‘টাইমলেস টেস্ট’: যে ম্যাচের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই! - প্রিয়লেখা

‘টাইমলেস টেস্ট’: যে ম্যাচের শুরু আছে কিন্তু শেষ নেই!

Sanjoy Basak Partha
Published: December 1, 2017

টেস্ট ম্যাচ পাঁচদিনে হয়, এটা সকলেই জানে। জয়, পরাজয় কিংবা অমীমাংসিত- ফলাফল যাই হোক, সেটা নির্ধারিত হয় এই পাঁচদিনের মধ্যেই। কিন্তু টেস্ট ইতিহাস এমন এক ম্যাচও দেখেছে, যা শুরু হয়েছিল, কিন্তু শেষ হয়নি! ১০ দিন ধরে খেলে যাওয়ার পরেও যে টেস্ট ম্যাচ ছিল অমীমাংসিত! ক্রিকেট ইতিহাসে সেটি ‘টাইমলেস টেস্ট’ নামেই পরিচিত। সেই টাইমলেস টেস্টের গল্পই শুনুন আজ প্রিয়লেখার পাতায়।

শুরুটা হয়েছিল ১৯৩৯ সালের ৩ মার্চের এক রৌদ্রোজ্জ্বল দিনে, আর শেষটা হয়েছিল ১৪ মার্চের এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যায়। সিরিজটা ছিল ইংল্যান্ড আর সাউথ আফ্রিকার মাঝে। সে সময় কেবল অস্ট্রেলিয়াই এরকম টাইমলেস টেস্ট খেলতো, মানে জয় পরাজয় না আসা পর্যন্ত খেলা চালিয়ে যেতে হবে, কোন নির্দিষ্ট সময়সীমা নেই খেলা শেষ করার। কিন্তু ১৯৩৮-৩৯ এর সিরিজের আগেই ঠিক করা হয়েছিল, চতুর্থ টেস্ট পর্যন্ত যদি কোন দল ১ টেস্টের ব্যবধানে এগিয়ে থাকে, কিংবা দুই দলের সামনেই সুযোগ থাকে সিরিজ জিতে নেয়ার, তাহলে পঞ্চম টেস্টটি শুধুমাত্র টাইমলেস টেস্ট হবে। চার টেস্ট শেষে ইংল্যান্ড ১-০ তে এগিয়ে থাকায় ৫ম টেস্টটি হল টাইমলেস টেস্ট।

কিন্তু সেই টেস্ট যে ইতিহাসে নাম লেখাবে, সেটা কে জানত! টেস্টটি ৫ দিনেও মীমাংসা হবে না, এমনটা ভাবেনি কেউই। ইংল্যান্ড দল তাই ডারবান ছেড়ে কেপটাউনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করার জন্য ট্রেনের টিকেট কেটেছিল ৭ মার্চের। সেখানে ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের সাথে সফরের শেষ ম্যাচটি খেলে দেশের জাহাজ ধরার কথা ছিল ১৭ মার্চ।

টাইমলেস টেস্টের ইংল্যান্ড দল

কিন্তু ডারবানের পিচ যেন ছিল বোলারদের জন্য সাক্ষাৎ বধ্যভূমি। ওই টেস্ট ম্যাচে দুই দলের বোলারদের সম্মিলিতভাবে বল করতে হয়েছিল ৫,৪৪৭ টি, এখনকার দিনের প্রায় ৮ টি ওয়ানডে ম্যাচের সমান বল! ইংলিশ বোলার হ্যাডলি ভেরিটি একাই করেছিলেন ৭৪৬ বল! এক ম্যাচেই নতুন বল নিতে হয়েছিল ১২ বার!

আর এমন পিচের ফায়দা ঠিকভাবে তুলেছিলেন দুই দলের ব্যাটসম্যানেরা। দুই দল মিলে রান করেছিল মোট ১৯৮১! প্রতি দিনে গড়ে রান উঠেছিল ২২০ করে, একটি দিন পুরোপুরি নষ্ট হয়েছিল বৃষ্টির জন্যে। সাউথ আফ্রিকার কেন ভিয়োলেন বলেছিলেন, এই একমাত্র ম্যাচ যা শেষ হওয়ার আগেই আমাকে দুইবার চুল কাটতে হয়েছিল!

অস্ট্রেলিয়ার টাইমলেস টেস্টের পূর্ব অভিজ্ঞতা অনুসারে, টাইমলেস টেস্টে যে দল টসে জয়ী হত সে দলই বেশিরভাগ সময় ম্যাচেও জয়ী হতো। ডারবানের কিংসমিডে শেষ টেস্টে তাই সাউথ আফ্রিকান অধিনায়ক অ্যালান মেলভিল যখন সিরিজে প্রথমবারের মত টস জিতলেন, উল্লসিত হয়েছিল গোটা সাউথ আফ্রিকা ড্রেসিংরুমই।

আফ্রিকান ব্যাটসম্যানেরা শুরুটা করেছিলেন একদমই ধীরে-সুস্থে। বিশাল আকৃতির পিটার ভ্যান ডার বিল প্রথম রান পেতেই খেলেছিলেন ৪৫ বল, আরেক ব্যাটসম্যান ডাডলি নোর্স ১০৩ রানের ইনিংস খেলতে সময় নিয়েছিলন ৬ ঘন্টারও বেশি, সে সময় যেটি ছিল মন্থরতম টেস্ট সেঞ্চুরির রেকর্ড। ‘সময়ের বাঁধাধরা নেই, রান করার এত তাড়া কিসের’- এই ছিল নোর্সের যুক্তি!

চারদিন ব্যাট করে সাউথ আফ্রিকানরা থামল ৫৩০ রানে। জবাব দিতে নেমে ইংল্যান্ড যখন ৩১৬ রানে অলআউট হয়ে গেল, সাউথ আফ্রিকার জয়টাই তখন মনে হচ্ছিল সম্ভাব্য ফল। কিন্তু এরপর যা হল, সেটা একপ্রকার অবিশ্বাস্যই!

পিটার ভ্যান ডার বিল

দ্বিতীয় ইনিংসেও বিশাল ৪৮১ রানের সংগ্রহ দাঁড় করায় সাউথ আফ্রিকা। প্রথম সাউথ আফ্রিকান ব্যাটসম্যান হিসেবে একই টেস্টের দুই ইনিংসে সেঞ্চুরি করার দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকলেও পিটার ভ্যান ডার বিল আউট হন ৯৭ রানে। আউট হওয়ার পর তার অবিশ্বাস্য অসহায় দৃষ্টি নাকি এখনো অনেক প্রবীণ খেলোয়াড়ের চোখে ভাসে! শেষ পর্যন্ত জয়ের জন্য ইংল্যান্ডের সামনে দাঁড়ায় ৬৯৬ রানের পর্বতসমান লক্ষ্য।

টেস্টের অষ্টম দিন সকালে লাঞ্চের ঠিক আগে আগে ইংল্যান্ডের প্রথম উইকেট যখন পড়লো, স্কোরবোর্ডে রান তখন ৭৮। এরপর ওয়ালি হ্যামন্ড একটা সাহসী সিদ্ধান্ত নিলেন। আগের আট টেস্টে ৬ নম্বরে ব্যাট করতে নেমে যার সর্বোচ্চ স্কোর ছিল ২৮, সেই ২২ বছর বয়সী বিল এডরিখকে নামিয়ে দিলেন ৩ নম্বরে। মৃত্যুর কয়েক বছর আগে এডরিখ বলছিলেন সে কথা, ‘ওয়ালি হঠাৎই ড্রেসিংরুমে এসে আমাকে বলল, তুমি ৩ নম্বরে ব্যাট করতে নামছো। যদি তুমি একটা ডাবল সেঞ্চুরি মেরে দিতে পারো, তাহলে হয়তো আমাদের একটা সুযোগ থাকবে’। ওইদিনের খেলা শেষে এডরিখ সত্যিই সেঞ্চুরি করে ফেললেন, ইংল্যান্ড ও ভালোই লড়াই করতে লাগলো।

মাঝে একদিন বৃষ্টি ও রবিবার পড়ায় টানা দুইদিন বন্ধের পর সোমবার সকালে আবার শুরু হল খেলা (তখনকার সময়ে রবিবার খেলা হতো না)। সাড়ে সাত ঘণ্টা ব্যাটিং করে ১২০ রান করে পল গিব ফিরলেও এডরিখ ফিরলেন দ্বিশতক করার পরে। চা বিরতির পর প্রথম ওভারে শর্ট লেগে নরম্যান গর্ডনের ক্যাচ হয়ে যখন ফিরছেন, এডরিখের নামের পাশে তখন লেখা ২১৯ রান।

ব্যাট করছেন বিল এডরিখ

এডরিখ যখন ফিরছেন, ইংল্যান্ডের স্কোর তখন ৩ উইকেটে ৪৪৭। এডি পেইন্টার ও ওয়ালি হ্যামন্ড মিলে যখন দিনের খেলা শেষ করে ফিরছেন, ইংল্যান্ডের দরকার ঠিক ২০০ রান, হাতে তখনো আরও ৭ উইকেট।

ইংলিশ উইকেটকিপার লেস আমেস (একাধারে নির্বাচক কমিটিতেও ছিলেন) বলছিলেন, ‘আমরা কেউ কল্পনাও করিনি আমরা ৬৯৬ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারব। কিন্তু এডরিখ ডাবল সেঞ্চুরি করে ফেলার পর আমাদের সবার বিশ্বাস হতে লাগলো, আমরা এই খেলা জিততে পারি’।

আগে থেকেই ট্রেন বুক করা ছিল ইংল্যান্ডের, মঙ্গলবারের পরে তাই আর খেলা চালানো সম্ভব হতো না। বৈরি পরিবেশে শুরু হল দশম দিনের খেলা। মধ্য বিকেলে পেইন্টার যখন ফিরছেন, ইংল্যান্ড ততক্ষণে পৌঁছে গেছে ৬১১ তে। পিচের অবস্থাও ততক্ষণে বেহাল, আকাশে ঘন কালো মেঘের কারণে খেলা চালানোর মত পর্যাপ্ত আলোও ছিল না। সময় ও আবহাওয়ার কথা মাথায় রেখে ইংল্যান্ড তাই দ্রুত ব্যাট চালাতে লাগল। হ্যামন্ড যখন স্টাম্পড হলেন, স্কোর তখন ৬৫০। আর যখন মাত্র ৪৩ রান দরকার, তখনই আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো ডারবানে। ওইদিন আর খেলা সম্ভব হল না, পরেরদিন ট্রেন থাকায় ইংল্যান্ডের পক্ষেও আর খেলা সম্ভব হল না। ফলাফল, দশ দিনের খেলার পর ড্র! ইংল্যান্ড শেষ করলো ৫ উইকেটে ৬৫৪ তে।

পল গিব

দীর্ঘ এই টেস্ট শুধু খেলোয়াড়ি দক্ষতারই না, পরীক্ষা নিয়েছিল খেলোয়াড়দের মানসিক দক্ষতারও। প্রতিদিনকার রুটিনের সাথে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলেন সাউথ আফ্রিকার অধিনায়ক মেলভিল, যে রবিবার সকালে নাস্তার টেবিলে এসে সতীর্থদের কাউকে দেখতে না পেয়ে তিনি আতঙ্কিত হয়েছিলেন, মাঠে পৌঁছাতে না আবার দেরি হয়ে যায় তাদের। হোটেলের ওয়েটার মনে করিয়ে দেয়ার পর মেলভিলের খেয়াল হয়, রবিবার খেলা বন্ধ!

ওই টেস্ট খেলোয়াড়দের কিরকম মানসিক পরীক্ষা নিয়েছিল তার প্রমাণ মেলে এরিক ডালটনের কথায়। তিনি নিজেই বলছিলেন, ‘কোন কোন রাতে আমার স্ত্রী হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে উঠে বসে দেখতো, আমি এলবিডব্লিউ এর জন্য আপীল করছি!’ ওই টেস্টে ৬ উইকেট পেলেও প্রচুর আপীল করার পরেও লেগ বিফোরে কোন ব্যাটসম্যানকে আউট করতে পারেননি ডালটন। ঘুমের মধ্যেও তাই মাঠের ঘোর থেকে বের হতে পারেননি তিনি!