টাকায় ফুটে ওঠা বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহ - প্রিয়লেখা
টাকা + বাংলাদেশী টাকা + বাংলা টাকা + দেশি টাকা + মূল্যমানের টাকা + টাকার মূল্যরাশ + টাকার অবমূল্যায়ন + টাকার মূল্যমান

টাকায় ফুটে ওঠা বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহ

farzana tasnim
Published: November 2, 2017

বাংলাদেশের প্রাচীন ও ঐতিহাসিক স্থানসমূহ ‘র  চিত্র আমাদের টাকার মাঝে ফুটে উঠেছে। এই সকল প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানগুলো বাংলার সুপ্রাচীন সামাজিক, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় ইতিহাসকে যেমন ব্যাখ্যা করে, ঠিক তেমনই এই প্রত্নস্থানগুলো বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে ব্যাখ্যা করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। আমাদের টাকায় এই সকল প্রত্নস্থানগুলো এসেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ইতিহাসের অংশ হিসেবে।

পাঁচ টাকার নোট  

পাঁচ টাকার নোট
এই টাকাটি 08-10-2006 তারিখে ইস্যু করা হয়। পাঁচ টাকার এই নোটে কুসুম্বা মসজিদের প্রবেশ তোরণের ছবি দেয়া হয়েছে।

কুসুম্বা মসজিদ  

নওগাঁ জেলা সদর থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে মান্দা উপজেলার কুসুম্বা গ্রামে অবস্থিত দেশের উল্লেখযোগ্য প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন কুসুম্বা মসজিদ। এর আরেক নাম কালা পাহাড়। মসজিদের প্রধান প্রবেশ পথের উপরে স্থাপিত আরবি শিলালিপি অনুসারে মসজিদটি ৯৬৬ হিজরি তথা ১৫৫৮-৫৯ সালে নির্মিত। শেরশাহ শুরির শাসনামলের শেষ দিকে সুলতান গিয়াসউদ্দীন বাহাদুর শাহর রাজত্বকালে জনৈক সুলাইমান মসজিদটি নির্মাণ করেন। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে মসজিদটি মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ইটের তৈরি এ মসজিদের ভেতর ও বাইরের দেয়াল পাথরের আস্তরণ দিয়ে আবৃত। মসজিদের পূর্ব দিকে তিনটি এবং উত্তর ও দক্ষিণে একটি করে প্রবেশপথ আছে। পশ্চিম দেয়ালে আছে দুটি মিহরাব। উত্তর-পশ্চিম কোণে আছে একটি উঁচু প্লাটফর্ম। ধারণা করা হয় সমাজের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিরা এখানে নামাজ আদায় করতেন। মসজিদের মিহরাবগুলো খোদাই করা পাথরের নকশায় পরিপূর্ণ।

পাঁচ টাকার নোট
পাঁচ টাকার এই নোটে তারা মসজিদের ছবি রয়েছে।

তারা মসজিদ  

বাংলাদশের পুরানো ঢাকার আরমানিটোলার আবুল খয়রাত সড়কে অবস্থিত একটি মসজিদ। খ্রিষ্টীয় আঠারো শতকে ঢাকার জমিদার মির্জা গোলাম পীর (মির্জা আহমদ জান) এই মসজিদটি নির্মাণ করেছিলেন। সতের শতকে দিল্লি, আগ্রা ও লাহোরে নির্মিত মোঘল স্থাপত্য শৈলী অনুসরণে এই মসজিদটি নির্মাণ করা হয়েছিল। মসজিদের কোথায় এর তৈরির সময় উল্লেখ নেই। মসজিদটি তৈরির পর ১৮৬০ খ্রিষ্টাব্দে মির্জা গোলাম পীর মৃত্যুবরণ করেন।

১৯২৬ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকার তৎকালীন স্থানীয় ব্যবসায়ী, আলী জান বেপারী মসজিদটির সংস্কার করেন। এই সময় মসজিদটির আকার বৃদ্ধি করা হয়। এর পূর্বদিকে একটি বারান্দা যুক্ত করা হয়। মসজিদের মেঝে মোজাইক করা হয়। চিনিটিকরি (Chinitikri) কৌশলের মোজাইকে ব্যবহার করা হয় জাপানী রঙিন চীনা মাটির টুকরা এবং রঙিন কাঁচের টুকরা। ১৯৮৭ খ্রিষ্টাব্দে তারা মসজিদটি পুনরায় সংস্কার করা হয়। এই সময় পুরনো একটি মেহরাব ভেঙে দুটো গম্বুজ আর তিনটি নতুন মেহরাব বানানো হয়। সব মিলিয়ে বর্তমানে এর গম্বুজ সংখ্যা পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে। এর ফলে মসজিদের জায়গা সম্প্রসারিত হয়। মসজিদের দেয়াল ফুল, চাঁদ, তারা, আরবি ক্যালিওগ্রাফিক লিপি ইত্যাদি দিয়ে সৌন্দর্যমণ্ডিত করা হয়েছে।

দশ টাকার নোট

দশ টাকার নোট
টাঙ্গাইলের আতিয়া জামে মসজিদের ছবি সম্বলিত নোট

আতিয়া মসজিদ 

মুসলিম স্থাপত্যের ঐতিহ্য আর কালের সাক্ষী হয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে যে মসজিদগুলো রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম একটি হলো ষোড়শ শতাব্দীতে নির্মিত আতিয়া মসজিদ। টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলায় অবস্থিত এই মসজিদটি ঠিক কোন সময়ে নির্মাণ করা হয়েছে সে বিষয়ে সুনিশ্চিত তথ্য না পাওয়া গেলেও বেশ কয়েকটি শিলালিপির তথ্য থেকে ধারণা করা হয় যে খুব সম্ভবত ১৬০৮ খেকে ১৬১১ শতকের মাঝামাঝি কোনো এক সময়ে এটি নির্মিত হয়ে থাকতে পারে। আরবি ‘আতা’ থেকে ‘আতিয়া’ শব্দটির উত্পত্তি, যার ব্যুত্পত্তিগত অর্থ হলো ‘দান কৃত’। আলী শাহান শাহর বাবা আদম কাশ্মিরী (র.)কে সুলতান আলাউদ্দিন হুসায়েন শাহ টাঙ্গাইল জেলার জায়গিরদার নিয়োগ দান করলে তিনি এই অঞ্চলে এসে বসবাস শুরু করেন। সে সময় তিনি ইসলাম ধর্ম প্রচারের এবং আনুষাঙ্গিক ব্যয় নির্বাহের জন্য আফগান নিবাসী শাসক সোলাইমান কররানীর কাছ থেকে সংলগ্ন এলাকা দান বা ওয়াকফ্ হিসাবে লাভ করেন। সেই থেকেই এ অঞ্চলটির নাম আতিয়া হয়ে থাকতে বলে মনে করেন ঐতিহাসিকেরা।

আতিয়া মসজিদ
আতিয়া মসজিদ

পরবর্তীতে বাবা আদম কাশ্মিরীর পরামর্শক্রমে সাঈদ খান পন্নী নামক সূফিজীর এক ভক্তকে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীর উক্ত আতিয়া পরগণার শাসন কর্তা হিসেবে নিয়োগ দান করেন। এই সাঈদ খান পন্নীই ১৬০৮ সালে বাবা আদম কাশ্মিরীর কবরের সন্নিকটে আতিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। মুহাম্মদ খাঁ নামক তৎকালীন এক প্রখ্যাত স্থপতি এই মসজিদ নির্মাণের পরিকল্পনা ও নির্মাণ কাজে সংশ্লিষ্ট ছিলেন। এ ছাড়া রওশন খাতুন চৌধুরাণী ১৮৩৭ সালে এবং আবুল আহমেদ খান গজনবী ১৯০৯ সালে মসজিদটির সংস্কার করেন। লাল ইট দ্বারা নির্মিত এই মসজিদটি আকারে বেশ ছোট এবং এতে সুলতানি ও মুঘল – এই দুই আমলেরই স্থাপত্যরীতির সুস্পষ্ট নিদর্শন রয়েছে। মসজিদের চারকোণে ৪টি আটকোনা মিনার রয়েছে, যার উপরের অংশটি ছোট গম্বুজের আকৃতি ধারণ করেছে।

বিশ টাকার নোট

বিশ টাকার নোট
ষাট গম্বুজ মসজিদ এর ছবি সহ বিশ টাকার নোট

ষাট গম্বুজ মসজিদ

ষাট গম্বুজ মসজিদ বাগেরহাট জেলায় অবস্হিত একটি প্রাচীন ও ঐতিহাসিক মসজিদ। বাংলাদেশের প্রাচীন ও বৃহত্তর মসজিদের মধ্যে এটি অন্যতম। বিশিষ্ট আউলিয়া আজম খানজাহান আলী (রাঃ) ১৫শ শতাব্দীতে মসজিদটি নির্মান করেন। এ মসজিদটি বহু বছর ধরে ও বহু অর্থ খরচ করে নির্মাণ করা হয়েছিলো। পাথরগুলো আনা হয়েছিলো রাজমহল থেকে। বাংলাদেশের তিনটি বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের একটি ষাট গম্বুজ মসজিদ; বাগেরহাট শহরটিকেই অবশ্য বিশ্ব ঐতিহ্যবাহী স্থানের মর্যাদা দেয়া হয়েছে। ১৯৮৩ খ্রিস্টাব্দে ইউনেস্কো এই সম্মান প্রদান করে।
ষাটগম্বুজে গম্বুজ সংখ্যা ৭৭টি। ৭৭টি গম্বুজের মধ্যে ৭০টির উপরিভাগ গোলাকার এবং মধ্যের একটি সারিতে চারকোণবিশিষ্ট ৭টি গম্বুজ আছে। মিনারে গম্বুজের সংখ্যা ৪ টি-এ হিসেবে গম্বুজের সংখ্যা দাঁড়ায় মোট ৮১ তে। তবুও এর নাম হয়েছে ষাট গম্বুজ। ঐতিহাসিকরা মনে করেন, সাতটি সারিবদ্ধ গম্বুজ সারি আছে বলে এ মসজিদের সাত গম্বুজ এবং তা থেকে ষাট গম্বুজ নাম হয়েছে। আবার অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন, গম্বুজগুলো ৬০ টি প্রস্তরনির্মিত স্তম্ভের ওপর অবস্থিত বলেই নাম ষাট গম্বুজ হয়েছে।

বিশ টাকার নোট
বিশ টাকার এই নোটে ছোট সোনা মসজিদের ছবি রয়েছে।

ছোট সোনা মসজিদ

রাজশাহী বিভাগের চাঁপাইনবাবগঞ্জে অবস্থিত ছোট সোনা মসজিদ বাংলাদেশের প্রাচীন মসজিদগুলোর মধ্যে অন্যতম। মসজিদে প্রাপ্ত একটি শিলালিপি থেকে জানা যায়, সুলতান আলা-উদ-দীন শাহের শাসনামলে ওয়ালী মোহাম্মদ নামের এক ব্যক্তি প্রাচীন গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে অবস্থিত ফিরোজপুর গ্রামে এটি প্রতিষ্ঠা করেন। সে কারণে অনেকের কাছেই এটির অন্য পরিচয় ছিল ‘গৌড়ের রত্ন’ হিসেবে। যদিও মসজিদটির বাইরের সোনালি রঙের আস্তরণটিই একে সোনা মসজিদ নামে পরিচিত করে তোলে। এদিকে প্রাচীন গৌড়ে সুলতান নুসরত শাহের তৈরি অপর আরেকটি মসজিদও সোনা মসজিদ নামে পরিচিতি লাভ করায় স্থানীয়রা একে ছোট সোনা মসজিদ নামে অভিহিত করতে শুরু করেন।

পঞ্চাশ টাকার নোট

পঞ্চাশ টাকার নোট
পঞ্চার টাকার এই নোটে রাজশাহীর বাঘা মসজিদের ছবি রয়েছে ।

বাঘা মসজিদ

রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় অবস্থিত টেরাকোটা শিল্পমন্ডিত বাঘা মসজিদ দেশের এক ব্যতিক্রমী প্রত্নসম্পদ। শত শত বছর আগের এই শিল্পনিদর্শন ও নির্মাণশৈলী দর্শক মনে বিস্ময় জাগায়। এটি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সংরক্ষিত একটি নিদর্শন। প্রত্নতত্ত্ববিদ আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার মতে, হযরত মাওলানা মোয়াজ্জেম-উদ-দৌলা বা মোহাম্মদ দৌলা ওরফে শাহ দৌলা নামে পরিচিত দরবেশের সুদূর প্রসারী খ্যাতির কারণে বহু শিষ্য-সাগরেদের আগমন ঘটে। (বাঘের অভয়ারণ্যের কারণেই বোধ হয় এই স্থানের নাম ‘বাঘা’ হয়ে থাকবে।) এই স্থান আবাদের পর বাঘা নামে পরিচিত ঘটে। শাহ দৌলার ওফাতের পর জ্যেষ্ঠ পুত্র মাওলানা আব্দুল হামিদ দানিশমন্দ তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন। এ সময় বাংলার সুলতান নাসির উদ্দীন নসরত শাহ ৯৩০হিজরী (১৫২৩ খ্রী.) এখানে একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। মসজিদের সম্মুখে একটি শিলালিপি স্থাপন করেন। বর্তমানে তা করাচী যাদুঘরে আছে বলে জানা গেছে।

একশত টাকার নোট

একশত টাকার নোট
তারা মসজিদের ছবি সহ একশত টাকার নোট
একশত টাকার নোট
ষাট গম্বুজ মসজিদের ছবি সহ এক শত টাকার নোট।

পাঁচ শত টাকার নোট

পাঁচশত টাকার নোট
সাত গম্বুজ মসজিদ মসজিদের ছবি সহ পাঁচ শত টাকার নোট।

সাত গম্বুজ মসজিদ

সাত গম্বুজ মসজিদ ঢাকার মোহাম্মদপুরে অবস্থিত মুঘল আমলে নির্মিত একটি মসজিদ। এই মসজিদের চারটি মিনারসহ সাতটি গম্বুজের কারনে মসজিদের নাম হয়েছে ‘সাতগম্বুজ মসজিদ’। এটি মোঘল আমলের অন্যতম নিদর্শন। ১৬৮০ সালে মোঘল সুবাদার শায়েস্তা খাঁর আমলে তার পুত্র উমিদ খাঁ মসজিদটি নির্মাণ করান। মসজিদটি লালবাগ দূর্গ মসজিদ এবং খাজা আম্বর মসজিদ এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ।

এক হাজার টাকার নোট

এক হাজার টাকার নোট

কার্জন হল

ফেব্রুয়ারি ১৯, ১৯০৪ সালে ভারতের তৎকালীন ভাইসরয় ও গভর্ণর জেনারেল – জর্জ কার্জন এর ভিত্তি-প্রস্তর স্থাপন করেন।বঙ্গভঙ্গ ঘোষিত হওয়ার পর প্রাদেশিক রাজধানী হিসেবে ঢাকাকে গড়ে তোলার জন্য রমনা এলাকার যেসব ইমারতের গুরুত্ব বৃদ্ধি পায় কার্জন হল তার মধ্যে অন্যতম। দানী লিখেছেন, ‘কার্জন হল নির্মিত হয়েছিল টাউন হল হিসেবে’। কিন্তু শরীফউদ্দীন আহমদ এক প্রবন্ধে দেখিয়েছেন এ ধারণাটি ভুল। এটি নির্মিত হয় ঢাকা কলেজের পাঠাগার হিসেবে। এবং নির্মাণের জন্য অর্থ প্রদান করেন ভাওয়ালের রাজকুমার।

এক হাজার টাকার নোট