খাজুরাহো মন্দিরঃ দ্য টেম্পল অফ লাভ - প্রিয়লেখা

খাজুরাহো মন্দিরঃ দ্য টেম্পল অফ লাভ

farzana tasnim
Published: October 29, 2017

খাজুরাহো মন্দিরকে ভারতের অন্যতম সৌন্দর্য্যমন্ডিত মন্দির হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিল্পের দিক থেকে বিবেচনা করলে এই ধরনের মন্দির ভারতে আর দ্বিতীয়টি নেই। এই অঞ্চলে অনেকগুলো মন্দির রয়েছে তাই এই মন্দিরকে গুচ্ছ খাজুরাহো মন্দির বলা হয়। এই মন্দিরকে Temple of Love বলা হয়, কারণ এখানে দেবতাদের ভালবাসার প্রতিকৃতি কারুকার্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে।

খাজুরাহো মন্দিরটি ভারতের মধ্যপ্রদেশে অবস্থিত এবং এটি ইউনেস্কোর অন্যতম হেরিটেজ সাইট। খাজুরাহোর মন্দিরগুলো নির্মিত হয়েছিল চান্দেলা রাজবংশের সময়, ৯৫০-১০৫০ সালের মধ্যে। ঐতিহাসিক সূত্রমতে জানা যায়, এখানে ২০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে ৮৫টি মন্দির বিস্তৃত ছিল। কিন্তু বর্তমানে ২০টি মন্দির টিকে আছে। মুসলিম শাসনের সূচনার দিকে মন্দিরগুলোর অধিকাংশই ধ্বংস করা হয়। এখানে যে মন্দিরগুলো রয়েছে সেগুলো মূলত হিন্দু ও জৈন ধর্মাবলম্বীদের মন্দির।

খাজুরাহো মন্দিরের নির্মানের ইতিহাস সম্পর্কে তেমন কিছুই জানা যায় না। ঐতিহাসিক আবু রায়হান আল-বেরুনী ও ইবনে বতুতার বর্ণনা থেকে এই মন্দির সম্পর্কে কিছু মাত্র ধারণা পাওয়া যায়। ১০২২ সালে আল বেরুনী মাহামুদ গজনীর সাথে ভারত বর্ষে এসে ছিলেন মন্দির লুন্ঠনের উদ্দেশ্যে, কিন্তু তাদের সেই উদ্দেশ্য সফল হয় নি। এই অঞ্চলের রাজা তাদের সাথে শান্তি চুক্তি করেন। আল বেরুনী তার এই অভিযানের বিবরনীতে এই মন্দির গুলোর কথা উল্লেখ করেন। ধারণা করা হয় ১২ শতাব্দী পর্যন্ত এই মন্দিরগুলো অক্ষত ছিল। ১৩ শতকে চান্দেল রাজ্য কুতুব উদ্দিন আইবেকের অধীনে আসে। ঠিক এর ১০০ বছর পর ইবনে বতুতা এই অঞ্চল ভ্রমণ করেন এবং তার ভ্রমণ বিবরণীতে বলেছেন- মন্দিরগুলোতে যোগ গুরু থাকত এবং সাধারণ মানুষ তাদের কাছ থেকে যোগ শিক্ষা নিত।

ঐতিহাসিক তেমন কোন নথি না থাকায় খাজুরাহো মন্দির নির্মানের উদ্দেশ্য কী ছিল সে সম্পর্কে জানা যায় না। তবে এই মন্দিরগুলো নির্মান প্রসঙ্গে বিভিন্ন মিথ প্রচলিত আছে। যদি মিথগুলোকে সত্য ধরা হয় তবে এর উদ্দেশ্য ও ইতিহাস সম্পর্কে অল্প ধারণা পাওয়া যায়।

বলা হয়ে থাকে, বারানসীর এক ব্রাহ্মণের এক অনিন্দ্য সুন্দরী কন্যা ছিল। নাম তার হেম্বতী। কিন্তু ব্রাহ্মণের এই কন্যা খুব অল্প বয়সেই বিধবা হয়। জ্যোৎস্নাশোভিত গ্রীষ্মের রাতে এই বিধবা কন্যা পদ্মপুকুরে স্নান করতে গেলে চন্দ্র দেবতা তার সৌন্দর্যে মোহিত হয়ে পড়েন। পরে চন্দ দেবতা মানুষের রূপ নিয়ে পৃথিবীতে আসেন, এবং তারা দুই জনে একে অন্যের সাথে মিলিত হন। যখন তাদের মোহ কাটে তখন চন্দ্র দেবতা নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং নিজে নিজেকে অভিশাপ দিতে থাকেন একজন বিধবার সাথে এই ধরনের অনৈতিক কাজের জন্য। সেই সাথে চন্দ্রদেবতা হেম্বতীতে অর্শিবাদ করেন যে, তার গর্ভে যে সন্তান জন্ম হবে সেই সন্তান হবে সিংহ পুরুষ এবং বিশাল ক্ষমতার অধিকারী।

এই ঘটনার পর হেম্বতী নিজ গৃহ ত্যাগ করে খাজুরপুর (খাজুরাহো) আসেন এবং এখানে একটি পুত্র সন্তানের জন্ম দেন। সন্তানের নাম রাখেন চন্দ্রবর্মন। চন্দ্রবর্মনের সাহস ও শক্তি সম্পর্কে বলা হয় যে, মাত্র ১৬ বছর বয়সে সে খালি হাতে বাঘ ও সিংহ শিকার করতে পারত। পরবর্তীতে তিনি চন্দ্র দেবতার আর্শিবাদের কারনে এই অঞ্চলের রাজা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। তিনি তার মায়ের ইচ্ছায় এই অঞ্চলে ৮৫টি মন্দির নির্মান করেন। এই মন্দিরগুলো হ্রদ ও বাগান দ্বারা পরিপূর্ণ ছিল। তিনি খাজুরাহোতে একটি যজ্ঞ অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন যাতে তার মায়ের পাপ মোচন হয়।

এই মিথ টি অন্য এক উৎস থেকে একটু ভিন্নভাবে পাওয়া যায, সেটি হলো- হেম্বতী কালিঞ্জার রাজ্যের রাজ ব্রাহ্মণ মনি রামের বিধবা কন্যা। একদিন মনিরাম ভুলবশত অমাবশ্যাকে পূর্ণিমা রাত হিসেবে রাজার সামনে উপস্থাপন করে। এই বিষয়টি হেম্বতী জানার পর অত্যন্ত চিন্তিত হয়ে পাড়েন। বাবার এই ভুলের কারণে বাবার সম্মান যদি নষ্ট হয় তবে হেম্বতী তা সহ্য করতে পারবেন না। তাই তিনি চন্দ্র দেবতার নিকট প্রার্থনা করতে থাকেন। চন্দ্রদেবতা এরূপ সুন্দরী কিশোরীর রূপে অভিভুত হয়ে পড়ে এবং তারা একে অন্যের সাথে সঙ্গমে লিপ্ত হয়। পরবর্তীতে যখন মনি রাম এই বিষয়টি জানতে পারেন তখন নিজে নিজেকে অভিশাপ দেন এবং পাথরের মূর্তিতে পরিণত হয়। এরপর হেম্বতী গর্ভবতী হয়ে পড়েন এবং পুত্র সন্তানের জন্ম দেন, তার নাম রাখেন চন্দ্রতেয় এবং ধারণা করা হয় এই পুত্র সন্তাই পরবর্তী চান্দেলা রাজ বংশের প্রতিষ্ঠাতা। চান্দেলারা মনিরামের পাথরের মুর্তিটিতে মুনিয়া দেব নামে পূজা করে থাকেন।

অনিন্দ্য সুন্দর মন্দিরটির অধিকাংশ স্থাপনা, মূর্তি ও টেরাকোটা বেল পাথর দিয়ে তৈরি হয়েছে। এই মন্দির মূলত শিব, বিষ্ণু ও জৈনদের মন্দির হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। খাজুরাহো মন্দিরে বিভিন্ন ধরনের মূর্তির প্রতীকৃতি রয়েছে এবং এই মূর্তি বা প্রতীকৃতিরগুলোর মধ্যে মাত্র ১০% যৌনতা নির্ভর। এই মন্দিরকে অনেক পন্ডিতই দেবতাদের প্লে-গ্রাউন্ড বা দেবতাদের যৌন উল্লাসের কেন্দ্র হিসেবে অভিমত দিয়েছেন। তাদের মতে এই মন্দিরগুলোতে দেবতাদের যৌন জীবন তুলে ধরা হয়েছে। আবার অনেকে মনে করেন , এই মন্দিরে তান্ত্রিক যৌনতাকে প্রধান্য দেয়া হয়েছে এবং তার প্রতিলিপিই এই মন্দিরে প্রতিফলিত হয়েছে। আবার আরেক দল বিশেষজ্ঞ মনে করেন , হিন্দু ধর্মে ও মানব জীবনে ‘কাম’ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, তাই ‘কামের’ প্রতীক হিসেবে বিভিন্ন মন্দিরে এই বিষয় গুলো ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।

মন্দিরের চারপাশের প্যানেলে বিভিন্ন মিথকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেমন, শিব ও পার্বতীর বিয়ের অনুষ্ঠান। খাজুরাহো মন্দিরে রাজপুতদের বিভিন্ন ঘটনাকেও ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, এছাড়াও সাধারণ মানুষ, কৃষক, বাদকদল, কুমারেরও প্রতিলিপি রয়েছে। এখানে বিভিন্ন পশুপাখি যেমন- সিংহ, বাঘ, ঘোড়া ও পাখির চিত্রও রয়েছে।