কেভিন কার্টার, একটি ফটোগ্রাফ এবং পেশাদারিত্ব বনাম মানবতা - প্রিয়লেখা

কেভিন কার্টার, একটি ফটোগ্রাফ এবং পেশাদারিত্ব বনাম মানবতা

farzana tasnim
Published: November 24, 2017

দক্ষিণ আফ্রিকার অসাধারণ এক ফটোগ্রাফার কেভিন কার্টার। ১৯৬০ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর জন্ম নেয়া এই ফটোসাংবাদিক ছিলেন ব্যাং ব্যাং ক্লাবের সদস্য, সংক্ষিপ্ত জীবনে অর্জন করেছেন বহু পুরস্কার। ১৯৯৩ সালের সুদান দুর্ভিক্ষের ছবি তুলে তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। মাত্র ৩৩ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন এই নামকরা ফটোসাংবাদিক। ২০১০ সালের ফিচার চলচ্চিত্র দ্য ব্যাং ব্যাং ক্লাবে তার কাহিনী বর্ণিত হয়েছে যেখানে কার্টারের চরিত্রে অভিনয় করেছেন টেইলর কিটস্চ।

প্রথম জীবনে খেলাধুলার ফটো সাংবাদিকতার মধ্য দিয়ে কর্ম জীবন শুরু করেন। বর্ণবাদের কারণে পরে তিনি জোহানেসবাগ স্টারে চলে আসেন। দরিদ্র-অনাহারী মানুষ ছিল তার ছবির মূল বিষয়। তাই ছবির পটভুমি হিসাবে বেছে নিয়েছিলেন সুদান। ১৯৯৩ সালের মার্চ মাসে আইদ নামক গ্রামে জাতিসংঘ যখন খাদ্য বিতরণ করছিল, পার্শ্ববর্তী গ্রামের অভাবী মানুষরা ছুটে যায় সেখানে। এক মুঠো খাবারের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আর কিছুই ছিল না তাদের কাছে।

মানুষ যখন লাইন দিয়ে দাঁড়িয়ে খাবার নিচ্ছিল, তখন তিনি ছবি তোলায় ব্যস্ত ছিলেন । হঠাৎ তিনি দেখতে পেলেন একটি বাচ্চাকে। মৃতপ্রায় বাচ্চাটি ক্ষুধার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে হামাগুড়ি দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে রিলিফ ক্যাম্পের দিকে। বাচ্চাটি কিছুক্ষণ হামাগুড়ি দেয় আবার বসে পড়ে, আবার হামাগুড়ি দেয়। একটা শকুন উড়তে উড়তে এসে বাচ্চাটার পিছনে অবস্থান নেয়। শকুন বুঝতে পারে যে কোন মুহূর্তে বাচ্চাটি মারা যাবে। বাচ্চাটা এক কদম হামাগুড়ি দেয়, শকুনটাও এক কদম এগিয়ে যায়। এইভাবে ২০ মিনিট অপেক্ষার পর কালজয়ী ছবিটি তোলেন কেভিন কাটার। তিনি ভেবেছিলেন হয়ত শকুনটা পাখা মেলে উড়ে যাবে, কিন্তু বিধাতার ইচ্ছে বোধহয় অন্য কিছুই ছিল।

সাড়াজাগানো এই ছবিটি কিনে নেয় “নিউইয়র্ক টাইমস” এবং প্রকাশ করে ২৬ মার্চ, ১৯৯৩ সালে। তখন এই ছবিটা দেখে দুনিয়ার মানুষ চমকে উঠেছিল। তবে শিশুটার শেষ পরিণতি কি হয়েছিল, তা কেউ জানতে পারেনি। এমন কি  কেভিন কার্টার ও না, কেননা ছবিটি তোলার পরপরই তিনি স্থানটি ত্যাগ করেন। ছবিটি প্রকাশিত হবার পর থেকে তিনি প্রশংসার সাথে সাথে মানুষের কাছে ঘৃনার পাত্রও হয়ে উঠলেন। তার বন্ধু ও পরিচিত জনেরা তাকে বারবার প্রশ্ন করতে লাগলেন – ছবি তুলেছ ঠিক আছে, কিন্তু তুমি ছেলেটার সাহায্য এগিয়ে গেলে না কেন?

‘একটা শকুন অপেক্ষা করছে ছোট্ট একটা শিশুর মৃত্যুর জন্য।কারন মৃত্যুর পর শকুনটা এই শিশুটার শরীরের মাংস খাবে।’

বারবার একই প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হতে অনুশোচনায় ভুগতে থাকেন কার্টার। ছবি তোলার কাজ ছেড়ে দিলেন কিন্তু কোনোভাবেই তিনি অন্তর্জ্বালা থেকে মুক্তি পেলেন না। এই ছবিটি পরবর্তীতে পুলিৎজার পুরস্কার পেয়েছিল। একই সাথে কেড়ে নিয়েছিল কার্টাররের চোখের ঘুম। ছবিটি তোলার পর থেকে তিনি অন্য রকম হয়ে গিয়েছিলেন। মানসিকভাবে একদম ভেঙ্গে পড়েছিলেন তিনি। ছবিটি তোলার ৩ মাস পর ১৯৯৪ সালের ২৭শে জুলাই  মাত্র ৩৩ বছর বয়সে  কেভিন কার্টার আত্মহত্যা করেন। তাঁর আত্মহত্যা করার কৌশলটিও ছিল বেশ রহম্যময়। তিনি তার গাড়ি নিয়ে চলে যান ব্রাম্ফটেন বলে এক এলাকায় যেখানে তার শৈশবের দিনগুলো কেটেছে। তারপর তার গাড়ি চালু রেখে গাড়ির এক্সিট পাইপের সঙ্গে একটি নল লাগিয়ে, তার ওপরের প্রান্ত চেপে ধরেন নিজের নাকে। সেই নল দিয়ে বেরিয়ে আসা কার্বন মনোক্সাইড সোজা আশ্রয় নেয় তার ফুসফুসে। এর ফলেই তার মৃত্যু হয়।

মারা যাওয়ার আগে একটি নোট লিখে যান তিনি। তাঁর আত্মহত্যার নোটের কিয়দংশঃ

“I’m really, really sorry. The pain of life overrides the joy to the point that joy does not exist… depressed … without phone … money for rent … money for child support … money for debts … money!!! … I am haunted by the vivid memories of killings and corpses and anger and pain … of starving or wounded children, of trigger-happy madmen, often police, of killer executioners … I have gone to join Ken if I am that lucky.”

ছবিটি তোলার সময় পেশাদারিত্বের কাছে হেরে গিয়েছিল মানবতা। কেভিন কার্টারের কাছে তখন একমাত্র মুখ্য বিষয় ছিল- ‘একটি ভালো ছবি যা তার পুরো ক্যারিয়ারকে বদলে দেবে’। কিন্তু সেই ভালো ছবি তুলতে গিয়ে তাকে যে জীবনই বিসর্জন দিতে হবে তা হয়তো তিনি নিজেও ভাবেননি। তার শেষ পর্যন্ত পেশাদারিত্বের অনেক ঊর্ধ্বে মানবতাকে স্থান দিয়ে বিদায় নিয়েছিলেন পৃথিবী থেকে। তার মৃত্যুতে গোটা দুনিয়া জানতে পারে, কেভিন কার্টার তার অনাকাঙ্ক্ষিত পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে বিদায় নিয়েছে চিরতরে।