খনা- এক ক্ষণজন্মা বিদূষীর কাহিনী - প্রিয়লেখা

খনা- এক ক্ষণজন্মা বিদূষীর কাহিনী

Ranju Prasad Mandal
Published: November 4, 2017

যদি বর্ষে মাঘের শেষ
ধন্য রাজার পুন্য দেশ।

সময়টা যীশুখ্রীস্টের জন্মের ৯০০ থেকে ১২০০ বছর পরের। মধ্যযুগের অন্ধকার ভেদ করে আবির্ভাব ঘটেছিল এক বিদূষী নারীর। যার কণ্ঠস্বর একাত্ম হয়ে গেছে আমাদের প্রাত্যহিকতা, আমাদের লোকাচারের সাথে। কণ্ঠস্বরটি একজন বিজ্ঞানী, একজন কবি সর্বোপরি একজন বাঙালি নারীর। ‘খনার বচন’ এই শব্দবন্ধ বাঙালী জীবনে ভীষণ ভাবেই পরিচিত। পরিচিত সহজ ভাষায়, সরল ছন্দে লেখা একাধিক পদ। মূলত আবহাওয়া ও কৃষিকাজ বিষয়ক এই পদগুলির জনপ্রিয়তা রীতিমতো ঈর্ষনীয়।

তিব্বতী ভাষায় ‘খনা’ শব্দের অর্থ ‘একজন জ্ঞানী ব্যক্তি’। যদিও তার মূল নাম ছিল ‘লীলাবতী’। খনার জন্মস্থান নিয়ে অবশ্য বেশ বিতর্ক আছে। কিংবদন্তী অনুসারে তার জন্মস্থান অধুনা পশ্চিমবঙ্গের উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার দেউলি গ্রামে। পিতার নাম অনাচার্য। অধুনা বেড়াচাঁপা গ্রামে চন্দ্রকেতুগড়ের ধংসাবশেষে ‘খনা-মিহিরের ঢিপি’ সেই স্মৃতি বহন করে। আরেকটি মত অনুসারে খনা ছিলেন অধুনা শ্রীলঙ্কার রাজকন্যা। বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম নক্ষত্র বরাহমিহির নিজের সন্তান মিহিরের আয়ু গণনা করে দেখেন তার আয়ু মাত্র ১ বছর। অতঃপর তাকে জলে ভাসিয়ে দেন। সে এসে উপস্থিত হয় লঙ্কায়। শ্রীলঙ্কার রাজার তত্ত্বাবধানে তারা বড় হয়, বিদ্যাচর্চা করে এবং বিবাহ সম্পন্ন হয়। তারা উপস্থিত হয় বরাহমিহিরের সামনে। খনা ভুল প্রমাণ করেন বরাহমিহিরের গণনা-
কিসের তিথি কিসের বার, জন্ম নক্ষত্র কর সার
কী করো শ্বশুর মতিহীন? পলকে আয়ু বারো দিন

খনা-মিহিরের ঢিপি

কিছু কিছু মতে আবার খনার জন্মস্থান বাংলা-আসাম সীমান্তে প্রাগজ্যোতিষপুরে। কিন্তু জন্মস্থান নিয়ে দ্বন্দ্ব যতই থাক খনার বচনের জনপ্রিয়তা নিয়ে সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই। আবহমান ধরে মানুষের মুখে মুখে ফেরা খনার বচনগুলি আমাদের লোকাচারের সাথে মিশে গেছে। যদিও এত শত সহস্র বছর ধরে মানুষের মুখে মুখে ঘোরার ফলে খনার বচনের কিছু পরিবর্তন হয়েছে কিন্তু তাতে মূল বক্তব্যের বদল বোধহয় খুব বেশি নয়। মাঝে মাঝেই খনার বচনের সাথে সমসাময়িক আর একজন কবি ‘ডাক’-এর ভাষ্যকে মিলিয়ে ফেলা হয়। যদিও দুজনের রচনার বিষয়বস্তু ছিল বেশ আলাদা। খনার রচনার বিষয় ছিল মূলত আবহাওয়া ও কৃষিবিদ্যা অপরদিকে ডাক লিখতেন মানবচরিত্র নিয়ে।
খনা এবং বরাহমিহিরের সময়কাল নিয়ে বিতর্ক আছে বেশ কিছু। তবুও প্রচলিত বিশ্বাস মতে খনাকে বরাহমিহিরের পুত্রবধু বলেই মনে করা হয়। বরাহমিহির ছিলেন সেই সময়ের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। যে কারনে দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত বা বিক্রমাদিত্যের নবরত্ন সভার অন্যতম সভাসদ ছিলেন তিনি। জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির, তার পুত্র মিহিরের সান্নিধ্য নিঃসন্দেহে খনার উন্মেষণ ও বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু খনা ছিলেন সবার থেকে স্বতন্ত্র। যিনি জ্যোতির্বিদ্যার জটিল বিষয়গুলিকে শুধুমাত্র গণনায় সীমাবদ্ধ রাখেননি। বরং আরো বেশি করে নজর দিয়েছিলেন মানবকল্যাণে। তাই তার মূল চর্চার বিষয় ছিল কৃষিবিদ্যা। সুনিপুণ পর্যবেক্ষণ, নির্ভুল গণনা তার বানীগুলিকে করে তুলেছে কালজয়ী। তিনি কৃষক ও সাধারন মানুষের কাছে আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও আপৎকালীন কর্তব্যের বিষয়গুলি তুলে ধরেন সহজ ভাষায়, সরল ছন্দে। খনার মূল কৃতিত্ব বোধহয় এখানেই। যিনি উপলব্ধি করেন আবহাওয়া, কৃষিকাজ বিষয়ক ভবিষ্যতবানী, সতর্কতা অথবা আশঙ্কার কথাগুলি ছড়িয়ে দেওয়া প্রয়োজন আপামর জনসাধারনের মধ্যে, তাতেই এর সফলতা। বিদূষী খনা তাই শুধুমাত্র একজন আবহাওয়াবিদ বা জ্যোতির্বিদ নন তিনি একজন সুদক্ষ প্রচারক যিনি সচেতনতার বীজ রোপন করে দেন সাধারন জনমানসের মনে। যেমন-
খনা বলে চাষার পো
শরতের শেষে সরিষা রো

অথবা,
ডাক দিয়ে বলে মিহিরের স্ত্রী শোনো পতির পিতা
ভাদ্র মাসে জলের মাঝে নড়েন বসুমাতা
রাজ্যনাশ, গো নাশ, হয় অগাধ বান
হাতে কাটা গৃহী ফিরে কিনতে না পায় পান

খনার বচন

খনার আর এক পরিচয় তিনি একজন কবি। হয়তো প্রথম বাঙালী মহিলা কবিও। যদিও তার ভাষ্যগুলি বাংলার সাথে সাথে ওড়িয়া ও আসামি ভাষাতেও অত্যন্ত জনপ্রিয়।
এমন বিদূষী নারীর জনপ্রিয়তা যে তৎকালীন সময়েও অসম্ভব বৃদ্ধি পাবে তা বলাই বাহুল্য। এমনকি কোন কোন মতে তাকে বিক্রমাদিত্যের সভার ‘দশম রত্ন’ হিসাবেও অন্তর্ভূক্ত করা হয়। কিন্তু এই জনপ্রিয়তাই তার বিপদ ডেকে আনে। প্রচলিত মত অনুসারে বরাহমিহিরের আদেশে কেটে ফেলা হয় তার জিভ। এত শত পদের জন্ম দেওয়া খনা নীরব হয়ে যান, সারাজীবনের মত। কিন্তু নীরব হয়না তার বানীগুলি, ভাষ্যগুলি। তারা হয়ে ওঠে কালজয়ী, অমর। আধুনিক সময়ের কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের কবিতাতেও তাই লেখা হয়-
“শোনো সবাই খনার কাহিনী এবারে

মধ্যযুগের বঙ্গভূমিতে
এক ছিল মেয়ে, তার নাম খনা

প্রথম মহিলা কবি বাংলার
তার জীব কেটে নিল পাঁচজনা

জীব কেটে নেওয়া খনার বচন
সাগরে পাহাড়ে আকাশে ছড়িয়ে পড়ল।

খনা নামে সেই মেয়েটিই শুধু
রক্তক্ষরণে মরল।”

তথ্যসূত্রঃ
১। Khana, Banglapedia, March 7, 2013.
২। The Tragedy of Khana, Paromita Ghosh, The Statesman Festivalz, 2017.
৩। খনামিহিরের ঢিপি, বানী বসু