলেন একদিন এই তারাটি ইতিহাসে আমার ব্যবসার সাফল্যের জন্য তুলে ধরবে। যদিও মার্সিডিজ বেঞ্জ এর লোগোটি ১৯১৬ সালের দিকেই পরিবর্তন করা হয়েছিলো। সাম্প্রতিক সময়েই তারা লোগোর থেকে তাদের নামটি বাদ দিয়েছে, আর এই পরিবর্তন যেন তাদের নাইকি, অ্যাপেল, এডিডাস এর মতই জনপ্রিয় করে তুলেছে। অনেক অটোমোটিভ লোগোর মাঝে খুব সহজেই একদম সিম্পল স্টার লোগোটি সত্যি সুন্দর, এই লোগোর এলিগেন্স স্টাইল ব্র্যান্ডকে ফুটিয়ে তুলেছে।

 

ভক্সহল (Vauxhall)

 

জার্মান কোম্পানি অপেল (Opel) স্বীকৃত প্রাপ্ত ব্রিটিশ গাড়ি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান ভক্সহল, যা আমেরিকান “জেনারেল মোটরস” কর্পোরেশন এর মালিকানাধীন। এই প্রতিষ্ঠানের জন্ম  ১৮৫৭ সালে যদিও তারা মূলত কাজ করতো মেরিন ইঞ্জিন্স নিয়েই কিন্তু ১৯০৩ সালের পর থেকে তারা গাড়ি প্রস্তুতকরণ এর কাজটি শুরু করে। এই লোগোটি কিন্তু তাদের নতুন সংস্করণ নয় এই লোগোটি ডিজাইন করা হয় ১৯৯৮ সালে। আমার কাছে এই লোগোটি খুবই দৃষ্টিনন্দন এবং শৈল্পিক মনে হয় আর সাথে সরণীয় গ্রিফিন ভক্সহল ফ্ল্যাগ লোগোটিকে অন্য এক আইকনিক স্টাইল দিয়েছে। এই ভার্শনটি ১৯৮৯ সাল থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত ব্যবহৃত হয়েছে তবুও এর মাঝে পুরনো দিনের ভক্সহল ভেকটরা এর একটি প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠে। ওয়েল ব্যলান্সড আইকনিক বোল্ড লাল শেড আমার মতে এই ভার্শনটি সংস্করণ এর নতুন রূপ হিসেবে মন্দ নয়।

 

ফেরারি (Ferrari)

নিঃসন্দেহে বলা যায় ব্র্যান্ড লাক্সারি স্পোর্টস কারের তালিকায় শীর্ষে আছে ফেরারি। লোগোটি খেয়াল করেছেন কখনো? উল্লাস করতে থাকা একটি ঘোড়া দু পা উঠিয়ে আছে গর্বে। এনজো ফেরারি অবশ্য এই লোগোটির পেছনের গল্প বলেছেন।

“The horse was painted on the fuselage of the fighter plane of Francesco Baracca — a heroic airman of the first world war. In 1923, I met count Enrico Baracca, the hero’s father, and then his mother, countess Paulina, who said to me one day, ‘Ferrari, put my son’s prancing horse on your cars – It will bring you good luck’. The horse was, and still is, black, and I added the canary yellow background which is the colour of Modena.”

সবুজ  সাদা এবং লাল লোগোটির স্টপিং ব্যাজ হিসেবে ব্যাবহার হয়েছে তিনটি রং যার সাথে মিল রয়েছে ইতালিয়ান জাতীয় পতাকার। এটিকে একটি এক্সাম্পল হিসেবেও নেয়া যায় সবসময় টেকনিক্যাল রিকয়েরমেনট না থাকলেও একটি ডিজাইন এর এলিমেনট এ লোগোটির মেসেজ আপনাকে বুঝিয়ে দিতে পারে কার ব্র্যান্ড কতটা অপরিহার্য।

 

জ্যাগুয়ার (Jaguar)

লোগোটি দেখলেই এর গতি বিশ্বস্ততা আর ক্ষমতার প্রতিফলন দেখা যায়। বহু বছর ধরেই এই দ্র্যুত গতির গাড়ি তৈরি করছে ব্র্যান্ড জ্যাগুয়ার সাফল্যের সাথে। আর এই কারণেই একটি স্পষ্ট দিক তুলে ধরতে সক্ষম এই লোগো যে বিশ্বে তারা সবথেকে স্টাইলিশ দ্র্যুতগামি গাড়ি প্রস্তুত করছে। এই ভার্শন যুগ ধরে চলছে, যদিও ২০০২ থেকে ২০১২ তাদের আপডেটেট থ্রিডি লুক যুক্ত করেছে। এই ভার্শনে তারা জোর দিয়েছে দ্র্যুতগামি জ্যাগুয়ার এর প্রতি হাইলাইট করা হয়েছে টোন এবং গ্র্যাডিয়ানট লুক। আগের জ্যাগুয়ার লোগোটি এতটাই সাধারণ ছিলও দেখতে যে তাদের কার ব্র্যান্ড এর মেসেজটি ঠিক মত প্রকাশ হচ্ছিলো না। সাদাকালো আউটলাইন শেপ সাদামাটা ছিল। লোগোটি ততটা খারাপ না হলেও বার্তা বহন করতে সক্ষম ছিলোনা।

 

অডি (Audi)

 

ল্যাম্বারগিনি (Lamborghini)

 

যিনি যুক্ত ছিলেন মূলত এগ্রিকালচার ম্যানুফ্যাকচার ট্রাক্টর ইঞ্জিন এবং হিটার ১৯৪৯ সালে ল্যাম্বারগিনি প্রতিষ্ঠা করেন। একজন সফল ব্যাবসায়ি হিসেবে তিনি সবসময় ফেরারি ইঞ্জিনিয়ারিং এবং এঞ্জও সুপার কারের সাথে কাজ করতে চাইতেন, কিন্তু ফেরারি প্রতিষ্ঠাতা তার এই অফারটি ফিরিয়ে দেন। হতাশ Ferruccio Lamborghini একদল ইঞ্জিনিয়ার নিয়ে কাজ করা শুরু করেন আর প্রতিযোগিতায় নামেন দৈত্যাকার ইতালিয়ান ব্র্যান্ড ফেরারির সাথে। আর সেই মিলটি কিন্তু চোখে পরবে ল্যাম্বারগিনির লোগোটির দিকে তাকালেই। যেখানে ফেরারির লোগোতে উল্লসিত ঘোড়া ঠিক তেমন উদ্ধত এক মহিষ ল্যাম্বারগিনি লোগো। দুটি লোগো কন্টেন্ট কিন্তু ভীষণ এগ্রেসিভ দুটি শক্তিশালী প্রানির অবয়ব। আর এই লোগোতে ব্যাবহার করা হয়েছে সোনালি হলুদ আর কালো রং।দুজন প্রতিপক্ষের মুখোমুখি হবার প্রতিফলন কি এই লোগো? কিংবা এটি কি সিম্বল শুধুমাত্র যা নিজেদের ব্র্যান্ডকেই শুধুমাত্র উপস্থাপন করছে?

 

রেনলট (Renault)

১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও গাড়ির লোগোটির জন্ম ১৯২৫ সালে। রেনলট অবশ্য বহু লোগো পরিবর্তন করেছে, প্রতিষ্ঠার শুরু থেকে প্রতিষ্ঠাতার ইচ্ছানুযায়ী বেশ কিছু লোগো ব্যবহার করা হয়েছে। ১৯২৫ সালে ডায়মন্ড শেপ লোগোর সাথে তাদের নাম সংযোজন করা হয়। আজকের যে রেনলট লোগোটি আমরা দেখি সেটির সৃষ্টি কিন্তু ১৯৭১ সালে। আর এই লোগোটি তৈরি করেন বিখ্যাত হাঙ্গারিয়ান ফ্রেঞ্চ আর্টিস্ট Victor Vasarely।আশাবাদ,সাফল্য,আনন্দের প্রকাশ করার জন্যই এই লোগোতে হলুদ রঙটিকে প্রাধান্য দেয়া হয়েছে।

 

ফোরড (Ford)

১৯০৩ সাল থেকেই বেশ কয়েকবার লোগোটি পরিবর্তন করা হয়েছে। তবে মডার্ন টাইপোগ্রাফি ব্যবহারে সাবলীল ভাবে উঠে এসেছে এই লোগোটি। “Ford” লোগোটি এসেছে ফোরড এর প্রতিষ্ঠাতা Henry Ford এর সিগনেচার থেকে। ওভাল ব্লু শেপের মাঝে নামটি দৃষ্টিনন্দন ও মানানসই। স্বীকার করা ছাড়া উপায় নেই যুগের সাথে সাথে এই লোগোটি নিজের সাথে কয়েক জেনারেশন তাদের কার ব্র্যান্ডিং এর সাথে যুক্ত রাখতে সক্ষম। খুব সহজে চেনার মত লোগোটি আস্থা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবেই উঠে আসে সবার চোখে।

 

বেনটলে (Bentley)

ক্লাসিক ব্রিটিশ ম্যানুফ্যাকচারার এর আরেক নাম বেনটলে, বিলাসবহুল জীবনযাপনের প্রতিচ্ছবি। ইংল্যান্ড বেইসড বেনটলে মটরস এর জন্ম W. O. Bentley হাত ধরে ১৯১৯ সালে। যা ১৯৩০ সালে রোলস রয়েস এর কাছে লব্ধ হয়। কার লোগোটি দেখতে অনেকটা আকাশে উড়তে থাকা পাখির দুটি পাখা আর লেজ মাঝে ব্যবহার হয়েছে বেনটলের বি। ভিজুয়াল কিছু আপডেট ছাড়া বহু যুগ ধরেই লোগোটির মাঝে অন্য কোন পরিবর্তন আনা হয়নি। উড্ডীয়মান পাখার আইডিয়া থেকে ধারনা করা হয় গতি এবং চারুতার প্রকাশ এই লোগো। খুব সীমিত রঙের ব্যবহার লোগোটিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে, সাদা কালো এবং রুপালি রং ফুটিয়ে তুলেছে কার ব্র্যান্ড বেনটলের।

 

ভক্সওয়াগন (Volkswagen)

ভক্সওয়াগন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ভেহিক্যাল ম্যানুফ্যাকচারার এবং বিশ্বের বেস্ট সেলিং দশটি গাড়ির মধ্যে তৃতীয়। ভক্সওয়াগন জার্মান ভাষায় যার অর্থ “people’s car” , তাদের বর্তমান স্লোগান  “Das Auto” যার মানে (“The Car”)। একটি মুহূর্ত যদি আপনি তাকান লোগোটির দিকে দেখবেন প্রমিনেনট ভি এবং ডাব্লিউ একই সঙ্গে যুক্ত করা আছে। আসল সৌন্দর্য লক্ষ্য করা যায় এর ফর্ম যখন একটি আরেকটি শব্দের সাথে যুক্ত থাকে। একবার ভাবুন তো যদি দুটি অক্ষর আলদা ভাবে ব্যবহার করা হতো তাহলে কি লোগোটিকে এতটা আকর্ষণীয় লাগতো দেখতে? আরও অবাক করা বিষয় কিণ জানেন এই লোগোটি কিন্তু ডিজাইনার তৈরি করেনি। ভক্সওয়াগন এম্মবেলডটি তৈরি করেন Franz Reimspiess যিনি পেশায় একজন ইঞ্জিনিয়ার। তার আরেকটি পরিচয় তিনি ১৯৩০ সালে ব্যাটল ইঞ্জিন কে নিখুত ভাবে সম্পূর্ণ করেছিলেন।

 

লোগো ডিজাইন কি শুধু একটি বিশেষ শ্রেণীর জন্যই তৈরি হয় মার্কেটিং বা ব্র্যান্ডিং এর ক্ষেত্রে?

আপনার কি মনে হয় ? যেকোনো প্রোডাক্ট কে উপস্থাপন করবার আগে সে প্রোডাক্ট সম্পর্কে জেনে নিলে, তার নাম কাজ ব্যবহার এর ইতিহাস থেকেও আমরা মোটামুটি ধারনা করতে পারি লোগোটি কেমন হলে মানানসই হবে প্রতিষ্ঠানের সাথে। হোক না গাড়ির লোগো, একটি সফল ইন্ডাস্ট্রি উঠে আসবে একটি লোগোর মাধ্যমে আর সেজন্য তো একটু হলেও জ্ঞান থাকা চাই। আর একজন ডিজাইনার অবশ্যই এটি মাথায় রেখে কাজ করলে তার কাজ সহজ হবার সম্ভাবনা দিগুণ বেড়ে যায়।