জনাথন জেমস এর কমরেড হয়ে উঠা আর নির্মম পরিণতি - প্রিয়লেখা

জনাথন জেমস এর কমরেড হয়ে উঠা আর নির্মম পরিণতি

Afreen Houqe
Published: February 18, 2020

পৃথিবী জুড়ে অনেক হ্যাকরের গল্প ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। কারো কারো নাম ইতিহাসের পাতায় উঠে আছে
আবার কাউকে ভুলেও গেছি আমরা। তবে না ভুলে যাওয়া এক বিখ্যাত হ্যাকার সারির প্রথম এই হ্যাকার
যাকে নিয়ে আজ কথা বলবো তার নাম জনাথন জেমস(Jonathan James) । থমকে যাওয়ার মত হলেও সত্যি
মাত্র ১৫ বছর বয়সে এই কিশোর ছেলেটি সাড়া বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন । হ্যাকিং জগতে
কমরেড (cOmraDe) নামটি হয়তো আসলেই ভোলা সম্ভব না কখনো । ছেলের আগ্রহ আর ইচ্ছাতে জেমসের বাবা তাকে ছোট বেলায় কম্পিউটার কিনে দিয়েছিলেন । আর সে মাত্র ছয় বছর বয়সেই কম্পিউটারের প্রতি খুব আসক্ত হয়ে পরে জেমস ,তের বছর বয়সে ছেলের কম্পিউটারের নেশা মাত্রা ছাড়াচ্ছে দেখে তার কম্পিউটার জব্দ করেন বাবা রবার্ট জেমস। জেমস উন্মাদ হয় গেলেন বাড়ি থেকে পালিয়েও গেলেন, রাস্তার পাশে টেলিফোন বুথ থেকে বাবাকে রীতিমত হুমকিও দিয়েছিলেন কম্পিউটার ফেরত না পেলে বাড়ি না ফেরার। অগত্যা বাবা ছেলের কথা মেনে নিয়ে তাকে ফেরত নিয়ে আসেন বাড়িতে কম্পিউটার দেবেন এই আস্বাসে।

 

মাত্র চোদ্দ বছর বয়সে প্রোগ্রামিং শিখতে শুরু করেন জেমস, জানতেন ইউনিক্স আর সি প্রোগ্রামিং ভাষা। কম্পিউটার ক্লাসের পাশাপাশি অনলাইনে ঘুরে ঘুরে শিখতেন তিনি। ১৯৯৯ সালের ২৩ আগস্ট থেকে ২৭ অক্টোবরের মধ্যে জেমস তার মেধাকে কাজে লাগিয়ে ভাইরাস সম্পর্কে তার চিন্তা শক্তিকে অনেক দূর নিয়ে যান। আর এ বিদ্যার উপর ভর করেই এক বছরের মাথায় হ্যাক করে বসেন নাসা আর প্রতিরক্ষা বিভাগের বেল সাউথ,মিয়ামি-ডেড,আমেরিকার ডিফেন্স (The U.S Department of Defense) এবং পরম শক্তিশালী নাসা সহ
আরো অনেক বড় বড় ওয়েবসাইট যা কিনা অসম্ভব নয় অনেকটা অবিশ্বাস করার মত ব্যাপার ছিলো সবার দৃষ্টিতে। মাত্র ১৫ বছর বয়সে বেল-সাউথ, মিয়ামি ডেড, আমেরিকার প্রতিরক্ষা বিভাগ এবং নাসার ওয়েব সাইট হ্যাক করেন ইউএস ইতিহাসে নিজের অস্তিত্বের জানান দেন জেমস। এছাড়াও সে ব্যাকডোর কম্পিউটিং এর মাধ্যমে ডালাস এবং ভিরজিনার সার্ভারে একটি স্নিফার ইন্সটল করেন। যার মাধ্যমে তিনি ওই সব স্থানের প্রায়
তিন হাজার তথ্য চুরি করেন। যার মধ্যে ছিল ওই এলাকা গুলোর সকল চাকুরীজিবিদের তথ্য এমন কি কমপক্ষে ১০ টি অফিশিয়াল মিলিটারী কম্পিউটারের তথ্য।এর ফলে অবশ্য জেমসকে জেলেও যেতে হয়। জেমস নাসার ওয়েব সাইট হ্যাক করে এবং সেখান থেকে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন ডলারের সমপরিমান মূল্যের একটি সফটওয়ার এর সোর্সকোড ডাউনলোড করে। নাসার মতে জেমস যে সফটওয়্যারগুলো চুরি করেছিল সেগুলো দিয়ে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস স্টেশন নিয়ন্ত্রন করা হতো। জেমস নাসার ওয়েব সাইটে যে ক্ষতি করেছিলো সেটি ঠিক করতে নাসার ওয়েবসাইট তিন সপ্তাহ বন্ধ রাখতে হয় যেটি ইতিহাসে প্রথম বার ঘটেছিলো এই ক্ষুদে হ্যাকারের কল্যানে। শুধু মাত্র কার্যক্রম বন্ধই নয় অপরদিকে এটি ঠিক করতে নাসা কে গুনতে হয় প্রায় আরো ৪১,০০০ ডলার। প্রতিরক্ষা দপ্তর, নাসা এবং স্থানীয় পুলিশ থেকে এজেন্টদের একটি দল জানুয়ারী ২৬, ২০০০ তারিখে
আনুমানিক সকাল ৬টায় জেমসের বাড়িতে অভিযান চালায় এবং তাকে গ্রেফতার ও করা হয় ,যদিও তার বাবা মার নজরে এটি কোনো অপরাধ মনে হয়নি তখন তারা বারবার বলছিলেন মজার ছলেই জেমস এই কাজটি করেছে তার ইচ্ছাকৃত অপরাধ হিসেবে তারা মেনেই নিতে চাইছিলেন না ব্যাপারটিকে ।এই সময়ে আরো বেশ কিছু ঘটনা ঘটে। জেমসের প্রবিশন পিরিয়ডে ড্রাগ টেস্ট এ তার রিপোর্ট পজেটিভ আসে এরপর ২০০০ সালের অক্টোবর মাসে তাকে ৬ মাসের কারাদন্ড ভোগ করতে হয়। মুক্তির পর তাকে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত করা নজরদারিতে রাখা হয় এই ক্ষুদে হ্যাকারকে শুধু এখানেই থেমে যায়নি সম্পুর্ন ঘটনা নাসা ও প্রতিরক্ষা দপ্তরের কাছে কাছে ক্ষমা চেয়ে তাকে চিঠিও লিখতে হয়েছিল। আর ঠিক এসময় তার কম্পিউটার ব্যবহারের উপরেও বেশ কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়।কিছু বছর পরেই সিক্রেট সার্ভিস সাইবার ক্রাইম হ্যাকারদের ট্র্যাক করতে শুরু করে তখন এই গল্প ভিন্ন দিকে মোড় নেয়।


সচরাচর যা হয় কোনো মানুষ বিখ্যাত হলে দুটি ঘটনা হতে দেখা যায় এক হয়তো তাকে মানুষ পছন্দ করে
আর নতুবা বিখ্যাত তকমা লাগায় তাকে ঘৃনা করতে শুরু করে। দুর্ভাগ্যবশত জেমসের ক্ষেত্রে ঘটেছিলো
দ্বিতীয়টি হ্যাকার কমিউনিটিতে তার শত্রু সংখ্যা দিন দিন বাড়তে লাগলো আর একারনেই যে কেউ কোনো
অন্যায় করলে সবার আগে উঠে আসতে শুরু হলো জেমসের নাম।
শীর্ষ হ্যাকার এলবার্ট গলজানবেজ যে কিনা হ্যাকিং এর মাধ্যমে বিশাল অংকের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছিল সে
সময় তার দলের কিছু মানুষের সাথে জেমসের সক্ষতা থাকায় বিপদ যেনো পুরোপুরি জেমসকেই ঘিরে
ধরেছিলো সে মুহূর্তে।জেমস অবশ্য এদের সাথে কখনো বন্ধুতে জরাননি সেভাবে। আর যেহেতু এত কিছু ঘটে
যাচ্ছিল কম সময়ের মধ্যে তার জীবনে তারপর থেকে এসব সঙ্গ এড়িয়েও চলতেন তিনি।
জেমস সবসময় বলে আসছিলো টাকা কমানোর চাইতে তার হ্যাকিং এর কাজটি করতে ভালো লাগে তাই মজা
করেই সে হ্যাকিং করে টাকা কমানোর উদ্দেশ্যে নয়। আর এ কথাটি জেমসের বাবাও বারবার বলেন, `জেমস
কখনো স্কুলে যায়নি,কিন্তু মাঝে মাঝে ওর প্রতিভা কাজের ধরন আমাকে মুগ্ধ করে। তবে আমি কখনো
ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবতে দেখিনি তাহলে অন্তত সেটা আমার চোখে পরতো, আর তার ব্যাংক ব্যালেন্স
থেকেও অনুমান করা যেতো।`

জানুয়ারি ২০০৭ সিক্রেট সার্ভিস জেমসের বাড়িতে রেইড করে শুধু তাই নয় রেইড হয় তার ভাই এবং
গার্লফ্রেন্ডের বাড়িতেও আর তাকে দোষী দাবি করে বসে টিজিএক্স ঘটনার সন্দেহভাজন হিসেবে। আর
রেইড চলাকালীন সময়ে জেমস নিজেও আত্মপক্ষ সমর্থনে নিজেকে নির্দোষ বলতে থাকে। অবশ্য সেখানে
পিস্তল ও অন্যান্য অনেক কিছুই জেমসের বিপক্ষে ছিলো। বাস্তব চিত্র কিন্তু অন্য রকম ছিলো অন্যান্যরা কেবল আঙ্গুল তুলে যাচ্ছিলো জেমসের দিকেই অথচ মুদ্রার অন্যপাশে জিম জোন্স যার কথা আগেই উল্লেখ করলাম, জ্বি এলবার্ট গলজানবেজ তার আরেক নাম জিম জোন্স যার শর্ট ফর্ম জে.জে আর জেমসের নামের মিল টুকুই যেনো অভিশাপ হয়ে যায় জেমসের জন্য। অফিস ম্যাক্স, টিজিএক্স সব হ্যাকিং ঘটনায় ধরা হয় জিম জোন্স কেন্দ্রবিন্দু থেকেই যুক্ত ছিলো যদিও তার কোনো প্রমাণ নেই। অফিস ম্যাক্সের ঘটনায় অনেকেই বলেন জে, জে এবং ক্রিস্টফার স্কট জেমসের কিছু বন্ধুর কাছে বেশ অনেক তথ্য পেয়েছিলো স্টোর ওয়্যারলেস নেটওয়ার্ক এবং ক্রেডিট কার্ড এক্সট্র্যাক্ট আর কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইনফরমেশন ও পাসওয়ার্ড। আর সে তথ্য ব্যবহার করেই হাতিয়ে নিচ্ছিলো টাকা। ২০০৭ সালে টিজেএক্স নামের একটি কোম্পানীর ওয়েব সাইট বেশ বড় একটা হ্যাকিং এর ঘটনা ঘটে। যার ফলে ওই কোম্পানীর অনেক ক্লাইন্টের ব্যাক্তিগত তথ্য চুরি হয়ে যায়। এছাড়াও বস্টন মার্কেট, বার্নেস এয়ান্ড নোবেল, স্পোর্টস অথরিটি, ফরেভার-২১, অফিস ম্যাক্স এবং ডেভ বাস্টার্স সহ আরো কিছু বড় বড় প্রতিষ্ঠানেও একি ধরনের হ্যাকিং এর ঘটনা ঘটে। যদিও জেমস অস্বীকার করেন যে, তিনি এগুলোর সঙ্গে জড়িত নন, তবুও তাকে বিভিন্ন তদন্তের সম্মুখীন হতে হয়। এরপর তদন্ত কর্মকর্তারা তাদের তদন্তের মাধ্যমে দেখেন যে এই ঘটনাতে জে,জে, নামে অন্য একজন জড়িত। নামটাই যেনো তার সবথেকে বড় শত্রু হয়ে দাড়ায় তখন ,নাম মিলে যাওয়াতে জেমস তাদের প্রধান লক্ষ্যতে পরিনত হন। একের পর এক জেরার মুখে পড়তে হয় তাকে।
এরপর ২০০৮ সালের ১৮ এপ্রিল জেমস এর মৃত দেহ তার বাথরুমে পাওয়া যায়। বলা হয়ে থাকে সে সময়
তার হ্যাকার কমিউনিটিতে বেশ কজন প্রতিপক্ষ ছিলো যারা সাইট হ্যাক করে সাইটে জনাথন জেমসের
নাম লিখে পোস্টার টাঙিয়ে দিতো ।একসময় জেমস বুঝতে শুরু করেন তিনি চাইলেও আর তার নিরপরাধ
হবার প্রমান দিতে পারবেন না কাউকে।আর হয়তো এটাই তার কাছে হতাশার কারন হয়ে যায় । তাই হয়তো
নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতে আত্মহননের পথ বেছে নেন, তার বাবার পিস্তল দিয়ে নিজেই নিজের মাথায়
গুলি করে আত্মহত্যা করেন। মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে জীবনের ইতি টানেন জনাথন জেমস বিখ্যাত
হ্যাকার কমরেড। রেখে যান পাঁচ পৃষ্ঠার একটি সুইসাইড নোট, যেখানে বারবার তিনি অস্বীকার করেন তিনি কোনো অপরাধ করেননি। আর এটিও বলেন আইনের উপর তার বিস্বাস নেই, তিনি জানেন যে অপরাধ তিনি করেননি তার শাস্তি হয়তো তাকে ভোগ করতে হবে। হতাশায় ডুবে যাওয়া এক হ্যাকার যেনো নিজেকে নির্দোষ প্রমান করতেই বেছে নেন আত্মহত্যার পথ।

“ I honestly, honestly had nothing to do with TJX,I have no faith in the ‘justice’ system. Perhaps my
actions today, and this letter, will send a stronger message to the public. Either way, I have lost
control over this situation, and this is my only way to regain control.
Remember, this is not about winning or losing, but about what I got or lost in 20, 10 or even 5 years
for serving a crime that I have not committed. This is not the way I ‘win’, so I would rather die
freely.