জালালউদ্দিন রুমিঃ মানবাত্মার রহস্যের সন্ধান দেয়া এক কবি - প্রিয়লেখা

জালালউদ্দিন রুমিঃ মানবাত্মার রহস্যের সন্ধান দেয়া এক কবি

farzana tasnim
Published: September 14, 2017

গতকাল আমি চতুর ছিলাম। তাই, আমি পৃথিবীটাকে বদলে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমি জ্ঞানী। তাই, নিজেকে বদলে ফেলতে চাই। এমন আরও অসংখ্য জ্ঞানগর্ভ উক্তির সাথে মিশে আছে একটি নাম, ‘জালালউদ্দিন রুমি’। বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্বে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি কবিদের মধ্যে সর্বাধিক পরিচিত ও পঠিত। ফারসি ভাষাভাষী গবেষকেরা জালালউদ্দিন রুমিকে তাদের সবচেয়ে বড় কবি হিসেবে দেখেন।

জালালউদ্দিন রুমি ১২০৪ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান আফগানিস্তানের বালাখে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা বাহা ওয়ালাদ ছিলেন সর্বজনবিদিত পণ্ডিত ও সুফি। বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহর ভালোবাসা কিভাবে হাসিল করা যায় তার ওপর অনেক চিত্তাকর্ষক লেখা তিনি লিখেছেন। মোঙ্গলদের আসন্ন আক্রমণের সময় ইরানের পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় থাকাকে নিরাপদ মনে না করায় তিনি ১২২০ সালের দিকে তার পরিবারকে আনাতলিয়ায় সরিয়ে নেন। বর্তমান তুরস্কের কনিয়ায় তিনি স্খায়ীভাবে বসতি স্খাপন করেন এবং সেখানেই তিনি তৎকালীন শ্রেষ্ঠ আলেম হিসেবে পেশাজীবন শুরু করেন। ১২৩১ সালে মৃত্যুর পর তার পুত্র জালালউদ্দিন পিতার স্খলাভিষিক্ত হন। এর অনেক আগেই জালালউদ্দিন স্বনামধন্য অধ্যাপক ও ধর্মপ্রচারক হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

তিনি আইন ও ধর্মতাত্ত্বিক বিজ্ঞানকে এক সূত্রে গ্রথিত করেছিলেন এবং সুফিবাদকে আরো বেশি আধ্যাত্মিক মাত্রা দিয়েছিলেন। তবে তখনো তিনি কবিতা রচনা করেননি বা সুফি বিজ্ঞানের অথরিটি হিসেবে স্বীকৃতি পাননি। রুমির জীবনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটতে শুরু করে ১২৪৪ সালে, অর্থাৎ তার বয়স যখন ৪০ বছর। এ বছর তিনি কেনিয়ায় একজন অতি আশ্চর্যজনক ব্যক্তিত্বের সংস্পর্শে আসেন। তার নাম শামস আল-দীন তাবরিজ বা শামস-ই তাবরিজ। তারা দু’জন নিষ্কাম প্রেমের বìধনে আবদ্ধ হয়ে পড়েন। শামস রুমিকে আধ্যাত্মিক প্রেমের ব্যাপারে এমন উৎকৃষ্ট সবক দিলেন যা তিনি ইত:পূর্বে কল্পনাও করতে পারেননি। এ অবস্খায় রুমির কাছে শামস যেন সৌন্দর্য ও মহত্বের মূর্ত প্রতিক হয়ে ওঠেন। পাশাপাশি তিনি উপলব্ধি করতে থাকেন, তিনি যেন আল্লাহর রহমতের ছায়াতলে আশ্রয় পাচ্ছেন। এমতাবস্খায় এক দিন শামস নিরুদ্দেশ হয়ে যান। শামস নিহত হয়েছেন বলে গুজব শোনা গেলেও রুমি নিজে তা বিশ্বাস করতেন বলে মনে হয় না। তবে এ থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার, শামসের নিরুদ্দেশ হয়ে যাওয়ার পরই রুমির কলম দিয়ে ঝরনা ধারার মতো কবিতা বেরোতে থাকে। রুমি অবশ্য তার অনেক লেখার মাধ্যমে এ কথা পরিষ্কার করে দিয়েছেন।

 

পশ্চিমা বিশ্বে তার জনপ্রিয়তার কারণ তিনি তার কবিতার মাধ্যমে যে বার্তা তুলে ধরেছেন তা তার ভাষার সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে সক্ষম হয়েছে। তিনি তার কাব্যে অনেক গুরুত্বপূর্ণ দর্শন দিয়েছেন যা নিছক ফারসি ভাষা বা সংস্কৃতির বিষয় নয়, বরং মানবজাতির আত্মার রহস্যের বিষয়। কাব্য-সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি গদ্যও রচনা করেছেন। তার গদ্য সাহিত্যের মধ্যে রয়েছে কিছু সংলাপ, যেগুলোর মানসম্পন্ন অনুবাদ করেছেন এ জে আরবেরি। মাওলানা জালালউদ্দিন রুমি যে বিশ্বের একজন সর্বশ্রেষ্ঠ সুফি তা বোঝার জন্য কাউকে তার কাব্যের সমঝদার হতে হবে এমনটি নয়।

সাহিত্যের সামগ্রিক বিচারে রুমির মাহাত্ম্য নিহিত এখানে, তিনি ইসলাম ধর্মের একেবারে নির্যাসটুকু হাজির করতে পেরেছিলেন। যা মানুষকে পবিত্র ও সৌন্দর্য দান করে। আর স্বভাবতই একটি সার্বজনীন ধর্ম হিসেবে ইসলামের মর্মবাণী সব দেশের সব কালের প্রতিনিধিত্ব করে। মানব সন্তান সীমাহীন স্বাধীনতা ও অফুরন্ত স্বর্গীয় মহিমা নিয়ে জন্মলাভ করেছে। এ দু’টি পাওয়া তাদের জন্মগত অধিকার। তবে এ মহামূল্যবান দু’টি জিনিস পেতে হলে তাদের অবশ্যই ভালোবাসার কাছে আত্মসমর্পণ করতে হবে। কেউ হয়তো বা প্রশ্ন করতে পারেন এর মধ্যে নতুন কী আছে? দুনিয়ার তাবত মহাপুরুষই তো এ কথা বলে গেছেন। রুমির মাহাত্ম্য এখানেই নিহিত যে, তিনি অত্যন্ত সরাসরি দৈনন্দিন জীবনাচরণ থেকে উদাহরণ টেনে মহাসত্যকে জীবন্তভাবে উপস্খাপন করতে পেরেছেন। উন্মোচন করেছেন মানবাত্মার রহস্য।

রুমি ৩ হাজার গজল (প্রেমের গান) রচনা করেছেন। আর এসব গজলের অনেকগুলোর সাথেই শামসের নাম বিজড়িত। শামসের জন্য উৎসর্গীকৃত তার দিওয়ান-ই শামস-ই তাবরিজ হচ্ছে গজল ও বিভিন্ন শ্লোকের সমাহার, যার মধ্যে রয়েছে ৪০ হাজার পংক্তি। ২৫ হাজার শ্লোক নিয়ে রচিত তার সঙ্কলনের নাম মসনবি। মসনবি হচ্ছে শিক্ষামূলক নীতিবাক্যের সমাহার। এবং মানুষকে নীতিবোধে উজ্জীবিত করাই এর একমাত্র লক্ষ্য। Literary History of the Arabs গ্রন্থের বিখ্যাত লেখক R A Nicholson (1868-1945)মসনবির পুরোটাই ইংরেজিতে অনুবাদ করে ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমিকে একজন শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক সাধক হিসেবে তুলে ধরেছেন। রুমি বিশারদ নাদের খলিল তার ‘সুফি পাথ টু লাভ’ গ্রন্থে ৭৫টি গজল ও বিক্ষিপ্তভাবে ১ হাজার শ্লোক অনুবাদ করেছেন। ১২৭৩ সালে ইহলোক ত্যাগ করেন মানবাত্মার রহস্যের কবি জালালউদ্দিন রুমি।