ডাঃ ইব্রাহিম: বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ - প্রিয়লেখা

ডাঃ ইব্রাহিম: বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার এক প্রবাদপ্রতিম পুরুষ

Sanjoy Basak Partha
Published: November 9, 2017

শাহবাগ মোড় পার হওয়ার সময় বারডেম হাসপাতাল চোখে পরেনি, এমন কেউ বোধহয় নেই। ডায়াবেটিসের উন্নত চিকিৎসার জন্য বারডেম হাসপাতালের খ্যাতি দেশ ছেড়ে বিদেশে গিয়ে ঠেকেছে। ডায়াবেটিস চিকিৎসায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় হাসপাতালের স্বীকৃতিটিও আমাদের বারডেমের। আজ সেই বারডেমের প্রতিষ্ঠাতা, বাংলাদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার এক কিংবদন্তি, জাতীয় অধ্যাপক মোঃ ইব্রাহিমের সম্মানার্থেই প্রিয়লেখার এই আয়োজন।

জন্ম ও শিক্ষাজীবন:

ডাঃ ইব্রাহিমের পুরো নাম শেখ আবু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। ১৯১১ সালের ০১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর ইউনিয়নের খাঁড়েরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। চার ভাই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন জ্যেষ্ঠ। গ্রামের স্কুলে লেখাপড়া শুরু করার পর ‘সালার এডওয়ার্ড ইংলিশ হাইস্কুলে’ ভর্তি হন এবং প্রথম বিভাগ নিয়ে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন স্বনামধন্য কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে। ১৯৩৩ সালে ভর্তি হন কলকাতা মেডিকেল কলেজে, ১৯৩৮ সালে পাশ করেন ডাক্তারি।

কর্মজীবন:

ডা. মোহাম্মদ ইব্রাহিম ১৯৩৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে ডাক্তারী পাশ করার পর তার চিকিৎসা ও কর্মজীবন শুরু করেন। কর্মজীবনের প্রথম দিকেই কলকাতা মেডিকেল কলেজে প্রফেসর অব মেডিসিনের ওয়ার্ডে হাউস ফিজিশিয়ান হিসাবে কাজ করার সুযোগ পান। পরবর্তীতে ১৯৩৮-১৯৪৫ সাল পর্যন্ত একই প্রতিষ্ঠানে তিনি ইমার্জেন্সী মেডিকেল অফিসার ও প্র্যাকটিক্যাল ফার্মেসী বিভাগের সিনিয়র ডেমনসট্রেটর হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৫-১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা মেডিকেল কলেজে রেসিডেন্ট ফিজিশিয়ান হিসাবে কাজ করেন। দেশ বিভাগের পর অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন পদে যোগদান করেন। একই সাথে তিনি জেনারেল হাসপাতালের সুপারিনটেনডেন্ট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের শিক্ষকের দায়িত্বও পালন করেন।

১৯৪৮ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম যুক্তরাজ্য থেকে এম,আর, সি,পি, ডিগ্রী অর্জন করেন। তার পরের বছর আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস থেকে এফ.সি.সি.পি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫০ সালে দেশে ফিরে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম ঢাকা মেডিকেল কলেজের এডিশনাল ফিজিশিয়ান হিসাবে যোগদান করেন। তারপর পর্যায়ক্রমে তিনি ক্লিনিক্যাল মেডিসিন ও মেডিসিনের প্রফেসর নিযুক্ত হন। ঢাকা মেডিকেল কলেজে থাকাকালীন সময়ে ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী কতিপয় বিশিষ্ট চিকিৎসক ও সমাজসেবীদের সহযোগিতায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় পাকিস্তান ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি আমেরিকান কলেজ অব চেষ্ট ফিজিশিয়ানস, পাকিস্তান চ্যাপ্টারের গভর্ণরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ সালে পাকিস্তান কলেজ অব ফিজিশিয়ানস এন্ড সার্জনস থেকে এফ.সি.পি.এস ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসেনের প্রফেসর ও অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ডা. ইব্রাহিম মন্ত্রীর পদমর্যাদায় স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করেন।

ডাঃ ইব্রাহিমের মহান সৃষ্টি আজকের বারডেম:

সেই পঞ্চাশের দশকেই ডাঃ ইব্রাহিম বুঝতে পেরেছিলেন, আসন্ন সময়ে ডায়াবেটিস হতে যাচ্ছে এদেশের মানুষের অন্যতম বড় শত্রু। দূরদর্শী মানুষটি তাই সত্তরের দশকেই প্রতিষ্ঠা করেন বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অফ রিহ্যাবিলিটেশন ইন ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন অ্যান্ড মেটাবলিক ডিজঅর্ডারস (বারডেম)। কালের বিবর্তনে সেই বারডেমই আজ ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় দেশের মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। প্রতিদিন প্রায় ৩ হাজার রোগী এই হাসপাতালের বহির্বিভাগে চিকিৎসা নেয়। বাংলাদেশের আর কোন হাসপাতালে এত ডায়াবেটিসের রোগী চিকিৎসা নিতে আসেনা।

 

শুধু হাসপাতাল প্রতিস্থাই নয়, হাসপাতাল পরিচালনার জন্য পর্যাপ্ত যোগ্য লোকবল তৈরির উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় বারডেম একাডেমি। এখানে ডায়াবেটিস, এন্ডোক্রাইন ও মেটাবলিজম বিষয়ে এমফিল, এমডি ও পিএইচডি সহ ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি কোর্স পরিচালনা করা হয়। এছাড়া জেনারেল সার্জারি, চোখ, মেডিসিন, গাইনি, অ্যানেস্থেশিয়া, ক্রিটিকাল কেয়ার মেডিসিন ইত্যাদি বিষয়ে স্নাতকোত্তর কোর্সও চালু আছে।

বারডেমের শয্যাসংখ্যা ৭১৬ টি। এর মধ্যে ১১০ টি শয্যা বরাদ্দ দরিদ্র রোগীদের জন্য। দরিদ্র রোগীদের একেবারে বিনামূল্যে চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের নিবন্ধন করতে হয়। ১ মাস আগে এরকম নিবন্ধিত রোগীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৫ লাখ ৭০ হাজারের কাছাকাছি। রোগীদের আর্থিক অবস্থাভেদে ওষুধ ও চিকিৎসায় ২৫ থেকে ১০০ ভাগ পর্যন্তও ছাড় দেয়া হয়। দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ও খাবারের সম্পূর্ণ ব্যয় বহন করে বারডেম কর্তৃপক্ষ। বারডেমে মোট ৬০ টি বিভাগে ৫১৯ জন চিকিৎসক, ৬৩৯ জন নার্স ও আড়াই হাজারেরও বেশি কর্মচারী নিয়োজিত আছেন।

আরেকটি দিক থেকেও অনন্য বারডেম। শুধু রোগ নিরাময়েই নয়, রোগী ও তার স্বজনদের রোগ থেকে দূরে রাখার জন্য নিয়মিত স্বাস্থ্যশিক্ষার ক্লাস নেয়া হয় বারডেমে। সেখানে ডায়াবেটিস কেন হয়, কিভাবে এটি দূরে রাখা যায় এসব সম্পর্কে রোগীর স্বজনদের ধারণা দেয়া হয়।

পুরষ্কার ও সম্মাননা:

চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশেষ অবদানের জন্য ১৯৬৩ সালে পাকিস্তান সরকার ডাঃ ইব্রাহিমকে ‘সিতারা-ই-খিদমত’ উপাধিতে ভূষিত করেন। বাংলাদেশের প্রথম চিকিৎসাবিদ হিসেবে ১৯৮৪ সালে জাতীয় অধ্যাপক হওয়ার মর্যাদা লাভ করেন তিনি। ১৯৮৫ সালে বাংলা একাডেমীর ফেলো নির্বাচিত হন। চিকিৎসা ও সমাজসেবায় অবদানের জন্য সে বছরই পান ‘মাহবুব আলী খান পুরষ্কার’। ১৯৮৬ সালে জর্ডানে প্রতিষ্ঠিত ইসলামী একাডেমী অফ সায়েন্সেস প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা ফেলো নির্বাচিত করা হয়। এছাড়া ১৯৮৭ সালে খান বাহাদুর আহসানউল্লাহ স্মারক স্বর্ণপদক, ১৯৮৯ সালে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের স্বর্ণপদক ও ১৯৯১ সালে মওলানা আকরম খাঁ স্বর্ণপদক লাভ করেন।

কিংবদন্তি এই মানুষটি ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মৃত্যুবরণ করেন।