ঠগীঃ ভারতবর্ষের ইতিহাসে কুখ্যাত খুনী সম্প্রদায় - প্রিয়লেখা

ঠগীঃ ভারতবর্ষের ইতিহাসে কুখ্যাত খুনী সম্প্রদায়

ahnafratul
Published: November 9, 2017

চাঁদটা একদম মাথার ওপরে। ঝি ঝি পোকা ডাকছে। চারদিকে একটা সুনসান নীরবতা।
হরিদাস সিং তার পরিবার নিয়ে যাচ্ছেন দূরের এক গ্রামে। সেখানে কিছুদিন থাকবেন। উপায় না থাকলেও এই রাতের বেলা তাকে গরুর গাড়ি সঙ্গে নিতে হয়েছে। সাথে আছে জনাকয়েক লাঠিয়াল। খুব সাবধানে চলেছেন তারা। সামনেই রয়েছে ঘোর বিপদ। পাতায় হঠাৎ এমন যেন একটা শব্দ হল। কেউ তাদের অনুসরণ করছে না তো! থেমে গেলেন হরিদাস। হাতের লণ্ঠনটা বাগিয়ে ধরলেন তিনি।
হৈ হৈ রৈ রৈ করে “জয় মা ভবানী” বলে তাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল একঝাঁক ছদ্মবেশী। ওমা! এরা তো হরিদাসের সাথেই ছিলেন। বিকেলেই যাত্রাপথে যুক্ত হয়েছিল এরা তার সাথে। খুব ভালো ব্যবহার আর মন মাতানো কথাবার্তায় জয় করে নিয়েছিল হরিদাসের মন। তার প্রতিদান কি তবে এই ছিল? মৃত্যুর আগে বুঝতে পারলেন হরিদাস। যমদূতদের সাথে করেই এই যাত্রা করেছিলেন তিনি।


ঠগী! ভারতবর্ষের কুখ্যাত মৃত্যুদূত এরা। রেহাই দেয় না কাউকে। অচেনা অজানা হয়ে ভিড়ে মিশে যাবে, মানুষের সাথে ভালো ব্যবহার করে তাদের মনজয় করে “জয় মা ভবানী” বলে ঝাঁপিয়ে পড়বে এরা। কেড়ে নেবে সর্বস্ব, হাড়গুলো ভেঙে পুঁতে রাখবে মাটিচাপা দিয়ে। মা কালীর একনিষ্ঠ ভক্ত এই ঠগীরা। ঠগী শব্দটি এসেছে সংস্কৃত “ঠগ” থেকে, যার অর্থ প্রতারক। ১৮৩৯ সালে ফিলিপ টেলরের উপন্যাস “কনফেশন অব আ থাগ” বইটির মধ্য দিয়ে ঠগী শব্দটি ও ঠগীরা জনপ্রিয়তা অর্জন করে।

সাল তখন ১৮৩০।
গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেন্টিক ভারতে প্রশাসক উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যানকে ঠগীদের নির্মূল করতে নির্দেশ দেন। সমগ্র বাংলা ও ভারতবর্ষে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করছে এরা। তরুণ শ্লীম্যান তখন নেহায়েতই নিরুপায়। কিভাবে এদের দমন করবেন তিনি? যেখানেই তথ্যের জন্য যাচ্ছেন, সূত্রের জন্য যাচ্ছেন, পাচ্ছেন লাশ! ঠগীরা বৃদ্ধ, যুবক, শিশু কাউকেই রেহাই দিত না তাদের কবল থেকে। প্রথমদিকে কোন তীর্থযাত্রী নিখোজ হলে ব্রিটিশ শাষকরা এটাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে মনে করত কিন্তু যখন আস্তে আস্তে ব্রিটিশরাও নিখোঁজ হওয়া শুরু করল তখন গর্ভনর জেনারেল লর্ড বেন্টিক জানতে পাড়েন এটাতে একটি ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের হাত রয়েছে। তখন তিনি ঠগীদের নির্মূল করতে ১৮৩০-এর সালে ভারতের প্রশাসক উইলিয়াম হেনরি শ্লীম্যানকে নির্দেশ দেন।

তরুণ শ্লীম্যান

হেনরি ঠগিদের নির্মূল করতে গুপ্তচর নিয়োগ করেন যাতে তাদের গতিবিধি সম্পর্কে আগেই আঁচ করা যায়। ১৮৩০ সাল থেকে ১৮৪১ সাল পর্যন্ত তিনি প্রায় ৩৭০০ ঠগীকে ধরতে সমর্থ হন। ১৯৪০ সালের দিকে প্রায় ৫০০ ঠগীর ফাঁসি দেওয়ার পর ঠগীদের সংখ্যা কমে আসে। এখনো ভারতের রাজস্থানে ঠগিদের বংশধরদের দেখা যায় তবে তারা স্বাভাবিক জীবন যাপন করছে। এই দশ বছরে ঠগীদের হাতে খুন হয়েছে প্রায় দশ লক্ষেরও অধিক মানুষ!

ঠগীদের অস্ত্র রুমাল

আসুন ঠগীদের সম্পর্কে কিছু কথা জেনে নিইঃ
১) ১৩৫৬ সালে জিয়াউদ্দীন বারানীর বই থেকে জানা যায় যে ১২৯০ সালের দিকে কিছু ঠগ দিল্লীর সুলতানের সামনে নিয়ে আসা হয়। সুলতান তাদের কোন ধরণের সাজা দেন নি। রাজ্য থেকে বের করে দিয়েছিলেন যাতে এই ঠগেরা দিল্লীতে কোন ধরণের অনাচার না তৈরি করতে পারে।
২) ঠগীরা সাধারণত বংশ পরম্পরায় এই খুনের কান্ডটি ঘটাত। তাদের সন্তানের বয়স ১৮ হলে তারা হত্যার হুকুম কিংবা দলের সাথে পরিভ্রমণ করবার সুযোগ পেত।
৩) কেবলমাত্র ধনীই নয়, অসহায় সম্বলহীন মানুষের সাথেও লুটপাট ও অনাচার করত ঠগীরা।
৪) ঠগীরা মা কালীর ভক্ত। তাদের হত্যার সময় তারা “জয় মা ভবানী” বলে হতভাগ্য শিকারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত।
৫) ঠগীদের অস্ত্র একটি ৩০ইঞ্চি লম্বা হলুদ রুমাল এবং একটি আধূলি। এই আধূলিকে এক প্রান্তে বেঁধে নিয়ে তারা রুমালের ফাঁস তৈরি করে হত্যা করত শিকারদের।
৬) একটি শিকারকাজ সফলভাবে সম্পন্ন হলে তারা পূজা করত। মা ভবানীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করত ও গুড়জাতীয় মিষ্টি দ্রব্য ভক্ষণ করত।
৭) একজন শিকারকে তিনজন ঠগী চেপে ধরে হত্যা করত। এদের মাঝে একজন মাথা চেপে ধরে থাকত, একজন পা চেপে ধরে রাখত এবং একজন গলায় ফাঁস চড়াত।

খুনের পদ্ধতি

৮) ঠগী বেহরামকে ধরা হয়ে থাকে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়ংকর ঠগী। নিজ হাতে এই ঠগ খুন করেছেন ১২৫ জনকে। ৯৩১ জনের হত্যার সময় তিনি নিজে উপস্থিত ছিলেন।
৯) শেষের দিকে ঠগীরা ব্রিটিশদের হত্যা করা বন্ধ করে দেয়। এরফলেই শ্লীম্যান তার চর নিযুক্ত করতে সুবিধা পান এবং ঠগীদের একটি বিশাল দল তার কাছে ধরা পড়ে।
১০) ঠগীরা মাঝে মাঝে ক্লান্ত হয়ে পড়লে শিকারের উদ্দেশ্যে বেশিদূর যেত না। মাত্র দু তিনজন শিকারকে হত্যার জন্য বেড়িয়ে পড়ত এবং বাকিরা উচ্চস্বরে গান বাজনা করত যাতে হতভাগ্য মানুষটির চিৎকার তাদের কারো কানে না পৌঁছয়।
১১) ঠগীদের দলে অনেক মুসলমানও ছিলেন। ইসলাম ধর্মে মূর্তিপূজা নিষিদ্ধ হলেও তারা সকলের সাথে একই কাতারে কালী পূজা করতেন। এছাড়া ধনী গরীব উঁচু নিচু সহ সমাজের নানা স্তরের লোক ঠগীদের দলে ছিল।
১২) অনেক সময় বিশাল লোকবহরের সাথে ঢুকে যেত ঠগীরা। হাসি ঠাট্টা আর ভালো ব্যবহার করে মন জয় করে নিত সকলের। সুযোগ বুঝে ঝাঁপিয়ে পড়ত সকলের ওপর। এজন্য কখনো কখনো লম্বা সময় ধরে অপেক্ষা করে থাকতে হত তাদের। আস্থাভাজন না হওয়া পর্যন্ত আক্রমণ করত না ঠগীরা।  ১৩) ঠগীরা কাউকে খুন করবার আগে বেশ কিছু সাইন বা চিহ্ন দেখে নিত। মা কালীর সমর্থন আছে বুঝলেই তারা খুন করতে নেমে যেত। আকাশ, পাখি, কালো কাক ইত্যাদি নানা জিনিস বিচার করত তারা খুন করবার আগে।

ঠগীদের গানের আসর

১৪) ঠগীদের মাঝে একটি মিথ চালু ছিল। তারা মনে করত মা কালী একবার রক্তবীজ নামক এক অসুরের সাথে লড়াই করেছিলেন। এই রক্তবীজের কাজ ছিল মানুষকে ধরে ধরে খেয়ে ফেলা। কালী ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। যতই তিনি চেষ্টা করছিলেন না কেন, এই অসুরের রক্ত থেকে আরো অসুর তৈরি হচ্ছিল। তখন মা কালী তার শরীরের ঘাম থেকে দুজন মানুষ তৈরি করেন ও তাদেরকে অস্ত্র হিসেবে দেন হলুদ রুমাল। এই দুজন রুমাল দিয়ে হত্যা করেছিল রক্তবীজকে। এইজন্য ঠগী সম্প্রদায়ের কাছে রুমাল এত বিশেষত্ব বহন করত।

হেনরী শ্লীম্যান তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ঠগীদের নির্মূল করতে সক্ষম হন। তবে কথা আছে প্রচুর। কেউ কেউ বলেন শ্লীম্যানের পরও ঠগীরা সম্পূর্ণভাবে দমিত হয় নি। তাদের কাজ তারা গোপনে ঠিকই চালিয়ে গিয়েছিল। আজও রাজস্থানে বাস করে ঠগীদের বংশধরেরা। তবে তারা রয়েছে আর দশজন সাধারণের মতই।

ইতিহাসের পাতায় ঠগীরা যেমন কালো একটি অধ্যায়, ঠিক তেমনি চিত্তাকর্ষকও। খুব দ্রুতই বলিউডে আসছে “থাগস অব হিন্দুস্তান” নামক একটি ছবি, যেখানে অভিনয় করেছেন অমিতাভ বচ্চন, আমির খান প্রমূখ।