টুইটার কিলার এর মৃত্যুদন্ড রায় - প্রিয়লেখা

টুইটার কিলার এর মৃত্যুদন্ড রায়

Afreen Houqe
Published: December 22, 2020

“যদি তুমি শেষ পথে এসে থাকো তাহলে আমার কাছে এসো হয়তো আমি তোমাকে সাহায্য করতে পারবো”

এরকম একটি উক্তি দেখার পর আসলে দুর্বল বা বিষাদগ্রস্থ মানুষ তার প্রতি আকৃষ্ট হওয়া ছাড়া কোনো পথ ও খোলা থাকেনা কারন ইতিমধ্যে তাদের সামনের সব পথ বন্ধ হয়ে গেছে। আর একারনেই তারা সর্বশেষ আশ্রয় হিসেবে তাকেই বেছে নেয়। আর তাকাহিরো এমন ভাবে তার জাল বিছিয়ে নিতো সে পথ থেকে ফিরে আসার কোনো উপায় থাকতো না। তাকাহিরো প্রথমেই নিশ্চিত করতো যাতে কেউ তার সাথে দেখা করতে এসে ফিরে না যেতে পারে, আর একারনেই নিজের বাসার খুব কাছাকাছি তাদের সাথে দেখা করার প্রস্তাব দেয়। ভুক্তভোগী তার সাথে দেখা করতে এলে কথার ছলে সে তাদেরকে তার এপার্টমেন্টে নিয়ে যেতো আর তারপরেই ভুক্তভোগী মৃতদের তালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলতো নিজের অগোচরে। 

তাকাহিরো তার স্বীকারোক্তি তে বলেন মেরে ফেলার আগে তার ফাঁদে পা দেয়া প্রত্যেককেই সে ঘুমের ওষুধ ও নেশা হবে এমন  দ্রব্য ব্যবহার করতো। খুব নির্বিকার তার স্বীকারোক্তি যেন কিছুই হয়নি, অগাস্ট এর শুরুতে সে একজনকে খুন করে, এরপর সেপ্টেম্বর এর চার তারিখে, অক্টোবর এর চার তারিখে মোটামুটি প্রথম খুন ছাড়া বাকি সব খুনগুলো এই দুই দিনে করেছে বলে জানায়। এবং অদ্ভুত ব্যাপার একই দিনে সে দুইজন তিনজনের সাথে দেখা করেছিলো। মৃত নয়জনের মধ্যে ছয়জন নারী, দুইজন কিশোরী একজন পুরুষ। আর পুরুষ ব্যক্তিটি তার সাথে দেখা করেন এমন একজন নারীর বন্ধু বলে জানা যায়। তাকাহিরো জানান প্রথম হত্যার পরে লাশটির শরীর কাটতে তার খুব বেগ পেতে হয়েছিলো প্রায় তিনদিন চেষ্টার পর সে লাশের শরীর খন্ড বিখন্ড করতে সক্ষম হন।পরবর্তী সব গুলো লাশ একদিনের মধ্যেই কেটে ফেলতো সে। অবলীলায় একের পর এক তথ্য অবাক করে দিচ্ছিলো প্রশাসনকে।

পুলিশের সাথেও তাকাহিরোর কথাগুলো ছিলো নির্লিপ্ত খুনের মোটিভ হিসেবে সে জানায় শুধুমাত্র ধর্ষণ এই জন্যই সে এই কাজটি করতো তাছাড়া মারা যাবার আগে পর্যন্ত সে কারো নাম এবং বয়স পর্যন্ত জানতোনা। শারীরিক নির্যাতনের আগেও সে এসব জানার কোনো আগ্রহ পেতোনা। তার ভাষ্যমতে ,আমি লাশগুলো আমার বাথরুমে কেটে ফেলতাম কারন আমার কাছে মনে হতো এরচেয়ে কোনো সহজ পদ্ধতি নেই যাতে আমি ধরা না পরি।সব প্রমান নষ্ট করার জন্য এটি সবচেয়ে সহজ মনে হয়েছে আমার। তার এপার্টমেন্ট থেকে পুলিশ দুইটি কিচেনে নাইফ, কেঁচি, করাত, দড়ি উদ্ধার করে যাতে রক্তের দাগ পাওয়া যায়। তাকাহিরো একের পর এক বলতে থাকে কিভাবে সে শরীরের বিভিন্ন অংশগুলো টয়লেটের ফ্ল্যাশ আর ময়লার ব্যাগে করে ফেলে দিতো। শুধু ধরা পরে যাবার ভয়েই হাড়গুলো নিজের কাছে লুকিয়ে রাখছিলাম। তাকাহিরোর ছোট স্টুডিও এপার্টমেন্টে পাওয়া যায় তিনটি কুলার বক্স এবং পাঁচটি স্টোরেজ বক্স যেখানে পাওয়া যায় মৃতদের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করা পা, হাত, মাথা আর এই দেহাবশেষ এর দুর্গন্ধ এড়াতে ব্যবহার করতো বিড়াল এর লিটার।

 

তার এপার্টমেন্টে বসবাসরত প্রতিবেশীরা জানান তারা অনেকদিন ধরেই তাকাহিরোর ব্যাপারে অভিযোগ করে আসছিলেন। প্রথমত তার এপার্টমেন্ট থেকে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং দ্বিতীয় কারন হিসেবে তারা জানান তাকাহিরোর অন্ধকারে রাত বিরাতে সন্দেহজনক ঘোরাঘুরি করার বিষয়টি কেউ আমলে নেননি। তাকাহিরোর শেষ শিকার তরুণীর বয়স ছিলো তেইশ। এই তরুণী নিখোঁজ হবার পরে তরুণীর ভাই তাকে খুঁজে বের করতে তার বোনের টুইটার একাউন্ট একসেস নিয়ে জানতে পারেন তাকাহিরোর সাথেই তার বোনের শেষ কথা হয়েছে। আর তার সূত্র ধরেই পুলিশি সহায়তায় তাকাহিরোকে ধরতে সক্ষম হয় পুলিশ। তাকাহিরো শিরায়শি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই নয়টি খুন করতে সক্ষম হয় এবং ধরাও পরে। তাকাহিরোর এই খুনের ঘটনাটি সমস্ত জাপানে তোলপাড় সৃষ্টি করে। এবং শুরু হয় নানা যুক্তি তর্ক। কারন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের দরুন আত্মহত্যার মত একটি স্পর্শকাতর বিষয়কে খোলামেলা আলোচনা হওয়া কতটা যুক্তিযোগ্য? প্রশ্নটা কিন্তু থেকেই যায়। ধরা পরেছে বলেই হাফ ছেড়ে বাঁচার কোনো অবকাশ নেই, কারন যদি ধরা না পরতো তাহলে তার কর্মকান্ডগুলো কতটা ভয়াবহ হয়ে উঠতো সেটি এখন ধারণা করা যায়।

 

আগেই বলেছি জাপান আত্মহত্যা প্রবণতার কাতারে ষষ্ঠ সেই জায়গা থেকে বিচার করলেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোলামেলা আলোচনা আরো ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে আর সেকারনেই টুইটার নতুন নিয়ম অন্তর্ভুক্ত করা হয় যে টুইটারে আত্মহত্যায় প্রচারণা এবং প্ররোচনা দেবার আর কোনো সুযোগ নেই। তাকাহিরো শিরাইশি “টুইটার কিলার” ৩১ অক্টোবর ২০১৭ সালেই ধরা পরেন এবং স্বীকার করেন তিনি নয়টি খুন করেছেন। তার এপার্টমেন্টে সব প্রমান সহই তাকে গ্রেফতার করা হয়। দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর ১৬ ডিসেম্বর ২০২০ সালে জাপানের বিজ্ঞ আদালত তার মৃত্যুদন্ড রায় দেন।

 

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপনার যারা বেশিরভাগ সময় কাটান আপনারা কতটুকু সচেতন? বন্ধুত্বের আড়ালে লুকিয়ে নেইতো কোনো সিরিয়াল কিলার?