ডেজা ভুঃ মস্তিষ্কের একটি ধূসর অধ্যায় - প্রিয়লেখা

ডেজা ভুঃ মস্তিষ্কের একটি ধূসর অধ্যায়

ahnafratul
Published: August 6, 2017

“ডেজা ভু” এসেছে ফ্রেঞ্চ শব্দ ডেজা ভাই থেকে, যার অর্থ, এর মধ্যেই দেখা হয়ে গিয়েছে। ডেজা ভু ঘটে নি এমন কেউ কিন্তু নেই। বিজ্ঞানীরা বলছেন ডেজা ভু আগে থেকেই কোন ঘটনা বুঝতে পারা বা ভবিষ্যদ্বাণী হচ্ছে এমন কোন ঘটনা নয়; বরং আমাদের স্মৃতিকোষে জমা হয়ে থাকা একেকটি ঘটনার নতুন করে নির্মাণ।

“আরে! এই ঘটনাটি আগেও আমার সাথে একবার ঘটে গিয়েছে!”- এমন ধরণের লাইন আমাদের মস্তিষ্কে ঘুরপাক খেতে থাকে মাঝে মাঝেই। আর তা হবে নাই বা কেন বলুন? ডেজা ভু এর শিকার হয় নি, এমন খুব কমই রয়েছে। একটা উদাহরণ দেইঃ
মনে করুন আপনি রাস্তা দিয়ে হাঁটছেন। সামনে অপরিচিত বাড়িঘর, রাস্তাঘাট। কোন কিছুই আপনার চেনা নয়। হঠাৎ হাঁটতে হাঁটতেই আপনার মনে হল যে, এই দৃশ্যটি আপনার অতি পরিচিত। এই দৃশ্যটি আপনি আগেও দেখেছেন, অনুভব করেছেন। ঠিক একই সময়ে, সেই পুরনো আপনি। কেমন লাগবে তখন? বিজ্ঞানের ভাষায় একেই বলা হয় ‘ডেজা ভু’। হলিউডে এ নিয়ে বিস্তর ছবিও রয়েছে।

ডেজা ভু নিয়ে তৈরি ছবি

সম্প্রতি বিজ্ঞানীরা দাবি করেছেন যে তারা সেই ‘ডেজা ভুর’ রহস্য উদঘাটনে সমর্থ হয়েছেন। তারা বলছেন যে শরীরের কোন সমস্যা বা শারীরবৃত্তিয় কোন কাজের জন্য এটির কোন ধরনের সম্পর্ক নেই। মস্তিষ্কের মাঝে অনুরণন ঘটিয়ে স্রেফ তারা দাবি করছেন যে ‘ডেজা ভু’ আসলে আপনার স্মৃতি আপনাকে ধোঁকা দিচ্ছে কি না, তার একটি পরীক্ষা মাত্র। এটি আপনার অবচেতন মনেই ঘটে থাকে। এটি নিয়ে কোন ধরণের অবসেশন রাখার বা তৈরি করার কোন কারণও নেই আশ্বস্ত করেছেন তারা।
হোসি উরকুহার্টের পদ্ধতি অবলম্বন করে আকিরা ও’কনর সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশবিদ্যালয়ের ২১ জন স্বেচ্ছাসেবকের মাঝে একটি পরীক্ষা চালান। এ পরীক্ষাটি চালানো হয় যখন তাদের মাঝে ‘ডেজা ভু’ উত্তেজক কিছু স্মৃতির সাথে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। আকিরা তার লেখা ব্লগে বলেন,

“মস্তিষ্কের কারসাজিটা আসলে আমাদের স্মৃতির মাঝে এক ধরনের যুদ্ধ। এটির সাথে মিথ্যার কোন আশ্রয় নেই, আপনি চাইলেও মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারবেন না। স্রেফ আপনি কতটুকু মনে রাখতে পারছেন কি পারছেন না, তার ওপর ভিত্তি করেই আপনার সাথে ‘ডেজা ভুর’ পরিচয়টি ঘটে থাকে।”
আগে ধারণা করা হত ‘ডেজা ভু’ এক ধরনের মিথ্যে স্মৃতির আশ্রয়কে অবলম্বন করে মানসপটে ভাসিয়ে তোলা হয়। কিন্তু হাঙ্গেরির বুদাপেস্টের এক আন্তর্জাতিক কনফারেন্সে আকিরা তার মতামত ব্যক্ত করে এ ভুল ধারনাটি ভেঙে দেন।
তিনি বলেন,

“এটি যদি কোন ভুল না হয়ে থাকে, তবে তা কোন ভুল ঘটে যাবার আগেই তার সংশোধন হিসেবে আপনি ধরতে পারেন। এটা আরো বেশি চিন্তার ধারণা দেয়। আপনি সচেতন আর অচেতনতার মাঝে ফারাক সৃষ্টি করতে পারবেন এর মাধ্যমে।”

ক্রিস্টোফার মৌলিন, পিয়েরে মেন্দেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিজ্ঞানী, বলেন যে যারা ‘ডেজা ভুর’ সন্ধান পায় না তারা আসলে তাদের স্মৃতির প্রতিফলন ঘটাতে ব্যর্থ। কিন্তু ও’কনর তার সাথে দ্বিমত পোষন করে বলেন যে যারা ডেজা ভু অনুভব করতে পারে না, তাদের স্মৃতি আরো ভালো হতে পারে। এমনকি হয়ত তাদের কোন ট্রিগারেরই প্রয়োজন হয় না যাতে তারা ডেজা ভু অনুভব করবে। এমনও হতে পারে, তাদের স্মৃতি তাদের সাথে ধোঁকাবাজি করছে না বা তাদের স্মৃতির ঝুলিতে কোন ধরণের খারাপ অভিজ্ঞতার জমা নেই।

ডেজা ভু, স্মৃতির একটি আয়না

এবার আসা যাক আকিরা ও’কনর পরীক্ষার জন্য ট্রিগার হিসেবে কি ব্যবহার করেছিলেন। তিনি যাদের ওপর এ পরীক্ষাটি চালান তাদেরকে কিছু শব্দ পড়তে দেয়া হয়।
যেমনঃ বিছানা, বালিশ, রাত, স্বপ্ন ইত্যাদি। কিন্তু তাদের সাথে কোন যোগসূত্র স্থাপন করে এমন কোন শব্দ নেই। যেমন, ঘুম। বুঝতে পারছেন না, তাই তো? বিছানা, বালিশ, রাত, স্বপ্ন- এই শব্দগুলো আমরা সকলেই খুব সহজে ঘুমের সাথে রিলেট করতে পারি। তবে যাদের ওপর এই পরীক্ষাটি করা হয়েছিল, তাদেরকে যোগসূত্র স্থাপন করার জন্য “ঘুম” শব্দটি বলা হয় নি।
যাদেরকে এ শব্দগুলো বলতে দেয়া হয় তাদের মাঝে একটি তাড়না সৃষ্টি করা হয় যাতে তারা ‘ঘুম’ শব্দটি শুনেছেন বলে মনে করেন। এটি আসলে তাদের মাঝে মিথ্যা একটি স্মৃতি তৈরি করার চেষ্টা, যা তাদের সাথে ঘটেই নি।

এরপর তাদেরকে জিজ্ঞাসা করা হয় যে তারা এমন কোন শব্দ শুনেছেন কি না যার আদ্যক্ষর “S” অর্থাৎ তারা Sleep শব্দটি শুনেছেন কি না জিজ্ঞাসা করা হয়। জবাবে তারা না বলেন; যদিও তখন শব্দটি পরিচিত হিসেবে একটি যোগসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা করা হয়েছিল।

আশা করা যায় ডেজা ভু নিয়ে ভবিষ্যতে বিজ্ঞানীরা আরো চমকপ্রদ কিছু তথ্য নিয়ে আমাদের সামনে হাজির হবেন।

আজ আর নয়। প্রিয়লেখার সাথেই থাকুন, সকলের প্রিয় হয়ে থাকুন।