ডোমিনোজ লোগোর ইতিহাস - প্রিয়লেখা

ডোমিনোজ লোগোর ইতিহাস

Afreen Houqe
Published: March 5, 2020

সারাবিশ্বে পরিচিত ব্র্যান্ড ডোমিনোজ, সেটি তার নামের থেকে লোগো দেখলেই বোঝা যায়।

কে ভেবেছিলো যে এত সাধারণ সিম্পল একটি লোগো এতটা বিখ্যাত হয়ে উঠবে সারাবিশ্ব জুড়ে?

এর স্বাদ এবং সার্ভিসের জন্যই এই লোগো এত জনপ্রিয় এবং বিখ্যাত আজ, যদিও ডোমিনোজ এর লোগোটিই মেইন সিম্বল যার জন্য সারা পৃথিবী জুড়ে আমরা চিনি ডোমিনোজ কে। ৮০ বছর ধরে গর্বের সাথে এই লোগো আমাদের যুক্ত রেখেছে তার সাথে, এটা কিন্তু অনেক বড় একটি সফলতা তাদের। প্রসিদ্ধ এই লোগো সম্পর্কে আজ জানবো, জানবো এর পেছনে থাকা গল্প এর বিখ্যাত হয়ে উঠার ইতিহাস।

তবে আমরা সব জানার আগে কিছু কথা বলবো এই কোম্পানিকে নিয়ে।

অনন্য এক নাম ডোমিনোজ

পৃথিবী জুড়ে বিখ্যাত হওয়ার মানে কিন্তু এই না যে কোম্পানি প্রশংসা পাবে সবার কাছে, বিশেষ করে সেটি যদি হয় ফুড ইন্ডাস্ট্রি। সেক্ষেত্রে আমরা বলতে পারি ম্যাকডোনাল্ড ফুড চেইন এর কথা যাকে পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি কোনার মানুষ এক নামেই চিনে। এই সফলতা পাওয়া কিন্তু মোটেও সহজ ছিলোনা।

ডোমিনোজ পিজ্জার গ্রাহক ক্রেতা তাদের এতটাই ভালবাসে যে কিছু বিশেষ কথা না জানলেই নয়।

১৯৬০ সালে মিশিগানে (Michigan) এ প্রতিষ্ঠিত হয় ডোমিনোজ। শুরুতে Tom Monaghan ও James Monaghan  দুজন মালিক মিলিত ভাবে শুরু করলেও আট মাস পর জেমস নিজের অর্ধেক অংশ নিয়ে আলাদা ভাবে ব্যাবসা শুরু করেন।

২০১৮ সালে ডোমিনোজ সারা পৃথিবীতে সবথেকে বড় পিজ্জা কোম্পানির স্বীকৃতি পায়।

১৯৯৩ সালে মাস্টার ফ্রাঞ্চাইজ কিনে নেয়া হয় ইউকে এবং আয়ারল্যান্ডে।

ইউকে এবং আয়ারল্যান্ড ডোমিনোজ  এর তৃতীয় বৃহত্তম মার্কেট তার আগের অবস্থানে রয়েছে ইউএস এবং ইন্ডিয়া। ৮৫ টি দেশে রয়েছে তাদের ১৬,৫০০ স্টোর ।

পিজ্জার সাথে ডোমিনোজ এর সম্পর্ক

সবার কাছেই কিন্তু সবার আগে এই প্রশ্নটি উঠে আসে। পরম্পরায়  ফ্রাঞ্চাইজ এই লোগোটিতে ডোমিনোজ নামটি সবসময় যুক্ত ছিল, এটিও তো একটু বলতে হয় কিভাবে এবং কথা থেকে এলো এই নামটি। এই নামটি কি প্রভাবিত করে লোগোটিকে?

সত্যি বলতে নামের সাথে এই লোগোর কোন সম্পর্ক নেই এটি ব্যবহার করা হয়েছে স্ত্র্যাটিজি হিসেবে।

দুই ভাই যখন ছোট আকারে রেসটুরেন্ট শুরু করেন সে জায়গার মালিকের নাম ছিল Dominick DiVarti । অবাক হবার কিছুই নেই এর নাম ছিলও DomiNick’s ।

১৯৬৫ এর দিকে টম দুটি রেসটুরেন্ট কিনেন কিন্তু সমস্যা হলও তিনি চাইছিলেন তিনটি রেসটুরেন্ট পিজ্জার ব্র্যান্ড হিসেবে একই নামে চেনা হোক। কিন্তু স্বাভাবিক ভাবেই উনার এই প্রস্তাবে রাজি ছিলেন না কেউ।

মজার ব্যাপার হল নামের আইডিয়াটি আসে রেসটুরেন্টের ইমপ্লইদের কাছ থেকে, একজন পিজ্জা ডেলিভারি বয় নামটির প্রস্তাব রাখে। আর সেখানেই ১৯৬৫ সালের দিকে DomiNick’s পরিবর্তিত হয়ে নাম করা হয়  Domino’s Pizza । আগের DomiNick’s এর নামের সাথে Domino’s Pizza নামটির মিল থাকায় পূর্ববর্তী অনেক গ্রাহকই তাদের চিনতে পারেন সে সময়। আরও বলতে হয় এই নামটির জন্যই আজ ব্র্যান্ড লোগো নিয়ে আমরা এতটা সচেতন হতে পেরেছি।

লোগো অরিজিন

প্রথম লোগোটি খুবই সিম্পল বার্তা নিয়ে এসেছিলো কোন বাহুল্য ছিলোনা। এমন ভাবে লোগোটি বানানো হয় যাতে সবাই সহজেই এক দেখাতেই চিনতে পারে ডোমিনোজ কে। উপরের লাল বক্স এবং তিনটি ডট নিচের নীল অংশে ডোমিনোর নাম। ডোমিনোজ কে বসানো হয়েছে  হরাইজন্টালি। তিনটি ডটের অর্থ তারা তিনটি রেসটুরেন্ট শুরু করে একই সময়ে । টমের ইচ্ছা ছিলও তাদের নতুন আরও একটি রেসটুরেন্ট শুরু করবার সময় আরও একটি ডট যুক্ত করার কিন্তু অল্প সময়ে তাদের ব্যবসা দ্রুত ছড়িয়ে পরায় সেটি আর সম্ভব হয়ে উঠেনি সে সময়। ১২ বছরে তাদের ২০০ স্টোর খোলা হয় সে সময় আর এ থেকেই আন্দাজ করা যায় কেন তারা আইডিয়াটি তখন বাদ দিতে বাধ্য হয়েছিলেন।

২০০৩ সালে CNN কে দেয়া সাক্ষাতকারে তাদের এই তিনটি ডট সম্পর্কে বলেন টম।

 “I decided we’d put three dots on the Domino because we had three stores, and every time we added one, we’d add a dot. You can see I wasn’t thinking of a national chain back then.”

লোগোটির রাউন্ড সিম্পল শেপ একটি মডার্ন লুকের বহিঃপ্রকাশ ও বটে। ব্র্যান্ড স্টাইল রিফ্লেকশন টা তো দেখতেই পাচ্ছি এক্সট্রা বোল্ড ফন্ট সহজে চোখে পরার মত কম্বিনেশন আছে এই লোগোটিতে। কালার কন্ট্রাস্ট এমন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে যাতে করে আসা যাওয়ার পথে সবার নজরে পরে লোগোটি। ক্রেতার নজরে না পরবার কোন কারণ তারা রাখেনি বলাই যায়। তাদের ধারনা ছিলও নতুন ডট সংযুক্ত করার আইডিয়াটি তাদের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে নতুনভাবে উপস্থাপন করবে, আর  সে সাথে ডোমিনোজ রেসটুরেন্ট এর লোগোতে ডট তাদের আমেরিকান ফ্ল্যাগ এর বাহক হিসেবেও দেখানো যাবে।

ফেরত আসি লোগোর রঙে , ব্যবহার করা হয়েছে দুটি রং লাল ও নীল। এর পেছনেও কিন্তু কারণ আছে আর সেটি হলও লাল একটি এনারজেটিক কালার কখনো কখনো এই রং কে কিন্তু জরুরি বা অত্যাবশ্যকীয় হিসেবেও ধরা হয় আর নীল হলও শক্তি এবং নির্ভরশীলতার প্রতীক। সুতরাং ধরেই নেয়া যায় এই দুটির রঙের মিশ্রণে তারা তাদের বার্তা দিতে কতটা সক্ষম হয়েছে।

আর বাহুল্য ৬০ দশকে এই লোগোটি নজরকারা ছিলও বৈকি।

তাদের তিনটি রেসটুরেন্ট এর পথচলার শুরু থেকে তাদের লোগোর সামঞ্জস্যতা বজায় রাখা যেন একটি ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছিল সে সময়।

সময়ের সাথে সাথে লোগোর পরিবর্তন

সময় যেতে থাকলো আর সেই সাথে লোগোর পরিবর্তন হলও বেশ কয়েকবার। যদিও খুব বেশী জরুরি ছিলোনা পরিবর্তনের তবুও ডোমিনোজ এর মত প্রতিষ্ঠানের অবস্থান বুঝিয়ে দেয়ার জন্য হলেও লোগো পরিবর্তন করা হয়েছে সে সময়। যেহেতু সময় পাল্টেছে এবং সাথে সফলতার পরিবর্তন হয়েছে তাই নতুন ভাবে সাজিয়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা তো ছিলই। আর তার সুবাদেই প্রথম পরিবর্তনটি আসে ১৯৭৭ সালে।

লোগোটিকে নতুন করে বানানো হয় আবার সেটিও কিন্তু খুবই সাবলীল দেখার মতই। একে এবার এক পাশে তুলে আনা হয় ভারটিক্যাল ভাবে। রঙের পরিবর্তন আনা হয় হালকা থেকে কিছুটা গাড় করে, গোলাকার শেপকে করা হয় স্কয়ার। আর ডটের পাশেও স্কয়ার বর্ডার আরও ফুটিয়ে তুলে লোগোটিকে। লক্ষণীয় আরও একটি ব্যাপার হলও ফন্ট এ ব্যবহার করা হয় ক্যাপিটাল লেটার।

এই লোগোর নতুন সংযোজনগুলো সত্যিকার অর্থেই চোখে পরার মত ছিলও। যেমন অনেকগুলো লোগোর মাঝেও কিন্তু আমরা এই লোগোটিকেই দেখবো আলাদা ভাবে এতটাই দৃষ্টিনন্দন ছিলও। ভাবা হয়ে থাকে পরীক্ষামূলক পরিবর্তন তাদের চাহিদা অনুযায়ী লোগোটি আশানুরূপ না হওয়ায় ১৯৯৬ সালে আরও একবার এতে পরিবর্তন আনা হয়। তারা ধরে নিয়েছিলো তাদের আগের লোগোটিই ভালো ছিলও সেকারণেই তারা আবার তাদের পুরনো লোগোটিতে ফিরে যায় তবে কিছুটা পরিবর্তন সহ। গোলাকার কর্নারগুলো আবার ফেরত আসে আর সেই সাথে পুরনো রং। আর ক্যাপিটাল লেটার সরিয়ে দেয়া হয় এবার। লাল আর নীল রং রাখা হয়েছে শুধু কালার টোনে সামান্য পরিবর্তন করা হয়। যেহেতু এতদিনে ডোমিনোজ তাদের পসার ও নামে বিখ্যাত হয়েই গেছে তাদের ক্রেতাদের আকর্ষণ করবার খুব একটা প্রয়োজনীয়তা ছিলও না তখন। তবে সবথেকে বড় পরিবর্তন যেটি চোখে পরেছিল সেটি হলও লোগোর পজিশন পরিবর্তন। আরও একবার ফ্লিপ করা হয়েছিলো লোগোটিকে নতুন সময়ের সাথে মডার্ন রোটেট লুক যোগ করে এক ভিন্ন মাত্রা। ফন্টের পরিবর্তন তো বললামই ক্যাপিটাল লেটার সরিয়ে ক্লাসিক্যাল ভাইভ্র্যান্ত ফন্ট ব্যবহারে ক্লাসি লুক দেখা যায়। লোগোটি আকর্ষণীয় এবং মজাদার ছিল আর সাথে সাথে কোম্পানির প্রসার বাড়ার সাথে সাথে লোগোটির আরও একবার পরিবর্তনের সময় এসেছিলো।কোম্পানি বাড়ছিলো আর সেই সাথে তাদের ম্যানুও। যুক্ত হচ্ছিলো পিজ্জার সাথে সাথে নতুন নতুন অফার, ম্যানু ফিচারে আসছিলো স্যান্ডউইচ, পাস্তা, আরও অনেক কিছু। আর এখন সময় ছিলও তাদের ডোমিনোজ পিজ্জার নামকে শুধু ডোমিনোজ করার।

নামের পরিবর্তন আসে অবশেষে ২০১২ সালে। এই নতুন লোগো আগের সব লোগোকে রিফ্রেশ করে তুলে। এবার লোগোর পরিবর্তন সব কনসেপ্টকেই পাল্টে দিয়েছিলো বলা যায় এবার ডোমিনোজ কে শুধু পিজ্জার জন্যই নয় শুধু চেনা যাবে একটি ফুড চেইন হিসেবে। নিচের নীল অংশটুকু বাদ দিয়ে শুধু সিম্বলিক তিনটি ডট রাখা হয় এই লোগোতে। যদিও পূর্ববর্তি রঙগুলো রাখা হয়েছিলো আর নীল রঙটি ছিলোনা লোগোতে সেকারণে লাল এবং নিলে ভাগ করা হয়। লোগো ডিজাইন এর এক পাশে রাখা হয় কোম্পানির নাম। বলার অপেক্ষা রাখেনা ডোমিনোজ এতটাই বিখ্যাত যে তাদের থ্রি ডট ইমেজ আর রং দেখলেই মানুষ চিনতে বাধ্য এটি কোন কোম্পানি।

এই লোগোর ইতিহাস আমাদের যা শিখায়

ব্যবসায়িক ফুড চেইন ডোমিনোজ থেকে গ্রাফিক্স ডিজাইনারদের অনেক কিছুই শেখার আছে। একটি লোগোকে কিভাবে তুলে ধরা সম্ভব সহজ স্পষ্ট ভাষায় সেটিও দেখার বিষয় একজন ডিজাইনার হিসেবে। কিভাবে তিনটি ডট তার রং তার সম্পূর্ণ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে উপস্থাপন করে আসলো এতবছর ধরে সেটিও লক্ষণীয় একটি বিষয়।সময়ের সাথে প্রতিষ্ঠানের উথান তার সফলতার ব্যাপারটিও এড়িয়ে গেলে হবেনা।

লোগো পরিবর্তন করার পরও এখনো তারা তাদের সুনাম সুখ্যাতি ধরে রেখেছে আর তাদের লোগোটি সবার থেকে আলদা হয়েই সেটি প্রমাণ করে।