গিলবার্ট জেসপ: ক্রিকেটের প্রথম হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান - প্রিয়লেখা

গিলবার্ট জেসপ: ক্রিকেটের প্রথম হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান

Sanjoy Basak Partha
Published: January 1, 2018

হালের ক্রিস গেইল, এ.বি.ডি. ভিলিয়ার্স, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলদের হার্ড হিটার হিসেবে সুপরিচিতি আমাদের সকলের জানা। কিন্তু গিলবার্ট জেসপের সম্পর্কে আপনি কতটা জানেন? ক্রিকেটের প্রথম হার্ডহিটার ব্যাটসম্যান হিসেবে ধরা হয় যাকে, সেই গিলবার্ট জেসপের সাথে আজ আপনাদের পরিচয় করাবো প্রিয়লেখার পাতায়।

ক্রিকেটের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুত রান তোলার ক্ষমতার অধিকারীদের একজন ধরা হত এই গিলবার্ট জেসপকে। ১৮৯৮ সালে উইজডেন ক্রিকেটার অফ দ্য ইয়ার হওয়া জেসপের জন্ম ১৮৭৪ সালে ইংল্যান্ডের গ্লস্টারশায়ারে। ক্যারিয়ারজুড়ে ফাস্ট বোলার থাকলেও জেসপ সুপরিচিত হন তার বিগ হিটিং ক্যাপাবিলিটির কারণে। তার কারণও আছে যথেষ্ট। ক্যারিয়ারজুড়ে বোলারদের তো আর কম পেটানো পেটাননি!

গ্লস্টারশায়ারের হয়ে জীবনের প্রথম ম্যাচ খেলতে নেমে মুখোমুখি হওয়া প্রথম বলেই বল বাউন্ডারি ছাড়া করে বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, তিনি অন্য ধাঁচের ব্যাটসম্যান। ২১ বছর দীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রতিটা সময়েই তিনি নিজের এই ধারা বজায় রেখেছিলেন। জেসপের দ্রুত রান তোলার ক্ষমতার প্রমাণ দেবে কিছু তথ্য। তাঁর সময়ের সেরা সব ব্যাটসম্যানদের সাথে একটা তুলনায় যাওয়া যাক। ডব্লিউ জি গ্রেস ও লেন হাটন ১ ঘণ্টা ব্যাটিং করে গড়ে রান করতেন ৩৬। সিবি ফ্রাই ও এফ.এস জ্যাকসন ঘণ্টাপ্রতি তুলতেন ৪০ রান। জ্যাক হবস, ক্লেম হিল ও ওয়ালি হ্যামন্ড তুলতেন ৪৩ রান। কম্পটন ও ব্র্যাডম্যান তুলতেন ৪৭ রান করে, ম্যাকাবে ও রণজি তুলতেন ঘণ্টাপ্রতি গড়ে ৫০ রান। দুলীপসিংজি ঘণ্টায় তুলতে পারতেন গড়ে ৫২ রান, আর ভিক্টর ট্রাম্পার পারতেন ৫৫ রান তুলতে।

আর জেসপ? ক্যারিয়ারে যেই ১৭৯ বার পঞ্চাশ ছাড়ানো ইনিংস খেলেছেন, সেগুলোতে ঘণ্টায় ৭৯ করে রান তুলেছেন জেসপ! সেঞ্চুরি পেরোনো ইনিংসগুলোতে তো আরও বিধ্বংসী ছিলেন জেসপ। যেই ৫৩ বার সেঞ্চুরি করেছেন তিনি, সেগুলোতে ঘণ্টাপ্রতি রান তুলেছেন ৮৩ করে। আজকের ধুমধারাক্কা ক্রিকেটের যুগে এটা হয়তো কোন ব্যাপার নয়, কিন্তু তখনকার সময়ে ঘণ্টাপ্রতি ৮০ রান তুলতে পারা মানে ছিল বিশাল ব্যাপার।

১৮৯৪ থেকে ১৯১৪- ক্যারিয়ারজুড়ে প্রায় ২৬ হাজারের মত রান করেছেন জেসপ। তবে নিশ্চিতভাবেই তাঁর রানসংখ্যা বাড়তে পারত আরও, পারেনি তখনকার ক্রিকেটের অদ্ভুত নিয়মের কারণে। তখন ছয় হতে হলে শুধু বাউন্ডারি ছাড়া করলেই হত না, বল ফেলতে হত স্টেডিয়ামের বাইরে! বল যদি উড়ে গিয়ে গ্যালারিতেও পরে, তাহলেও সেটিকে ছয় না দিয়ে চার হিসেবে ধরা হত। ক্যারিয়ারে মোট ৫৩ বার সেঞ্চুরি করেছেন জেসপ (৫ বার ডাবল সেঞ্চুরিও করেছেন), তিনি যখন অবসর নেন তখন মাত্র ১৩ জন ব্যাটসম্যানের তাঁর চেয়ে বেশি সংখ্যক সেঞ্চুরি ছিল। চার বার একই ম্যাচে জোড়া সেঞ্চুরির নজির ছিল জেসপের, কেবল সিবি ফ্রাইয়েরই ৫ বার এই রেকর্ড ছিল। তাঁর সেঞ্চুরি ছাড়ানো ইনিংসগুলোর গড় স্কোর ছিল ১৪০, যা সময়ের সেরা ব্যাটসম্যানদের সাথে পাল্লা দেয়ার যোগ্য। ডব্লিউ জি গ্রেসের সেঞ্চুরি ছাড়ানো ইনিংসগুলোর গড় স্কোর ছিল ১৪৬, ভিভ রিচার্ডসের ১৪৪, জিওফ বয়কটের ১৪০ ও স্যার জ্যাক হবসের ১৩৪।

তবে বাকি ব্যাটসম্যানদের সাথে জেসপকে মেলানো হবে বড় এক ভুল। ঝড়ো ব্যাটিং করে যে ম্যাচের গতিপ্রকৃতিই পাল্টে দিতেন তিনি। জেসপের ভয়ে প্রতিপক্ষ অধিনায়ক ইনিংস ঘোষণা করার মত যথেষ্ট স্কোর কোনটা তা নির্ধারণ করতে পারতেন না। ক্যারিয়ারে মাত্র একবারই ৩ ঘণ্টার বেশি উইকেটে কাটাতে পেরেছেন তিনি (২০০ মিনিটে করেছিলেন ২৪০ রান)। দুই ঘণ্টার বেশি ব্যাট করেছেন মাত্র ১০ বার, আর ৮৪০ ইনিংসের মধ্যে মাত্র ৩৫ বার ব্যাট করতে পেরেছেন দেড় ঘণ্টার বেশি! তারপরেও ক্যারিয়ারে প্রায় ২৬ হাজার রান থাকাই সাক্ষ্য দেয়, কত বিধ্বংসী ব্যাটিং করতে পারতেন জেসপ।

জেসপ ব্যাট করতে নেমেছেন শুনলে মাঠে দর্শকদের ঢল নেমে যেত। জেসপ মানেই যে নির্মল আনন্দের হাতছানি! ১৯০৩ সালে হোভে খেলতে নেমে মাত্র ১৭০ মিনিটে ৩৫৫ বল খেলে ২৮৬ রান করেছিলেন! তাঁর প্রতিটি সেঞ্চুরি করতে গড়ে সময় লাগত ৭২ মিনিট, বেশিরভাগ মৌসুমেই যা দ্রুততম সেঞ্চুরির খেতাব এনে দিত জেসপকে।

এক ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে সেঞ্চুরি পার করেছেন মোট ১২ বার। জেসপের ক্যারিয়ারের দ্রুততম সেঞ্চুরি ছিল মাত্র ৪০ মিনিটে, ইয়র্কশায়ারের বিপক্ষে। ১৯০৭ সালের এক ম্যাচে ৪২ মিনিটে সেঞ্চুরি করে ফেলেছিলেন, শেষ পর্যন্ত মাত্র ৯০ মিনিটে ১৯১ করে মাঠ ছেড়েছিলেন সেদিন! দ্রততম সময়ের মধ্যে সেঞ্চুরি করার জেসপের এই রেকর্ড টিকে ছিল বহুদিন।

দ্রুততম সময়ের মধ্যে ডাবল সেঞ্চুরি করার রেকর্ডটি অবশ্য এখনো জেসপের দখলেই। ২৮৬ রানের ইনিংসটি খেলার পথে মাত্র দুই ঘণ্টায় ২০০ করেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় দ্রুততম ডাবল সেঞ্চুরিটিও জেসপেরই, ১৯০৫ সালে সমারসেটের বিপক্ষে ২৩৪ রানের ইনিংস খেলার পথে ১৩০ মিনিটে ডাবল সেঞ্চুরি করেছিলেন জেসপ। ১৯০১ সালে লর্ডসে ২৩৩ রানের ইনিংস খেলার পথে ১৩৫ মিনিটে ২০০ করেছিলেন তিনি!

হ্যাস্টিংসে তাঁর ১৯১ রানের ইনিংসটির কথাই বিবেচনা করুন। বিধ্বংসী ওই ইনিংসটি খেলার পথে ৫ বার বল স্টেডিয়াম ছাড়া করেছিলেন, এছাড়া আরও ১১ বার বল উড়িয়ে নিয়ে ফেলেছিলেন গ্যালারিতে। কিন্তু তখনকার নিয়ম অনুযায়ী সেগুলোকে ধরা হত চার করে। সেগুলোও যদি ছয় হত, জেসপের রান ১৯১ এর বদলে গিয়ে দাঁড়াত ২১৩ তে। এভাবে ক্যারিয়ারে বহু রান নষ্ট হয়েছে তাঁর।

টেস্ট ক্রিকেটে জেসপের সেরা দিনটি ছিল ১৯০২ সালের ১৩ আগস্ট ওভালে। খারাপ উইকেটে অস্ট্রেলিয়াকে হারাতে ২৬৩ রান দরকার ছিল ইংল্যান্ডের। কিন্তু ১০ রানেই ৩ উইকেট হারিয়ে বসে তারা, জেসপ যখন নামছেন তখন ইংল্যান্ডের স্কোর ৫ উইকেটে ৪৮! অস্ট্রেলিয়ার জয়ই তখন মনে হচ্ছিল একমাত্র সম্ভাব্য ফল, কিন্তু জেসপ সব ওলট পালট করে দিলেন। ওই খারাপ উইকেটেই মাত্র ৭৭ মিনিটে ১৩৯ বলে ১০৪ রানের ইনিংস খেলে ইংল্যান্ডকে জিতিয়ে দিলেন ১ উইকেটে!

জেসপের ক্যারিয়ারের একটি মাত্রই দুর্বলতা, ক্যারিয়ারের বেশিরভাগ ইনিংসই তিনি খেলেছেন দেশের মাটিতে। তখনকার সময়ে বিদেশ ভ্রমণের জন্য বিমান ছিল না, সমুদ্রপথে জাহাজ যাত্রায় এক দেশ থেক আরেক দেশে যেতে হত। জাহাজ যাত্রায় জেসপ অসুস্থ বোধ করতেন বলে তিনি বাইরের দেশে খেলতে যেতেন না। একবার কেবল অস্ট্রেলিয়ায় জাহাজ পাড়ি দিয়ে খেলতে গিয়েছিলেন তিনি। আরও কয়েকবার আমন্ত্রণ পেলেও তা প্রত্যাখান করে দেন।

ব্যাটিংয়ের মত বোলিংয়েও দক্ষ ছিলেন জেসপ। ১৯০০ সালে জেসপ মাত্র ৩য় ক্রিকেটার হিসেবে এক মৌসুমে ২০০০ রান ও ১০০ উইকেট পাওয়ার কৃতিত্ব অর্জন করেন। শুধু ব্যাটসম্যান বা বোলার জেসপ নন, ফিল্ডার জেসপও কম বিখ্যাত ছিলেন না। কাভার অঞ্চলে তাঁর ফিল্ডিং ছিল বিদ্যুৎগতির।

জেসপের সম্পর্কে সবচেয়ে উপযুক্ত মন্তব্যটা হয়তো করেছিলেন প্রয়াত কিংবদন্তি রিচি বেনো। বেনো বলেছিলেন, “জেসপই সম্ভবত সবচেয়ে সেরা ওয়ানডে ক্রিকেটার, যে কোনোদিন ওয়ানডেই খেলেনি।”

ক্রিকইনফো অবলম্বনে