ক্রিস অ্যাঞ্জেলঃ ভোজবাজি আর জাদুর মায়ায় মাতিয়েছেন যিনি বিশ্বকে - প্রিয়লেখা

ক্রিস অ্যাঞ্জেলঃ ভোজবাজি আর জাদুর মায়ায় মাতিয়েছেন যিনি বিশ্বকে

ahnafratul
Published: November 4, 2017

“ছোটবেলায় আমি জাদুকরদের থেকে দূরে থাকতে চাইতাম। তাদের মত চিন্তাভাবনা করা আমার ধাতে ছিল না। নিজস্ব একটা স্টাইল তৈরি করতে চেয়েছিলাম।”
এই বক্তব্যের মালিক ১৯৯৪ সালে টেলিভিশনের রুপালী পর্দায় প্রথম আবির্ভূত হন। এবিসি প্রাইমটাইমের একটি ঘন্টা জুড়ে ছিল তার শো। নাম ছিল ‘সিক্রেটস’। হরর ছবির পরিচালক ক্লাইভ বার্কার ছিলেন তার প্রথম জীবনের একজন কট্টর সমর্থক। লর্ড অব ইল্যুশন ছবিতে কাজ করবার জন্য বার্কার তাকে অনুরোধ করেন।


ও হ্যা, এতক্ষণ ধরে যার কথা বলছিলাম, তিনি হচ্ছেন বিশ্ববিখ্যাত ম্যাজিশিয়ান ক্রিস অ্যাঞ্জেল। ১৯৬৭ সালের ১৯ ডিসেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের হ্যাম্পস্টিডে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। জন্মের সময় তার নাম ছিল ক্রিস্টোফার নিকোলাস। একাধারে তিনি একজন জাদুকর, ইল্যুশনিস্ট, বিখ্যাত টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। লাস ভেগাসে কাজ শুরু করবার আগে ক্রিস তার ক্যারিয়ার নিউ ইয়র্কে শুরু করেন। তার বিখ্যাত টেলিভিশন শো গুলোর নাম হচ্ছে, ক্রিস অ্যাঞ্জেল মাইন্ডফ্রিক, ক্রিস অ্যাঞ্জেল বিলিভ, মাইন্ডফ্রিক লাইভ ইত্যাদি। ২০১০ সালে লাস ভেগাসে তার করা শো থেকে অন্তত ১৫০মিলিয়ন আয় হয়, যার বেশিরভাগই আসে দর্শকদের থেকে।

প্রাথমিক জীবনঃ
হ্যাম্পস্টিড জেনারেল হাসপাতালে জন্ম ক্রিস অ্যাঞ্জেলের রক্তে বইছে গ্রীক রক্ত। তার বাবা জন সারান্টাকোসের একটি রেস্তোরাঁ ছিল। সাত বছর বয়সে ক্রিস জাদুতে আগ্রহ তৈরি করেন এবং জীবনের প্রথম স্টেজ শোতে আবির্ভূত হন বারো বছর বয়সে। দশ ডলার পেয়েছিলেন ঐ শো থেকে। হ্যারি হুডিনির থেকে অনুপ্রাণিত এই বালক ম্যাজিশিয়ান হাইস্কুলের চারপাশে যেসব রেস্তোরাঁ ছিল, সেখানে জাদু প্রদর্শন করা শুরু করে। ক্রিসের প্রথম ভোজবাজির খেল ছিল তার মাকে কিছুক্ষণ হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখা। বিপুল দর্শকনন্দিত হয়েছিল তার ঐ খেলাটি। মার্ক মুনরোর সাহায্য নিয়ে ক্রিস একজোড়া পায়রাকে পোষ মানিয়ে খেলা দেখা শুরু করেন।
ঈস্ট মিডো হাই স্কুল থেকে গ্রাজুয়েশন করবার পর ক্রিস অ্যাঞ্জেল ঠিক করেন জাদুকে তিনি পেশা হিসেবেই নেবেন। বায়োগ্রাফি চ্যানেলের একটি ডকুমেন্টারির মতে, “অ্যাঞ্জেল নানা জায়গায় ভ্রমণ করে তার ভোজবাজির খেলা দেখাতে শুরু করে। ভ্রমণ আর খেলা দেখানো, এই দুটো কাজ ছাড়া ক্রিসের আরো একটি শখ ছিল। তা হচ্ছে, বিভিন্ন পাবলিক লাইব্রেরীগুলোতে জাদুর ওপর নানা ধরণের বই লেখা। জাদু, সঙ্গীত, মার্শাল আর্ট, নাচ ইত্যাদি নানা বিষয়ের ওপর তিনি পড়াশোনা করেন।”

ক্রিসের ক্যারিয়ারঃ


১৯৯৭ সালে টেলিভিশনে প্রচারিত দ্য সাইন্স অফ ম্যাজিকে ক্রিস অ্যাঞ্জেল আবির্ভূত হন। ২০০৩ সালে শো’টির একটি সিকুয়েল বের হয়। ক্রিস অ্যাঞ্জেল মাইন্ডফ্রিক নামক শো’টি তার প্রথম টেলিভিশন সিরিজ, যেটি কিনা পৃথিবীর নানা প্রান্তে গিয়ে পারফর্ম করা হয়েছিল। ২০০১ সালে ওয়ার্ল্ড আন্ডারগ্রাউন্ড থিয়েটার এই শো’টি লুফে নেয়। ক্রিস কখনো বসে থাকাদের মধ্যে ছিলেন না। যখন তার কোন শো ছিল না, তিনি পথচারীদের মাঝে এই শো’টির প্রমোশন করতেন।
চব্বিশ ঘন্টা পানির একটি চৌবাচ্চায় নিজেকে আবদ্ধ করে রাখেন, যা ছিল সম্পূর্ন নিমজ্জিত থাকার একটি বিশ্বরেকর্ড। তার প্রথম টেলিভিশন স্পেশালেরও একটি অংশ ছিল এটি।
কোন কোন জাদুকর আছেন, যারা অডিয়েন্সকে বিশ্বাস করেন যে তারা মৃতের সাথে কথা বলতে পারেন। এজন্য তাদের দরকার হয় মিডিয়ামের। ক্রিস এই মিডিয়ামশীপকে সবসময় নিরুৎসাহিত করতেন। কারণ, তার কাছে মনে হত এটা সম্পূর্ণ লোক ঠকানো একটি ব্যাপার। তিনি এক সাক্ষাতকারে বলেন, “কেউ যদি নিছক আনন্দ প্রদানের জন্য এই ধরণের কাজ করে থাকে, তবে সেটা ভিন্ন কথা। তবে কেউ যদি আমার সামনে এসে বলে সে সত্যিই মৃত মানুষের সাথে কথা বলে, আমি তাকে সকলের সামনে উন্মোচিত করব। তা সে আমার শহর থেকে কেউ কিংবা আমার পরিবারের সদস্য- যেই হোক না কেন।

চৌবাচ্চায় ক্রিস অ্যাঞ্জেলঃ


২০০২ সালে, নিউ ইয়র্কের টাইমস স্কয়ারে ক্রিস একটি টেলিফোন বুথ আকৃতির চৌবাচ্চায় নিজেকে আটক করে রাখার খেলা দেখান। এই ট্রিকটি দেখানোর জন্য অনুশীলনস্থান হিসেবে বেছে নেন তার এক প্রতিবেশীর সুইমিং পুল। সেখানে তিনি ১২ ঘন্টা ছিলেন। স্টেজ শো করবার আগে তিনি খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত ছিলেন যাতে কোন ক্ষুধা কিংবা বাথরুমে যাবার প্রয়োজন তার না পড়ে। ১৬টি অক্সিজেন ট্যাংক নিয়ে তিনি এই চৌবাচ্চায় নামেন। পারফর্মেন্স শেষ হবার পর তার চামড়ায় সমস্যা দেখা শুরু করে।
টেড শ্যাফ্রে এর মতে, “চৌবাচ্চা থেকে ওঠার আগে তার জন্য বাতাসের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। ২২০ গ্যালন পানিভর্তি একটি আলাদা চৌবাচ্চা তার জন্য তৈরি করা হয়েছিল। দর্শকদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে ক্রিস অ্যাঞ্জেল চৌবাচ্চা থেকে বের হয়ে যান।”

জাদু কিংবা ভোজবাজি দেখানো ছাড়াও ক্রিস অ্যাঞ্জেল বই লিখেছেন। ২০০৭ সালে হারপার এন্টারটেইনমেন্ট তার একটি বই প্রকাশিত করে। বইটির নাম ছিল মাইন্ডফ্রিকঃ সিক্রেট রেভেলিশনস। নিউইয়র্ক টাইম বেস্টসেলার হয় তার লেখা বইটি। লাস ভেগাস সান তার বই সম্পর্কে বলে, “এই বইতে আপনি জানতে পারবেন ক্রিস অ্যাঞ্জেলের জীবনের নানা দিক, ক্যারিয়ারের শুরু, উত্থান পতন, জাদু বিষয়ক নানা ধরণের ট্রিক।” এছাড়াও “অ্যাঞ্জেল” নামক মেটাল ব্যান্ডে তিনি ফ্রন্টম্যান ছিলেন। এরপর বাণিজ্যিক রক মিউজিশিয়ান ক্লে স্কটের সাথে “অ্যাঞ্জেলডাস্ট”এ যোগদান করেন। ১৯৯৮ সালে তাদের ডেব্যু অ্যালবাম বের হয়, যার নাম মিউজিকাল কনজিউরিংস ফ্রম দ্য ওয়ার্ল্ড অব ইল্যুশন।” এছাড়াও সিস্টেম ওয়ান, সিস্টেম টু, সিস্টেম থ্রি নামক আরো কিছু অ্যালবাম বের করেন তিনি। ২০০৩ সালে তার অ্যালবাম সুপারন্যাচারাল মুক্তি পায়।


২০১০ সালে ক্রিস অ্যাঞ্জেল আইডিয়াভিলেজের সাথে যোগদান করেন এবং ক্রিস অ্যাঞ্জেল ম্যাজিক কালেকশন তৈরি করেন। এই কিটে ছিল ছ’টি মাইন্ডফ্রিক ম্যাজিক ট্রিক, ছোট ছোট প্রায় ২৫০টি ট্রিক, বাচ্চাদের জন্য ম্যাজিক কিট। এই পণ্যটি প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা করেছিল।

বিশ্বরেকর্ডঃ


ক্রিস অ্যাঞ্জেল অনেকগুলো রেকর্ডের মালিক। নিচে দেওয়া হলঃ
১) সর্বোচ্চ সময় ধরে পানির নিচে থাকার রেকর্ড
২) দুই মিনিট ত্রিশ সেকেন্ডে স্ট্রেইটজ্যাকেট হতে নিজেকে মুক্ত করার রেকর্ড
৩) নিজের শরীরকে সর্বোচ্চ সময় ধরে আটকে রাখা (৫ ঘন্টা ৪২ মিনিট)
৪) সবচেয়ে কম সময়ে “মেটামরফোসিস” ভ্রান্তি দেখানোর রেকর্ড
৫) ২০১০ সালের ২৬ মে লুক্সরের একটি স্টেজ শো’তে তিনি ভ্রান্তির মাধ্যমে গায়েব হয়ে যাবার ভোজবাজি দেখান। এই কারণে গিনেজ বুক অব ওয়ার্লড রেকর্ডে তার নাম রয়েছে। শো’টির নাম ছিল বিলিভ।

আসলে, ক্রিস অ্যাঞ্জেলের জীবনের ব্যাপ্তিতে ঘটনা এত বিস্তৃত যে, এত কম সময়ে কিংবা এত কম লেখায় তা ফুটিয়ে তোলা সম্ভব নয়। মানুষকে জাদু দেখিয়ে তিনি আনন্দ প্রদান করতে ভালবাসেন, তবে বুজরুকদের মুখোশ উন্মোচন করতেও তিনি পিছপা হন নি। একারণেই মানুষ ক্রিস অ্যাঞ্জেলকে ভালোবাসে, তার দেখানো জাদুতে মোহিত হয়।