টুইটার কিলারের মৃত্যুদণ্ড রায় - প্রিয়লেখা

টুইটার কিলারের মৃত্যুদণ্ড রায়

Afreen Houqe
Published: December 20, 2020

জাপানি সিরিয়াল “টুইটার কিলারের” খুন করার আগের জীবনটা কেমন ছিলো সেটাও জানা দরকার। দেখতে অমায়িক শান্ত, ভদ্র, মানুষের মনে এত নৃশংতা কিভাবে থাকতে পারে সেটিও ভাবার বিষয়। জামা শহরে আসার আগে কেমন বা ছিলো তার জীবনযাপন? তার আগে আমাদের একটু জানতে হবে আত্মহত্যা প্রবণতার দেশ হিসেবে জাপান আছে ষষ্ঠ স্থানে। এত উন্নত জাতি, এদের জীবনে এত বিষণ্নতা কেন কাজ করে? গত কয়েক বছরে প্রায় ২১,৮৯৭ জন আত্মহত্যা করেছে যা কিনা গত বাইশ বছরে সর্বনিম্ন বলে ধারণা করা হয়। আর এই সময়কালে ২৫৭টির মত রিপোর্ট ফাইল করা হয় ইন্টারনেট হটলাইন সেন্টারে যেখানে আত্মহত্যা প্রবণতার কথা উল্লেখ করা হয়।

তাকাহিরো জামা শহরেই বেড়ে উঠে নিজের বাবা মায়ের এবং তার বোনের সাথে যা কিনা তার স্টুডিও এপার্টমেন্টে থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার দূরেই। লোকাল এলিমেন্টরি জুনিয়র স্কুলে যখন যে অধ্যায়নরত অবস্থায় ছিলো সবাই তাকে খুবই শান্ত এবং নিরীহ স্বভাবের বলেই জানতো। পড়ালেখার গ্রেড তার ভালো ছিলোনা যদিও, কিন্তু অদ্ভুতভাবে লক্ষণীয় বিষয় যেটি ছিলো তা হলো সে কখনো স্কুল মিস করতো না , বছরে ছুটির দিন ছাড়া সে একটি দিনও স্কুল কামাই করেছে বলে জানা যায়নি। বিভিন্ন নিউজ হেডলাইনেও তার যে ছবি এসেছিলো সেটি কেবল একটা টিনেজার চশমা পড়া বাস্কেটবল টিমের ফ্রেশ প্লেয়ার এর মত দেখতে তার বেশি আর কিছুই বোঝার উপায় নেই এতটাই নিষ্পাপ দেখতে তাকাহিরো। কিন্তু তার অন্তরালে বাস করছে এক ভয়াবহ পশু সেটি একবারো আঁচ করা যায়নি। এরপরেই সে পড়ালেখা করতে চলে যায় ইয়োকোহমা শহরে প্রিফেকালচারাল হাই স্কুলে যখন তার পরিবারের সাথে তার দুরুত্ব বাড়তে শুরু হয়। এই সময়ে তার বাবা মার বিবাহ বিচ্ছেদ হয় এবং তার মা তার বোনকে নিয়ে আলাদা হয়ে যায়। গ্র্যাজুয়েশন শেষ করার পর সে সুপারমার্কেট, ফুড ফ্যাক্টরি, পাঁচিনকো পার্লার ছাড়াও নানা পেশায় কাজ করেছিলো। এরপর সে কাজ করতে শুরু করে অদ্ভুত পেশা বেশ্যাবৃত্তিতে মেয়েদের আগ্রহী করে তুলতে স্কাউট হিসাবে। সে সময় সে কাজ করতো শিনজুকুর কাবুকিচু জেলাতে। সেসময় তাকে যারা চিনতো তারা সবাই তাকাহিরোকে উচ্চবিলাষী বিপদজনক মানুষ হিসেবে দেখতে শুরু করে। অনেকে তো এভাবেই তাকে আখ্যায়িত করেন যে তাকাহিরো নিজের প্রয়োজনে বিশ্বাসঘাতকতা করতেও পিছপা হবেনা।

তাকাহিরোর পরিচিত এক নারী বলেন যিনি দুইহাজার সতেরো সালের শুরুর দিকে তিনমাসের মত তার কাছাকাছি ছিলেন ” মৃত্যু কিংবা আত্মহত্যার প্রবণতা থাকলেও তাকাহিরো অন্য সব সাধারণ মানুষের থেকে অস্বাভাবিক রকমের ভদ্র নম্র ছিলো স্বভাবে”। এমনকি ঠাট্রার ছলে তাকাহিরো তাকে একদিন মেসেজ ও দিয়েছিলো ” আসুন একসাথে আত্মহত্যা করবো, শুধু তাই নয় আরো একবার একইভাবে সে মেসেজ পাঠায় ” আমি একজন কে খুন করেছি যে মরতে চাইছিলো” মজা করতে করতে এই কথাগুলো বলার কারণেই তাকাহিরোর প্রাক্তন বান্ধবী এসব রসিকতা বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন।

প্রতিবেশীরা জানান তাকাহিরো তার বাবার কাছাকাছি থাকতো, তার বাবা যেহেতু একজন মোটরগাড়ি ডিজাইন ওয়ার্কশপে কাজ করতেন মাঝে মাঝে তাকাহিরো বাবাকে সাহায্য করতে সেখানেও যেতেন। এমনকি অধিকাংশ সময় সে তার বাবার সাথে রাতের খাবার খেয়ে গল্প গুজবেও সময় কাটাতেন। অগাস্ট মাসে তিনি তার বাবার কাছে বলেন আমি আমার জীবনের ভালোবাসা খুঁজে পেয়েছি আর খুব জলদিই আমি সেই ভালোবাসার জায়গাটা তৈরি করতে চাই। তাকাহিরো তার বাবার সাথে খুবই বন্ধুসুলভ ছিলো সবাই বলতো তারা দুজন এক ওপরের সাথে বন্ধুর মতই থাকতেন ।সেটিও প্রমান হয় যখন তার স্টুডিও এপার্টমেন্ট নেয়ার সময় তার বাবা আনুমানিক উনিশ হাজার ইয়েন দিয়ে সহায়তা করেন তাকাহিরোকে একজন জামানতকারী হিসেবে। অগাস্ট এর ২২ তারিখ তাকাহিরো নিজেই ১৩.৫ স্কয়ারফিট এর স্টুডিও এপার্টমেন্টে শিফট করেন যেটিকে পরবর্তীতে জাপানিজ মিডিয়া “হাউজ অফ হরর” হিসেবে প্রচার করেন।

 এবার আসি কিভাবে তাকাহিরো ফাঁদে ফেলতো কাউকে। যখন তাকাহিরো একা থাকা শুরু করেন নিজের মত, তখন টুইটার এ সে নিজের দুইটি একাউন্ট খুলে যার একটি ছিলো ‘ i want to die’ অন্যটি হলো ‘A proffesional at hanging’ এই নামে। প্রথম একাউন্টে সে নিজেকে একজন হতাশ এবং ব্যভিচারী মানুষ বলেই উপস্থাপন করেন। তার প্রথম টুইটার এর দুইটি পোস্টের একটি ছিলো এমন ” আমি সব ভুলে যেতে চাই” দ্বিতীয়টা ছিলো ” আমি অদৃশ্য হতে চাই”। তার দ্বিতীয় একাউন্টে সে একদম ভিন্ন এক মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরে, যেখানে সে প্রতিনিয়ত আত্মহত্যা প্রবন মানুষকে প্ররোচিত এবং উৎসাহী করতে থাকে আত্মহত্যার জন্য। আর শুধু তাই নয় সে আত্মহত্যায় সহায়তা করবে বলেও জানায়। টুইটারে তার দ্বিতীয় একাউন্টের পোস্ট গুলো অনকেটা এমন ” আমি ঝুলন্ত অবস্থায় আমার সব জ্ঞান ছড়িয়ে দিতে চাই” আবার “যারা সত্যি খুব খারাপ সময়ের মধ্যে আছে আমি তাদের সাহায্য করতে চাই তাদের শক্তির উৎস হয়ে উঠতে চাই” শুধু তাই নয় সে আত্মহত্যাকে রিকমেন্ড করে হ্যাশট্যাগ দিয়ে পোস্ট করেন ” আসুন একসাথে মরি” । এটি ছিলো শিকার ধরার সর্বোচ্চ ফাঁদ আর তাতেই তার জালে আটকা পরেন একে একে আটজন যাদের কেউ আর বেঁচে নেই। ধারনা করা যায় তাকাহিরো এমন মানুষকে বেছে নিতো যারা জীবনে হতাশা, গ্লানি, অবহেলার কারনে বিশাদ্গ্রস্থ ছিলেন আর সেই সাথে মানসিক ভাবেও ছিলেন দুর্বল যারা বেঁচে থাকার কোনো কারন খুজে পাচ্ছিলেন না।  

 

শেষ পর্ব আসছে….