ছোটা রাজন: গ্যাংস্টার দাউদের ডান হাত থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার গল্প - প্রিয়লেখা

ছোটা রাজন: গ্যাংস্টার দাউদের ডান হাত থেকে প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠার গল্প

Sanjoy Basak Partha
Published: July 27, 2017

তার জীবনের গল্প বলিউডের সিনেমাকেও হার মানায়। সামান্য এক দরিদ্র ঘর থেকে উঠে এসে মুম্বাই মাফিয়ার অন্যতম ভয়ংকর ডন হয়ে ওঠা, দাউদ ইব্রাহিমের সবচেয়ে আস্থাভাজন থেকে ধীরে ধীরে তার প্রতিপক্ষে পরিণত হওয়া, দাউদের সাথে ইতিহাসখ্যাত বৈরিতা শুরু করা- কি নেই ছোটা রাজনের জীবনে!

পারিবারিক নাম রাজেন্দ্র সদাশিব নিখালজি। তিলকনগরের এক দরিদ্র পরিবারে জন্ম নেয়া রাজনের প্রথম অপরাধজগতে পা দেয়া চেম্বুরের সাহাকার সিনেমা হলে টিকিট কালোবাজারি করে। ভারতে ১৯৭৯ সালে জরুরি অবস্থা চলাকালীন সময়ে পুলিশ টিকিট কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো শুরু করে। ছোটা রাজন সে সময় এক কনস্টেবলের হাত থেকে লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে ৫ জন পুলিশকে গুরুতর জখম করে। সেই যে শুরু, এরপর ক্রমশ আরও গভীর থেকে গভীরতর অন্ধকারের পথে হেঁটেছেন ছোটা রাজন।

অন্ধকার জগতে ছোটা রাজনের প্রথম গুরু রাজন মহাদেব নায়ার, ওরফে বড় রাজন। ধীরে ধীরে বড় রাজনের আস্থাভাজনে পরিণত হয় ছোটা রাজন। ছোটখাটো ক্রিমিনাল ছোটা রাজনের দুনিয়া পাল্টাতে শুরু করে ১৯৮৩ সালে, তার গুরু বড় রাজনকে দক্ষিণ মুম্বাইয়ের এসপ্লানেড কোর্টের বাইরে চন্দ্রশেখর সাফালিকা ও আব্দুল কুঞ্জু মিলে খুন করলে।

ছোটা রাজন

কুঞ্জুর উপর রাজনের আগে থেকেই ক্ষোভ ছিল। বড় রাজনকে হত্যার পর পাগলের মত কুঞ্জুকে খুন করার চেষ্টা চালানো শুরু করে ছোটা রাজন। কুঞ্জু বুঝতে পেরেছিল ছোটা রাজন এত সহজে তার পিছু ছাড়বে না। রাজনের কাছেও কুঞ্জুকে হত্যার বিষয়টা তার মান সম্মানের প্রশ্নে পরিণত হয়।

ছোটা রাজনের ভয়ে কুঞ্জু পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করে, কিন্তু তাতেও রাজনের নজরছাড়া হয় না সে। পুলিশি হেফাজতেই কুঞ্জুকে খুন করার সিদ্ধান্ত নেয় রাজন। ১৯৮৪ সালের ২২ জানুয়ারি পুলিশের সামনেই গুলি করা হলেও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় কুঞ্জু। কিন্তু দ্বিতীয়বার তার ভাগ্য এত সুপ্রসন্ন ছিল না। ১৯৮৭ সালে চেম্বুরের এক ময়দানে কুঞ্জু তার লোকেদের নিয়ে ক্রিকেট খেলছিল। কুঞ্জু ভেবেছিল এতদিনে হয়তো রাজন তার কথা ভুলে গেছে। কিন্তু তার ধারণা ছিল ভুল। খেলার মাঝেই ছোটা রাজনের লোকেরা ছুরি, পিস্তল, চাপাতি সহকারে একযোগে আক্রমণ করে কুঞ্জুর উপর, এবং সেখানেই নির্মমভাবে তাকে খুন করে।

৮০’র দশকের শুরুতে মুম্বাইয়ের বিখ্যাত গ্যাংস্টার দাউদ ইব্রাহিমের সংস্পর্শে আসে ছোটা রাজন। মুম্বাইয়ে তার মাফিয়া কর্মকান্ড দেখভালের জন্য দাউদের একজন শক্তপোক্ত সাগরেদের দরকার ছিল। নিজের আনুগত্য ও পরিশ্রম দিয়ে সেই জায়গাটা দখল করতে সমর্থ হয় রাজন।

১৯৮৪ সালে দাউদ দুবাইতে পালিয়ে গেলে মুম্বাইয়ে দাউদের সব কাজ দেখার ভার পরে ছোটা রাজনের উপর। ছোটা রাজনের কর্মতৎপরতার কারণেই দুবাইতে বসেও নিজের সাম্রাজ্য বহাল তবিয়তে বজায় রাখে দাউদ। তারপর ১৯৮৮ সালে ছোটা রাজনও দুবাইয়ে দাউদের সাথে যোগ দেয়।

দাউদ ও ছোটা রাজন

দাউদের গ্যাংয়ে ছোটা রাজনের প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলছিল। দাউদও রাজনের মত বিশ্বস্ত একজনকে পেয়ে অনেক নির্ভার ছিল। রাজনের এই উত্থান দাউদের গ্যাংয়ের অনেকেই সহ্য করতে পারেনি। দাউদ-রাজনের সুসম্পর্কে ফাটল ধরানোটা তাই তাদের জন্য জরুরি হয়ে পরে। এবং সেটা তারা করে খুব সুচতুরভাবে।

ছোটা শাকিল, শারদ শেট্টি, সুনীল সাওয়ান্তরা দাউদের কানে রাজনের নামে কথা লাগানো শুরু করে। কিন্তু দাউদ রাজনকে অন্ধের মত বিশ্বাস করত বিধায় কোন কিছুতেই কাজ হচ্ছিল না। শেষ পর্যন্ত মোক্ষম চালটা চালে শাকিল-শেট্টি। দাউদের দুর্বল জায়গায় আঘাত করে তারা। দাউদের বোন হাসিনা পার্কারের স্বামী ইব্রাহিম পার্কারকে কিছুদিন আগেই নৃশংসভাবে খুন করে দাউদের প্রতিপক্ষ অরুণ গাউলির লোকেরা। ছোটা রাজন সেই হত্যার প্রতিশোধ নেয়নি, এটা মনে করিয়ে দিতেই দাউদের মনে প্রথম অসন্তোষ জমে রাজনের প্রতি।

সেই অসন্তোষ চূড়ান্ত রুপ ধারণ করে ১৯৯৩ সালের ১২ মার্চ ভয়ংকর মুম্বাই ব্লাস্টের পর। পাকিস্তানি সংস্থা আইএসআই দাউদকে ব্যবহার করে মুম্বাইয়ে স্মরণকালের অন্যতম ভয়াবহ নৃশংস সিরিজ বোমা হামলা চালায়। এই ঘটনার পর দেশে ও দেশের বাইরে দাউদ কোণঠাসা হয়ে পরে। ততদিনে দাউদ ও রাজনের মাঝে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, আর সেই সুযোগটাই নেয় ছোটা শাকিল। দাউদ-রাজনের বিচ্ছেদ ঘটে যায় পাকাপাকিভাবে।

রাজন দুবাই থেকে পালিয়ে আসার পর শুরু হয় দাউদ-রাজন শত্রুতা। ১৯৯০ এর দশকের শেষ ভাগে দাউদের সাম্রাজ্যে প্রথম বড় আঘাত হানে রাজন। দাউদের অন্যতম সহকারী ও নেপালের সংসদ সদস্য দিলশাদ বাইগকে খুন করে রাজনের লোকেরা। বাইগের মৃত্যু দাউদের জন্য ছিল বড় আঘাত, এবং রাজনের তরফ থেকে দাউদের প্রতি প্রথম প্রচ্ছন্ন আক্রমণ।

দাউদের পক্ষ থেকে প্রতিশোধের জন্য মরিয়া হয়ে উঠে ছোটা শাকিল। ২০০০ সালে রাজন যখন ব্যাংককে, শাকিল তখন রাজনকে মারার পরিকল্পনা করে। রাজন অনেক সতর্কতার সাথে থাকলেও শাকিলের লোকেরা তাকে ঠিকই খুঁজে বের করে, এবং তার উপর আক্রমণ করে। সৌভাগ্যক্রমে গায়ে বুলেট লাগলেও রাজন পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কিন্তু এরপর অনেকদিন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকতে হয় তাকে।

বহুদিন পুলিশের চোখে ফাঁকি দিয়ে চলা রাজন অবশেষে গ্রেপ্তার হয় ২০১৫ সালের ২৫ অক্টোবর, ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ থেকে। ইন্টারপোলের সহায়তায় এরপর তাকে ভারতে ফেরত আনা হয়। বর্তমানে সিবিআই এর কাস্টডিতে আছেন একসময়ের প্রভাবশালী এই মাফিয়া ডন।

আদালত প্রাঙ্গনে ছোটা রাজন

ছোটা রাজনকে নিয়ে বলিউডে এখনো কোন সিনেমা না হলেও ২০০২ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত কোম্পানি নামের একটি সিনেমায় বিবেক ওবেরয় অভিনীত চান্দু নামের একটি চরিত্র ছিল, যেটির সাথে রাজনের অনেক সাদৃশ্য পাওয়া যায়। এছাড়া ১৯৯৯ সালে সঞ্জয় দত্তের বাস্তব নামের একটি চলচ্চিত্রেও রাজনের জীবনের কিছু অংশের সাথে মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

তথ্যসূত্র- দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, এস.হুসেইন যায়েদীর ডংরি টু দুবাই