গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ও একজন রাজার গল্প - প্রিয়লেখা

গ্রীক বীর আলেকজান্ডার ও একজন রাজার গল্প

ahnafratul
Published: September 5, 2017

“জীবনের শুরুর দিনগুলো থেকেই অলিম্পিয়াস তাকে দেবদূত ও নায়কদের বংশোদ্ভূত হিসেবে মেনে নিয়েছিল। শেষ নিঃশ্বাস অবধি তিনি এমন কোন কাজ করেন যাতে এই বিশ্বাসের কোন ধরণের ভুল ধারণা অলিম্পিয়াসের মাঝে আসতে পারে।”

ওয়েলেসলি কলেজের অধ্যাপক গাই ম্যাকলিয়ান ২০০৪ সালে তার লেখা বই “আলেক্সান্ডার”-এ ঠিক এই কথাগুলোই বলেছেন। বইটি প্রকাশিত হয় র‍্যান্ডম হাউজ থেকে।

পাঠক, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝে গিয়েছেন আজকের প্রিয়লেখার আয়োজন কাকে নিয়ে। জ্বী, ঠিক ধরেছেন। গ্রীক মহাবীর আলেকজান্ডারকে নিয়েই আমাদের আজকের আয়োজনঃ

মেসিডোনিয়ার রাজা আলেকজান্ডার তার রাজত্ব বিস্তৃত করেছিলেন বলকান থেকে শুরু করে আজকের পাকিস্তান পর্যন্ত। তার বাবার ছিলেন দ্বিতীয় ফিলিপ ও মা অলিম্পিয়াস। ফিলিপের স্ত্রী ছিল সাতজন (মতান্তরে আটজন) এবং তাদের মাঝে একজন, অলিম্পিয়াসের গর্ভে জন্ম নেন আলেকজান্ডার। আলেকজান্ডারের জন্ম ৩৫৬ বি.সি, জুলাইয়ের ২০ তারিখ।

আলেকজান্ডার ছিলেন একজন দূরদর্শী শাসক ও যোদ্ধা। তার স্বপ্ন ছিল বিস্তৃত এবং তা বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে তিনি কঠোর পরিশ্রম করতেন। তিনি তার সৈনিকদের একটি নির্দিষ্ট স্ট্র্যাটেজি বা কৌশলের মাঝে অবস্থান করাতেন, যার ফলে অনেকগুলো যুদ্ধে তাকে জয়ী হতে সাহায্য করে। এমনকি তিনি কোনঠাসা হয়ে পড়লেও বুদ্ধির জোরে এবং পরিকল্পনার মাধ্যমে প্রতিকূল অবস্থা থেকে বের হয়ে এসেছেন। তিনি অনেককে অনুপ্রাণিত করেছেন তার কৌশল ও নীতির মাধ্যমে।

তবে প্রাচীন কিছু সূত্র ঘেঁটে জানা যায়, এতসব অর্জনের পরও তার রাজ্যের কিছু লোক তার ওপর অসন্তুষ্ট ছিলেন এবং তার কাছের কিছু লোকই তার হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত ছিল। আলেকজান্ডার তার সৈনিকদের পুরস্কার দেয়ার মাধ্যমে ও তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধি করবার মাধ্যমে প্রণোদনা ও উৎসাহ দিতে পছন্দ করতেন।

সুসান অ্যাবারনাথি, একজন ইতিহাসবিদ বলেন,

“আলেকজান্ডার ছিলেন একজন ক্যারিশমাটিক চরিত্র। তা থাকা সত্ত্বেও তার চরিত্রের মাঝে বেশ কিছু দূর্বোধ্যতা ছিল, বিশেষ করে তার বয়স ত্রিশ বা এর কাছাকাছি হবার পর থেকেই এই দূর্বোধ্যতাগুলো শুরু হয়। তবে একথা ঠিক, নিজ সৈনিকদের মোটিভেট করবার এক অসাধারণ গুণ আলেকজান্ডারের মাঝে ছিল, যা তাকে অসম্ভব কিছু যুদ্ধে জয়ী হতে সাহায্য করে।”

আসুন আজ জেনে নিই, আলেকজান্ডার ও রাজা পোরাসের মাঝে আমাদের অতি পরিচিত এক যুদ্ধের কাহিনী। যে যুদ্ধের মাধ্যমে এই উপহাদেশে আলেকজান্ডারের আসন আরো দৃঢ় হয়েছিল, তার সম্পর্কেই কিছু জানব আমরা আজ।

আলেকজান্ডার ও একটি গল্পের আসল কাহিনীঃ

মধ্য এশিয়াতে আলেকজান্ডারের দিনগুলোতে সবাই বেশ সুখে কাটায় নি। ৩২৭ বি.সিতে তার সৈন্যরা একটি দূর্গ দখল করেছিল। জায়গাটির নাম ছিল সগডিয়ান রক। এখানে আলেকজান্ডার একজন স্থানীয় শাসকের কন্যার সাথে পরিচিত হন, যার নাম ছিল রোজানা (Roxana). রোজানার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন আলেকজান্ডার।

তার সৈনিকদের শারীরিক অবস্থা কিছুটা শোচনীয় থাকা সত্ত্বেও আলেকজান্ডার “ইন্ডিয়া” নামক একটি স্থানে পা রাখেন (যদিও তিনি যে স্থানে এসেছিলেন, সেটিকে আজকের দিনে পাকিস্তান বলা হয়)। এখানকার স্থানীয় শাসক তক্ষশীলের সাথে তিনি মৈত্রী স্থাপন করেন এবং তক্ষশীলের শহর, তক্ষশীলায় কার্যক্রম চালানোর জন্য রাজী হন। এছাড়াও প্রয়োজনীয় রসদ, সৈনিক ও খাবার ইত্যাদিও তক্ষশীল আলেকজান্ডারকে সরবরাহ করেন।

এর বদলে, আলেকজান্ডার রাজা পোরাসের সাথে যুদ্ধ করতে রাজী হন। ৩২৬বি.সিতে এই দুই রাজার বাহিনী হাইদাস্পেস নদীর কাছে এসে মিলিত হয়। শুরু থেকেই রাজা পোরাস একটি রক্ষণাত্মক ভূমিকায় ছিলেন। এখানে আলেকজান্ডার একটি মজার কাজ করেন। তিনি পোরাসের চারপাশে গিয়ে একটি নকল সতর্কতাবাণী তৈরি করেন, যার মাধ্যমে পোরাসকে বার বার বলা হয় আলেকজান্ডার তাকে আক্রমণ করতে আসছেন। রাজা পোরাস এত বিরক্ত হয়ে যান যে একসময় এই সতর্কতা তিনি উপেক্ষা করা শুরু করেন।

আলেকজান্ডার এরপর নদীর ধারে একটি স্থান বেছে নেন এবং রাতের আঁধারে সমস্ত সৈনিকদের একটি জায়গায় জড়ো করেন। পোরাস যখন তার সৈন্যদের একত্রিত করতে যান, তখন তিনি খেয়াল করলেন তিনি একটি বাঁধার মুখে পড়েছেন। এরপর তিনি তার ২০০ হাতিকে সামনে নিয়ে আসেন। এত সুবিশাল হাতির বহর মেসিডোনিয়ান যোদ্ধারা আগে কখনো দেখে নি। তারা একটু ভড়কে যায়।

আলেকজান্ডার এই সুযোগের অপেক্ষাতেই ছিলেন। তিনি তার সৈনিকদের মাধ্যমে পোরাসের সবচেয়ে শক্তিশালী অংশ, হাতিদের আক্রমণ করতে থাকেন। এর ফলে পোরাসের ঘোড়া, পদাতিক বাহিনী ও হাতি- সবগুলো দিশেহারা হয়ে যায়। অবস্থা আরো বেশি খারাপ হয়ে যায়, যখন পোরাসের জখমী হাতিগুলো পাগল হয়ে ওঠে এবং আলেকজান্ডার ও পোরাসের সৈনিকদের পায়ের তলায় পিষে মারতে শুরু করে।

দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের সৈনিকদের করুণ অবস্থা দেখছিলেন পোরাস। যুদ্ধবন্দী হবার আগ পর্যন্ত পোরাস সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। আরিয়ান তার একটি পার্চমেন্ট স্ক্রিপ্টে লিখেছেন,

পোরাসকে মেসিডোনিয়ান রাজার সামনে যখন আনা হয়, তখন তিনি আলেকজান্ডারকে বলেছিলেন, “আমার সাথে একজন রাজার মত ব্যবহার কর, আলেকজান্ডার।”

তার এই কথায় মুগ্ধ হয়ে আলেকজান্ডার পোরাসের সাথে মৈত্রী স্থাপন করেন।

(তথ্যসূত্রঃ লাইভ সাইন্স হিস্টোরি)

 

আজ এ পর্যন্তই। প্রিয়লেখার সাথেই থাকুন।