চেনা ফল কলা, অচেনা কিছু ছলাকলা - প্রিয়লেখা

চেনা ফল কলা, অচেনা কিছু ছলাকলা

ahnafratul
Published: September 13, 2017

আচ্ছা, চিন্তা করে দেখুন তো, আমাদের চারপাশে কোন ফলটি আমরা সবচেয়ে বেশি দেখতে পাই? চায়ের দোকান থেকে শুরু করে মুদির দোকান, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, ফলের দোকান সবজায়গায় রয়েছে চিরচেনা কলার দোর্দন্ড প্রতাপ। বারমাসি এই ফলটি একইসাথে যেমন সুমিষ্ট, ঠিক তেমনি এর রয়েছে নানা ধরণের গুণাগুণ। জেনে অবাক হবেন, কলা হচ্ছে একমাত্র ফল- যেটি নিয়ে গবেষক ও পুষ্টিবিদদের কোন ধরণের বিতর্ক কিংবা অভিযোগ নেই। তারা বরং উপদেশ দিয়ে থাকেন সকলকে নিয়মিত কলা খেতে। একই সাথে বলদায়ক ও প্রয়োজনীয় ক্যালরির অধিকারী কলা সকলের কাছেই সমানভাবে জনপ্রিয়।
আমাদের চিরচেনা এই কলা নিয়েই আজ কিছু কথা নিয়ে হাজির হয়েছি প্রিয়লেখায়ঃ

১) কলা যখন বেরীজাতীয় ফল!
অনেকের কাছেই বিষয়টি বেশ অদ্ভুত লাগতে পারে। ব্লু বেরী, স্ট্রবেরী, রাসবেরী ইত্যাদি ফলগুলোকেই আমরা জেনে এসেছি বেরীজাতীয় ফল হিসেবে। তাহলে এবার জেনে রাখুন প্রিয় পাঠক, যদি বেরীভুক্ত ফলের সংজ্ঞায়ন করতে হয়, তাহলে স্ট্রবেরীকে হটিয়ে সেখানে কলাই হতে পারে এর যোগ্য দাবিদার! কিভাবে?

বন্য কলার বীজ দেখতে ঠিক এমন

বেরী হচ্ছে এমন এক ফল যেটি একটিমাত্র পুষ্পের গর্ভ থেকে নির্গত হয়ে থাকে। এর ভেতর এক বা একাধিক বীজ থাকতে পারে। আপনি মনে মনে নিশ্চয়ই ভাবছেন কলার তো বীজ নেই! তবে? সত্যি বলতে গেলে, আছে। কলার বীজ এতই ছোট যে খালি চোখে তা দেখা যায় না। আরো আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে, কুমড়া, টম্যাটো এবং কিউই-এরা বেরীজাতীয় ফলের অন্তর্ভুক্ত।

২) কলার প্রজাতি কি একটিই? কখনোই নয়!
চোখ বন্ধ করে নিজেকে প্রশ্ন করুন। কত ধরণের কলা আপনি চেনেন? সোজা ভাষায় যদি উত্তর দিই, তাহলে বলা হবে দু’ধরণের কলা। প্রথমটি হচ্ছে হলদে কলা বা পাকা কলা, দ্বিতীয়টি হচ্ছে কাঁচকলা বা সবুজাভ কলা। আমাদের আশেপাশের দোকানে যেসব কলা ঝুলতে দেখা যায়, তাদেরকে বলা হয়ে থাকে ক্যাভেন্ডিস কলা। জানা আছে কি, প্রকৃতিতে অন্তত এক হাজার প্রজাতির কলা রয়েছে? হাওয়াইয়ের ট্রপিকাল অঞ্চলে ‘অ্যাপল ব্যানানা’ নামের এক ধরণের কলা পাওয়া যায়। এগুলো খেতে এত মিষ্টি যে এদেরকে অনেক সময় ক্যান্ডি অ্যাপল ব্যানানা  হিসেবেও ডাকা হয়ে থাকে। দ্য পিজান্ড রাজা  কিংবা মুজা বেলে নামক আরেক জাতের কলা রয়েছে, যেগুলো ইন্দোনেশিয়াতে জন্মায় এবং কলার নানা ধরণের মজাদার খাবার প্রস্তুতিতে এগুলো ব্যবহার করা হয়ে থাকে। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলগুলোতে প্ল্যানটেইন  নামক আরেক জাতের কলা পাওয়া যায়, যেগুলো ভাজা করে কিংবা রান্না করে খাওয়া হয়ে থাকে।

৩) কলা যখন তেজস্ক্রিয়!

শরীরের জন্য কলার কিছু উপকারী গুণ

আঁতকে ওঠার মত কিছু হয় নি, তবে হ্যা, কলা তেজস্ক্রিয় একটি ফল। চিন্তান্বিত হবার মত কিছু ঘটে নি কারণ, এটি এমন কিছু নয় যাতে আপনার এখনই কলা খাওয়া বন্ধ করে দিতে হবে বা আপনার স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে। কলায় রয়েছে উচ্চমাত্রায় পটাসিয়াম এবং কে-৪০ নামক এই পটাসিয়াম খানিকটা তেজস্ক্রিয়। তবে এটি খুবই হালকা ও ধীর। সত্যি কথা বলতে গেলে, আমাদের শরীর এরচাইতে বেশি তেজস্ক্রিয়। আমাদের শরীরকে ভালোভাবে কর্মক্ষম রাখবার জন্য প্রয়োজন বেশ ভালো পরিমাণের পটাসিয়াম মাত্রা। একজন যদি এক বসায় কলা খেয়ে এর তেজস্ক্রিয়তায় মৃত্যুবরণ করতে চায়, তাহলে তাকে কতটি কলা খেতে হবে জানেন কি? অন্তত ১ কোটি!

৪) কলা যখন অস্তিত্ব সংকটেঃ
১৯৬৫ সালে ‘পানামা’ নামক একটি ফাঙ্গাল রোগ গ্রস মিশেল  জাতের কলাকে একদম নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। এই রোগটিই বর্তমানে নতুন একটি রুপ ধারণ করেছে এবং এটি বর্তমানের জনপ্রিয় ক্যাভেন্ডিস জাতীয় কলাকে অস্তিত্ব সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। বিভিন্ন কারখানায় এবং ল্যাবে কলার প্রজাতি রক্ষা করবার জন্য নানা ধরণের পরীক্ষা নিরীক্ষা চালু হয়ে গিয়েছে যাতে আমাদের মনোকালচারের ওপর আর নির্ভর করে থাকতে না হয়। ব্যাকটেরিয়া ও ফাঙ্গাস গাছ ও বীজের নানা ধরণের ক্ষতি সাধন করতে পারে, তাই বিজ্ঞানীরা নতুন জাতের কলা উৎপাদনে সচেষ্ট হয়েছেন।

৫) পশ্চিমা বিশ্বে কলাই জনপ্রিয়!


যদি আপনাকে জিজ্ঞাসা করা হয়, পশ্চিমা বিশ্বের মানুষের কাছে জনপ্রিয় খাবার কি? কেউ বলে উঠবেন বার্গার, কেউ স্টেক, কেউ ফিশ ফ্রাই, কেউ ফ্রেঞ্চ ফ্রাই- অনেকে আরো নানা ধরণের খাবারের কথা বলবেন। তবে সত্য কথা কি জানেন? একজন আমেরিকান বছরে প্রায় ৩৫ পাউন্ডের মত কলা ভক্ষণ করে থাকেন, যেটির গ্রাফ অন্যান্য আরো জনপ্রিয় সব খাবারের তুলনায় অনেক উর্ধ্বে। ১৮৭০ সালে দক্ষিণ আমেরিকায় সর্বপ্রথম কলা নামক এই সুস্বাদু ফলটি আসে তবে মধ্যে আমেরিকায় পৌছতে পৌছতে বেশ দেরি হয়ে যায়। সালটি হল ১৮৯৮।

৬) সকল মিষ্টি কলাই হলুদ নয়!

কলা কিন্তু লালও হয়!

আমরা যখন ফলের দোকানে কিংবা সুপারমার্কেটে কলা কিনতে যাই, তখন কি দেখি? উজ্জ্বল হলুদ বর্ণের কলার খোঁজই কিন্তু করি আমরা। এই রঙের মানে হচ্ছে কলাটি বেশ পেকেছে। আবার অনেকে হালকা সবুজ বর্ণের কলাও ঘরে নিয়ে যাই, যাতে সেগুলো ঘরেই পেকে যায়। তবে পৃথিবীতে অন্যান্য জাতের কলাও রয়েছে, যেগুলোর বর্ণ হলুদ নয় কিন্তু এরা পাকা কলা। যেমনঃ অস্ট্রেলিয়ায় দ্য রেড ডাক্কা  নামক এক প্রজাতির কলা জন্মে যেগুলো লাল বর্ণের কিন্তু যখন পেকে যায়, তখন এদের বর্ণ হয় হালকা গোলাপী।

৭) যখন ৫০ শতাংশ ডিএনএ কলার সাথে মিলে যায়!
আপনি হয়ত জানেন না, কলার সাথে আমাদের ডিএনএর মিল প্রায় ৫০ শতাংশ! তবে ভয় পাবার কারণ নেই। কলা আমাদের পূর্বপুরুষও নয় কিংবা তাদের খাওয়া কোন ধরণের গণহত্যাও নয়। মূলত, মানুষের ডিএনএ শুধুমাত্র কলাগাছের সাথেই নয়, এ পৃথিবীর অনেক গাছগাছালির সাথেই মিল বহন করে। ডিএনএ তৈরির মূল ভিত্তিটা তৈরি করা হয়েছে নানা ধরণের উদ্ভিদ, মাইক্রোঅর্গানিজমের দ্বারা। মানুষ কোন প্রাণীর সাথে সবচাইতে বেশি মিলবিশিষ্ট ডিএনএ বহন করে জানা আছে কি?
শিম্পাঞ্জী। আর মিলে যাবার শতাংশটাও অনেক বিশাল। ৯৮ শতাংশ!

কলার আরো কিছু ছলাকলা সম্পর্কে জানতে যান এই লিঙ্কে।

আজ আর নয়। থাকুন প্রিয়লেখার সাথেই, সকলের প্রিয় হয়ে।