এটা শুধুই "বড় ছেলে"দের গল্প? - প্রিয়লেখা

এটা শুধুই “বড় ছেলে”দের গল্প?

ahnafratul
Published: September 9, 2017

এক শিশি তেলের বোতল আর আধ কেজি ডালের পলিথিন হাতে হয়ত পৃথিবী উদ্ধার করা যায় না।

দুজন ছাত্র পড়িয়ে কিংবা তপ্ত রোদে পিচঢালা রাস্তায় পায়ে হেঁটে কিংবা ঘর্মাক্ত কলেবরে লোকাল বাসে চড়ে প্রেয়সীর সাথে দেখা করতে গেলে হয়ত পৃথিবী উদ্ধার করা যায় না।

ভাইয়ের পিকনিকের জন্য ঘামে ভেজা ৮০০ টাকা মায়ের হাতে তুলে দিলে হয়ত পৃথিবী উদ্ধার করা যায় না।

বোনের বাচ্চার জন্য একটা সান চিপসের প্যাকেট ঘরে নিয়ে ফিরলে হয়ত পৃথিবী উদ্ধার করা যায় না।

তবে একজন বড় ছেলে হওয়া যায়, পরিবারের বড় ছেলে হওয়া যায়। আমাদের পরিচিত এই নগরীর হাজারো যুবকের ভিড়ে নিজেদের মিশিয়ে ফেলা যায়। পর্দার মাঝে যখন বড় ছেলের চরিত্ররুপে অপূর্বকে দেখলাম, নিজের সাথে মিলিয়ে নিতে বেশি কষ্ট করতে হয় না। আমি বলছি না প্লটে কোন ধরণের ফুটো নেই তবে পরিচালক যা করতে পেরেছেন, তার জন্য তাকে বাহবা দিতেই হয়। তা হচ্ছে, চরিত্রগুলোর সাথে নিজেদের বাস্তব জীবনকে রিলেট করতে পারার ঘটনা।

আমাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে আমরা প্রচন্ড আবেগী, আমাদের সবচেয়ে বড় দোষও কিন্তু ঐ ওটাই। আমরা আবেগী। আবেগের বশে নানা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিই, আবেগকে আবার নিজের মাঝে পাথরচাপা দিয়ে রাখতে চাইলেও নিতে আমাদের অনেক কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত। তবে পরিচালক যখন আমাদেরই কাহিনী আমাদের সামনে নিয়ে আসেন তবে একটু নড়েচড়ে বসতে হয় বৈকি। গল্পটা যে আমাদের!

টেলিফিল্মের শুরুতে বাংলার চিরায়ত রিটায়ার্ড বাবা আর মায়ের কথোপকথকন। চকিতেই নিজের বাবা মাকেই যে অনেকে মনে মনে ভেবে নেন নি, তা বলাটা অবশ্যই ভুল হবে। পরিচালকের উপস্থাপন দেখে বোঝা যাচ্ছে তিনি এরুপ পরিস্থিতির মাঝে ছিলেন কিংবা এই ধরণের পরিস্থিতির সাথে তার ভালোমতই পরিচয় আছে। নায়কের আবির্ভাব হয় টিউশনিরত অবস্থায়। নায়িকার ফোনকল তাকে বিভ্রান্ত করে তোলে। “খেয়েছো?” “কি খেয়েছো?”- এই ধরণের শব্দগুলো আমাদের জীবনে খুব পরিচিত (অবশ্যই যাদের জীবনে একজন স্পেশাল কেউ আছেন)। নায়কের জীবনেও তা খুব ব্যতিক্রমী নয়। মেহজাবিন এ শহরেরই একজন বড়লোক বাবার মেয়ে। এক মুঠো স্বপ্ন নিয়ে (কিংবা ভুল করে) ভালোবেসে ফেলেছেন অপূর্বকে। এই নিয়ে তার কোন ক্ষোভ নেই, রাগ নেই। প্রেমিকের জন্য তার কপালে ভাঁজ, দুশ্চিন্তার একডালি তুলির আঁচড়। গল্প এগুতে থাকে। অপূর্বের ভালো ফলাফল থাকা সত্ত্বেও তার চাকরি হয় না। কেন হয় না, তার কোন কারণ দেখানো হয় নি। ধরে নিতে পারি, পরিচালক ধরেই নিয়েছেন মধ্যবিত্ত ছেলেদের চাকরি পেতে হয়ত বেশ দেরিই হয়। তবে দেরির দৈর্ঘ্য এতোটাই যে…
থাক, আর নাই বা বলি। এখনো অনেকে দেখেন নি। তাদের জন্যই তোলা থাক।

প্রেমিকাকে বোঝাচ্ছেন বেকার প্রেমিক                     ছবিসূত্রঃ গুগল

অপূর্ব, মেহজাবিন এবং অন্যান্য কুশীলব যারা রয়েছেন, তাদের অভিনয় যার যার স্থানে বেশ ভালই ছিল তবে নাটকের মূল মধ্যমণি ছিলেন অপূর্ব আর মেহজাবিন। আর অধরা এক সোনার হরিণ, একটি আটপৌরে চাকরি। যার জন্য বাবার হতাশা, মায়ের দীর্ঘশ্বাস, ভাইবোনের আকুতি আর প্রেয়সীর বাঁধভাঙ্গা চোখের জল- সবকিছুই পরিচালক দেখিয়েছেন বেশ মুন্সিয়ানার সাহায্যেই। তবে বেশ কিছু প্রশ্নের সম্মুখিন হতে হয় নাটকটি দেখতে গেলেঃ
১) বাবা তার সারা জীবনে কিছুই কি সঞ্চয় করেন নি?

২) যুদ্ধটা শুধু বড় ছেলের নয়। তার ডিভোর্সী বোনেরও, যে তার সন্তান নিয়ে একটা যুদ্ধে রত আছেন। তবে নাটকের নাম যেহেতু বড় ছেলে, তাই বোধ করি পরিচালক “বড় ছেলে” কেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছেন। তা দিন, সমস্যা নেই। তবে বড় ছেলের এতটা দূরবস্থা কি আসলেই আমাদের এই সমাজকে দেখাচ্ছে? মানছি, অনেক কিছু রিলেট করা যাচ্ছে তবে সংগ্রামটা কি আরো একটু স্থিত হলে ভালো হত না?

৩) দু বছর ধরে অপূর্ব বেকার। মানছি চাকরি এদেশে একটা সোনার হরিণ। তবে শুধুমাত্র টিউশনির টাকায় দু দুটো বছর এভাবে থাকাটা যে সবচাইতে বড় একটি প্লটহোল। নাটকের শেষে অপূর্বর আত্মবিশ্বাস প্রচন্ড ভালো লাগে, তবে সেটিও মাঝে অনেক প্রশ্ন জড়ো করে। এতোটা আত্মবিশ্বাসী হলে এই দুবছরেও তিনি কেন তার এতোটা নিবেদিতপ্রাণ প্রেয়সীকে নিজের করে নেবার জন্য কোন স্টেপ নেন নি?

আরো কিছু প্রশ্ন রয়ে যায় তবে এটাও মনে রাখতে হবে ১ ঘন্টার একটি টেলিফিল্মে এতোটা ডিটেইলিং হয়ত পরিচালকের পক্ষে সম্ভব ছিল না। আর তাছাড়া, তিনি দেখাতে চেয়েছিলেন একটা সংগ্রাম। সংগ্রামটি দেখাতে তিনি পুরোপুরি সমর্থ হয়েছেন।
চেয়েছেন একটা গল্প দেখাতে, যে গল্পগুলো আমাদের অগোচরেই রয়ে যায় তবে ঘটে। হরহামেশাই ঘটে, নীরবে নিভৃতে ঘটে। মধ্যবিত্ত এবং চাকরির আশায় থাকা অনেক ছেলেরাই হয়ত এই নাটক দেখে নিজেদের হতাশার শ্বাসটুকু আরেকবার জোরে নিয়েছেন, প্রেমিকারা তাদের প্রেমিকের সঙ্গিন অবস্থাটুকু আরেকটু বুঝেছেন। বাবা মায়েরাও হয়ত নীরবে ফেলেছেন পরিবারের জোয়াল কাঁধে তুলে নেয়া বড় ছেলেটার জন্য। সবকিছুই ঠিক আছে। অতিরিক্ত ভাঁড়ামো আর অযৌক্তিক নাটকের ভিড়ে ‘বড় ছেলে’রা আমাদের জন্য নিয়ে আসে একটুকু স্বস্তির আবাহন।

 

যা যা ভালো লেগেছেঃ

১) মেহজাবিনের অভিনয়। একজন বড় মাপের অভিনেত্রী হবার যোগ্যতা তার আছে, এ টেলিফিল্মটিই তার প্রমাণ।

২) অতিরঞ্জিতকরণ খুব বেশি একটা নেই। যা আছে, তাও তেমন দৃষ্টিকটু লাগে নি (একদম একান্ত মতামত)

৩) কাহিনী আমাদের পরিচিত তবে একটু নতুনভাবে উপস্থাপন ভালই লেগেছে।

৪) মিফতাহ জামানের ব্যাকগ্রাউন্ড স্কোর! অসাধারণ! জানেন কিভাবে দর্শকের চোখে পানি আনতে হয়।

৪) একদম শেষের দৃশ্যটা! ভালোবাসা কারো জীবনে যেন এভাবে কখনো না গড়ায়।

যা যা ভালো লাগে নিঃ
১) ঐ যে বলেছিলাম, দু বছর বনাম একজন বেকার ছেলের টিউশনি নির্ভরতা? ওটা ভালো লাগে নি।

২) ডিটেইলিং এর চাইতে আবেগকে একটু বেশিই প্রাধান্য দিয়ে ফেলেছেন পরিচালক।

৩) আবেগঘন মুহুর্তগুলোতে অপূর্বর কাছে আরেকটু বেশি এক্সপ্রেশন আশা করেছিলাম।

এত তো! বড় ছেলেকে এত কাটাছেড়া করতে নেই, নাকি? তার কাঁধে পাহাড়সমান দায়িত্ব, পাহাড়সমান আশা চোখে। তবে একটা কথা ভালো লাগে নি। বড় ছেলেদের তাই বলে লুকিয়ে কাঁদতে হবে কেন? এ শহরের গল্প থেকে তারাও কি আলাদা কিছু নাকি? তারাও আসুক, লুকিয়ে নয় বরং প্রকাশ্যেই আসুক। কাঁদুক, জানান দিক “আমরাও বেঁচে আছি, থাকি”