চায়না টাউন, প্রযত্নে কলকাতা - প্রিয়লেখা

চায়না টাউন, প্রযত্নে কলকাতা

Ranju Prasad Mandal
Published: September 16, 2017

চিন থেকে অনেক দূরে এ এক অন্য চৈনিক সভ্যতা। যেখানে গাঙ্গেয় অববাহিকার ভেজা হাওয়ায় ভাসতে থাকে কোন এক দিন চিনের মহাপ্রাচীর ছুঁয়ে দেখার রঙীন স্বপ্ন। কলকাতার মধ্যে এ এক অন্য কলকাতা। কিছু রাস্তা এবং কিছু গলি জুড়ে থাকা বেটেখাটো, ফরসা, মিষ্টি হাসির কিছু মানুষ যাদের মুখের ভাষা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই হিন্দি, বাংলা বা ইংরেজী- এমনই বৈচিত্র‍্যে ভরা ‘ভারতের প্রাচীনতম চায়না টাউন’। যেখানে স্বাতন্ত্র্য ও বহমানতার এক আশ্চর্য সহাবস্থান।

ভারতবর্ষ তথা বাংলার সাথে চৈনিক সংযোগ অবশ্য বেশ প্রাচীন। আমাদের প্রাত্যহিকতা জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ‘চিনি’ বা ‘চিনেমাটি’র মত শব্দগুলো সেই সম্পর্কেরই পরিচয়বাহী। পঞ্চম শতাব্দীতে চিনা পরিব্রাজক ফা-হিয়েনের আগমন ঘটে তাম্রলিপ্ত (অধুনা তমলুক) বন্দরে। তার সাথে অবশ্য কলকাতার চিনেপাড়ার কোনই যোগসূত্র নেই। পলাশির যুদ্ধের পর থেকেই বাংলায় আসা শুরু করেন এই চিনেম্যানরা। সময়টা ১৭৭৮, গভর্নর জেনারেল তখন ওয়ারেন হেস্টিংস। কিছু সঙ্গীসাথী সহযোগে কলকাতা বন্দরে পদার্পন করেন ক্যান্টনের চা ব্যবসায়ী ইয়াং তাই চাউ (পরবর্তীতে টং আছু)। এই টং আছুর হাতেই কলকাতার অদূরে গড়ে ওঠে ভারতের প্রথম চায়না টাউন যা পরিচিত হয় ‘আছিপুর’ নামে। গড়ে ওঠে চিনিকল। যদিও তার এই শিল্পোদ্যোগ সাফল্য লাভ করেনি এবং পরের বছর তার মৃত্যুর সাথে সাথেই তার সহযোগীরা চলে আসেন কলকাতায়। কলকাতায় তখন শ্রমজীবী চিনাদের আগমন অব্যাহত। মূলত এই চিনারাই জীবন ও জীবিকার তাগিদে গড়ে তুললেন কলকাতা চায়না টাউন। ১৭৯২ সালের মানচিত্রে প্রথম হদিস মেলে কলকাতার চিনাদের। তার সাথে করে এনেছিলেন তাদের ধর্ম, উৎসব, ভাষা এবং অবশ্যই খাবার। কলকাতায় বিখ্যাত হয়ে উঠল তাদের চিকিৎসা পদ্ধতি, এবং অবশ্যই জুতো তৈরিতে তাদের মুন্সিয়ানা। কলকাতায় চাইনিজ জুতোর সুখ্যাতি বজায় ছিল বহুদিন। কিন্তু সব থেকে গুরুত্বপূর্ন বোধহয় বাঙালীর খাদ্যাভ্যাসে চাইনিজ খাবারের সদর্প অনুপ্রবেশ- চাউমিন, ডাম্পলিং, পাও বান, স্প্রিং রোল এই সব। পাঠকদের উদ্দেশ্যে জানাই, টেরিটি বাজারে রবিবার সকাল সকাল এখনো বসে ঘরে তৈরী অথেন্টিক চাইনিজ খাবারের পসরা। কলকাতা ভ্রমনের একটি আবশ্যিক অনুষঙ্গ হতে পারে চায়না টাউনের এই জলযোগ।

এতদিনের কলকাতাবাসে অবশ্য চিনাদের ভাষা, খাদ্যাভ্যাস, ধর্মচর্চার বাঙালীকরন ঘটেছে বেশ কিছুটা। আর এখান থেকেই হয়তো শুরু হয়েছে শেকড় ছেঁড়ার টান। এর সাথে যুক্ত হয়েছে বেশ কিছুটা অবহেলাও। জন্মসূত্রে ভারতীয় এই চৈনিকরা নিজভূমে পরবাসী। কলকাতা হয়তো খুব আপন করে নেয়নি তাদের। ‘হাক্কা’ শব্দের চৈনিক অর্থই যে অতিথি বা অভ্যাগত। তাইতো ১৯৬২র ভারত চীন যুদ্ধের সময় চরবৃত্তির সন্দেহে সাময়িকভাবে নির্বাসিত হতে হয় তাদের। সাম্প্রতিক সময়ে ডোকালাম-প্রসঙ্গেও খোঁজ পরে তাদের অভিমতের। কিন্তু কখন যে তারা হয়ে উঠেছে আপাদমস্তক কলকাতাবাসী সেটাই বোধহয় ভুলে যাই আমরা। এছাড়া তাদের মূল পেশা ট্যানারি বা জুতো বিক্রির ওপর পড়ে পরিবেশ দূষনের খাঁড়া। কেউ কেউ জীবিকা পরিবর্তন করে খোলে চাইনিজ রেস্তোঁরা, বাকিরা পাড়ি জমায় নতুন নতুন ঠিকানায়, নতুন নতুন দেশে, অনেকটা অভিমান বুকে চেপেই। একসময়ে প্রায় পঞ্চাশহাজার বাসিন্দার এই চায়না টাউনে এখন বাসিন্দার সংখ্যা হাতে গোনা, দু-হাজারের আশেপাশে। চায়নাটাউনের ঐতিহ্য ধরে রেখেছে মূলত তাদের খাবার। তাই কলকাতা জুড়ে এখন চাইনিজ খাবারের রমরমা।


কলকাতার এই চায়না টাউনের প্রবীন বাসিন্দারা হয়তো এখনো আশায় বুক বাঁধেন। টিমটিম করে হলেও প্রকাশিত হয় অর্ধশত বর্ষ পার হওয়া ভারতের একমাত্র চিনাভাষার দৈনিক- ‘ওভারসিজ চাইনিজ কমার্স অফ ইন্ডিয়া’। সেই আশাতেই তারা নববর্ষে ঘর সাজান বাহারি লণ্ঠনে, অনুষ্ঠিত হয় সিংহ বা ড্রাগন নাচের উৎসব, খাবারের গন্ধে ম-ম করে এলাকার বাতাস। খাবার নাকি আকাঙ্খার সুঘ্রাণে? এবারের কলকাতা ভ্রমনে তাহলে একবার ঢুঁ মেরেই যান কলকাতার এই সুপ্রাচীন চায়না টাউনে। কি বলা যায় বহুতলের চাপে কবে হারিয়েই যায় বেটেখাটো, ফরসা, মিষ্টি হাসির এই মানুষগুলো।