জ্যঁ মাইকেল সেরি: একজন প্রতিভাবান ফুটবলারের গল্প - প্রিয়লেখা

জ্যঁ মাইকেল সেরি: একজন প্রতিভাবান ফুটবলারের গল্প

Sanjoy Basak Partha
Published: August 15, 2017

শুরুতে শোনা গিয়েছিল বার্সেলোনা তাঁর ব্যাপারে আগ্রহী। সময় ঘুরতে ঘুরতে এখন পাল্লাটা বেশি ঝুঁকেছে লিভারপুলের দিকে। আবার লিভারপুল কোন প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছাড়াই তাঁকে পেয়ে যাবে, এমনটাও কিন্তু না। আর্সেনাল ও টটেনহামেরও নজর আছে তাঁর দিকে। থাকবে নাই বা কেন, আইভরিয়ান মিডফিল্ডার জ্যঁ মাইকেল সেরি যে গত মৌসুমে খেলেছেনই তাঁকে নিয়ে কাড়াকাড়ি করার মত! গত মৌসুমে ফ্রেঞ্চ ক্লাব নিসের বিস্ময়কর উত্থানের অন্যতম কারিগর যে ছিলেন এই সেরি!

গত মৌসুমে ফ্রেঞ্চ ফুটবলের অন্যতম বিস্ময় ছিল নিস। নিজেদের আক্রমণাত্মক ফুটবল দিয়ে সকলের মন ভরিয়েছে, ক্লাবের ইতিহাসে প্রথমবারের মত জায়গা করে নিয়েছে চ্যাম্পিয়ন্স লীগে। লিগ চ্যাম্পিয়ন মোনাকোকে বিধ্বস্ত করেছিল ৪-০ গোলে, জায়ান্ট পিএসজিকেও হারিয়েছিল ৩-১ গোলে। আর এতে অন্যতম প্রধান কারিগর ছিলেন সেরি।

ফ্রেঞ্চ লীগে কেবল মার্শেইয়ের মরগান স্যানসনেরই সেরির ৯ টি অ্যাসিস্টের চেয়ে বেশি অ্যাসিস্ট ছিল গত মৌসুমে। অ্যাসিস্টের সাথে যোগ করুন ৬ টি গোলও। তবুও সেরির অবদান শুধু পরিসংখ্যান দিয়ে যাচাই করা সম্ভব হবে না। সেরি এখন বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম প্রতিভাবান মিডফিল্ডারদের একজন, এবং খুব সম্ভবত বড় কোন ক্লাবে যাওয়ার জন্যও ভালই প্রস্তুত তিনি।

সেরি একজন সব্যসাচী ফুটবলার, প্রচণ্ড পরিশ্রমী, দলের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ, ভদ্র এবং সবসময়ই নতুন কিছু শিখতে আগ্রহী। স্পোর্টিভ ২২৫ কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেই বলেছেন, ‘প্রশংসার চেয়ে সমালোচনায় আমি বেশি গুরুত্ব দেই, কারণ উন্নতি করার এটিই উপায়। আপনি যেগুলো ঠিকভাবে করছেন শুধু সেগুলোতে ফোকাস করলে আপনি কখনোই উন্নতি করতে পারবেন না’।

সেরির উত্থানের গল্প তাঁর মুখের কথাকেই সমর্থন করে। আইভরিয়ান ক্লাব অ্যাসেক মিমোসাসে ম্যানেজারের প্রথম পছন্দের ফুটবলারও ছিলেন না সেরি! কিন্তু নিজের একটা গুণ দিয়ে কোচ সেবাস্তিয়ান দেসাব্রের মন জয় করে ফেলেন তিনি। কি সেই গুণ? মনোযোগী শ্রোতা! কোচ যা যা বলতেন, সব খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন তিনি, আর সেগুলোর প্রয়োগ ঘটাতেন নিজের খেলায়। ক্লাবে নিজের দ্বিতীয় মৌসুমেই তাই একাদশে নিয়মিত হয়ে যান সেরি, ভালো খেলে চোখে পরেন পর্তুগীজ স্কাউটদের।

২০১২ তে পর্তুগীজ ক্লাব পোর্তো সাইন করায় সেরিকে, কিন্তু মূল একাদশে সুযোগ মেলে না তাঁর। কোন প্রতিবাদ করেননি সেরি, পোর্তো ছেড়ে যোগ দেন আরেক পর্তুগীজ ক্লাব পাকোস ডি ফেরেরাতে। সেখানে নিজেকে ভালভাবেই প্রমাণ করেন, ২০১৪/১৫ মৌসুমে হন ক্লাবের সেরা খেলোয়াড়। সেরির নজরকাড়া পারফরম্যান্স চোখে পরে ফ্রেঞ্চ ক্লাব নিসের স্কাউটদের, ফলাফল, মাত্র ১ মিলিয়ন ইউরোতে সেরিকে দলে টেনে নেয় তারা।

নিস সমর্থকদের তখন তাদের নতুন সাইনিং সম্পর্কে কোন ধারণাও নেই। কিন্তু পারফরম্যান্স দিয়ে কয়েক সপ্তাহেই সমর্থকদের মন জিতে নেন সেরি। দুর্দান্ত স্ট্যামিনা ও অসাধারণ পাসিং অ্যাবিলিটি দিয়ে কোচ ক্লদ পুয়েলের পরিকল্পনার অংশ হয়ে উঠেন সেরি। ২০১৫-১৬ মৌসুমে লিঁওর বিপক্ষে নিসের ৩-০ জয়ে সেরির অসাধারণ প্লে মেকিং রোলের পর তাঁর সামর্থ্য নিয়ে আর কোন প্রশ্ন থাকে না ফ্রেঞ্চ সমর্থকদের।

বার্সাতে খেলা তাঁর স্বপ্ন বলে বহুবার জানিয়েছেন সেরি। আইভরিয়ান এই মিডফিল্ডার আদর্শ মানেন স্পেন ও বার্সা লিজেন্ড জাভি হার্নান্দেজকে, ‘জাভি এমন একজন যার খেলা আমি খুব মনোযোগ দিয়ে বহুদিন ধরে বিশ্লেষণ করেছি। খেলাটাকে নিয়ন্ত্রণ করার অদ্ভুত ক্ষমতা রয়েছে তাঁর, কথা দিয়ে নয়, বল পায়ে খেলা নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। তিনি খুব সাধারণ, কিন্তু চালাক মুভ করেন বল নিয়ে। আর বল হারানই না’।

জাভির মত সেরিও বল নিজের পায়ে রাখাটাকেই মাঠে নিজের প্রধান কাজ মানেন। গত মৌসুমে সেরি ৯০% পাস সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন! কেবল পিএসজির থিয়াগো মোত্তা ও মার্কো ভেরাত্তি সেরির চেয়ে বেশি পাস অ্যাটেম্পট করেছেন। সে কারণেই লিগ ওয়ানের অন্যতম সৃজনশীল মিডফিল্ডার মানা হচ্ছে তাঁকে।

সেরির সবচেয়ে শক্তিমত্তার জায়গা হল, তিনি এতটাই ভার্সাটাইল যে প্রতিপক্ষ কোচ ধন্দে পরে যান সেরি ম্যাচে কোন জায়গায় খেলবেন। আন্দ্রেয়া পিরলোর মত ডিপ লায়িং মায়েস্ত্রো হিসেবে যেমন খেলতে পারেন, তেমনি বক্স টু বক্স মিডফিল্ডার এবং ক্লাসিকাল প্লেমেকার হিসেবেও খেলতে পারেন।

তাঁর পাসিং অ্যাবিলিটি দিন দিন উন্নত হচ্ছে, ডিফেন্সেও বল আগের থেকে বেশি জিততে শুরু করেছেন। লং রেঞ্জ শট নেয়ার ক্ষেত্রে পারদর্শী তিনি, তাঁর ফ্রি-কিক প্রতিপক্ষের জন্য এক আতঙ্কের নাম। সমালোচনা গ্রহণ করে নিজের খেলায় উন্নতি আনার গুণটাও সেরির জন্য পজিটিভ একটা দিক।

সাবেক বায়ার্ন সেন্টার ব্যাক ও বর্তমানে নিসে খেলা দান্তে সেরির প্রশংসায় বলেছেন, ‘ক্যারিয়ারে অনেক মানসম্মত পারফর্মার এর সাথে খেলেছি, সেরিও তাদের মধ্যে একজন’।

ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় খেললে সেরির ত্বকে এক ধরণের ব্যথাদায়ক অ্যালার্জির উদ্রেক হয়, যার কারণে মাঝে মাঝে খেলতে কিছুটা সমস্যা হয় তাঁর। ইংল্যান্ডের আবহাওয়া ফ্রান্সের চেয়ে বেশি আরামদায়ক হওয়ার কথা সেরির জন্য। লিভারপুলের জন্য সেটা সুখবরই বৈকি!

সূত্র- ফোরফোরটু ডট কম