একাকী মুখ থুবড়ে থাকা শেষ বংশধরের গল্প - প্রিয়লেখা
নর্দার্ন হোয়াইট রাইনো

একাকী মুখ থুবড়ে থাকা শেষ বংশধরের গল্প

ahnafratul
Published: November 12, 2017

আচ্ছা ধরুন, পৃথিবীতে শেষ প্রাণীটি বলতে শুধু আপনি একাই বেঁচে আছেন। আপনার চারপাশে কেউ নেই, সম্পূর্ণ একাকী। প্রতিক্ষণে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন আপনি। সহায় সম্বল ছাড়া একাকী এই নিষ্ঠুর পৃথিবী ছেড়ে যেতে কেমন লাগবে? আর যাই হোক, অবশ্যই অনুভূতিটি ভালো হবার কথা নয়।
ভয় পাবেন না। আপনার কথা বলছি না। এমনকি কোন মানুষের কথাও বলছি না। বলছি এক গণ্ডারের কথা। ইংরেজিতে যাকে আমরা বলি রাইনোসর। কি এমন ঘটল তার ললাটে  যে আজ প্রিয়লেখার পাতায় এমন একটি লেখা পড়তে হচ্ছে আপনাকে?
গত নভেম্বরের ৬ তারিখে টুইটারে একটি ছবি ব্যাপক আলোড়ন ফেলে দেয়। একাকী একটি গণ্ডার মুখ থুবড়ে পড়ে আছে মাটিতে। এর চিবুকের প্রান্ত জমিন স্পর্শ করছে এবং ধূলোমাখা সে স্থানে অনেক করুণ অবস্থাতেই আছে এই জন্তুটি। ছবিটি তুলেছেন ড্যানিয়েল শ্নাইডার নামক একজন জীববিজ্ঞানী ও কর্মী। তিনি ছবিটি পোস্ট করেন একটি ক্যাপশন দিয়ে, যার বাংলা করলে দাঁড়ায়,
“বিলীন হয়ে যাওয়ার অনুভূতি কি জানতে চান? এটি হচ্ছে নর্দার্ন হোয়াইট রাইনো ‘র শেষ বংশধর। শেষ। এরপর আর কেউ আসবে না।”

নর্দার্ন হোয়াইট রাইনো
শ্নাইডারের টুইট ও মুখ থুবড়ে থাকা ‘সুদান’

বুকে ধক করে ওঠে না এমন একটি লেখা পড়লে? কেমন লাগবে আপনার যদি জানতে পারেন আপনার বংশের শেষ উত্তরাধিকার আপনি? আপনার পরে আর কেউ আসবে না?
ছবিটি মানুষের মনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। নর্দার্ন হোয়াইট রাইনোর বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Ceratotherium simum cottoni. শ্নাইডার যে গণ্ডারটির ছবি তুলেছেন, তার নাম হচ্ছে সুদান। সুদানের আগে যে গণ্ডারটি বেঁচে ছিল, তার নাম ছিল আনগালিফু। ২০১৪ সালের ডিসেম্বর মাসে স্যান ডিয়েগো চিড়িয়াখানায় মৃত্যু ঘটে আনগালিফুর। ছবিতে শ্নাইডার আরো একটি মর্মান্তিক বিষয় ফুটিয়ে তুলেছেন। সুদানের বয়স এবছরই ৪৪ অতিক্রম করেছে এবং সে সন্তানধারণে অক্ষম। মোদ্দাকথায়, নর্দার্ন হোয়াইট রাইনোর কোন বংশধর আমরা আর পৃথিবীর বুকে পাচ্ছি না।
ছবিটি টুইটারে পোস্ট করবার পর প্রায় ৪৪,০০০ রি-টুইট এবং ১,৭০০ প্রত্যুত্তর পান। তবে হতাশার কথা হচ্ছে, প্রাযুক্তিক উৎকর্ষতার এই যুগে যদি প্রযুক্তির কোন চমৎকার আমরা দেখতে না পাই, তাহলে সহানুভূতি কিংবা ভালোবাসা দিয়ে রক্ষা করা যাবে না সুদানের বংশধর।

সুদানের গল্প

কেনিয়ার ওল পেহেতা সংরক্ষণাগারে বসবাস করছে সুদান। সুদানের সাথে রয়েছে আরো দুজন সঙ্গিনী। তাদের নাম হচ্ছে নাজিন ও ফাতু। সুদান এসেছে মূলত চেক প্রজাতন্ত্রের ভার রালোভ চিড়িয়াখানা থেকে। ২০০৯ সালে সুদানকে কেনিয়াতে নিয়ে আসা হয়। বিজ্ঞানী ও প্রাণী সংরক্ষণবিদেরা আশা করেছিলেন সুদান তার বংশধর তৈরিতে সক্ষম হবে। অপারগ সুদানকে এরপর নিয়ে যাওয়া হয় ইউরোপে। কিন্তু সেখানেও ঠিক একই ফল পাওয়া যায়। কোন কিছুতেই লাভ হয় না। চিন্তিত হয়ে পড়েন বিজ্ঞানীরা। সুদানের বন্ধু আনগালিফু ততদিনে মারা গিয়েছে। ২০১৫ সালে এসে দেখা যায় সুদানের স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণু তৈরির সংখ্যা কমে গিয়েছে এবং তার সঙ্গিনী নাজিন ও ফাতু নানা ধরণের সমস্যায় ভুগছেন। এবার ওল পেহেতা সংরক্ষণাগারের বিজ্ঞানীদের মাথায় যেন বাজ পড়ল। কারণ নর্দার্ন হোয়াইট রাইনোর শেষ পুরুষ হচ্ছে সুদান এবং আর কোন পুরুষ সদস্য নেই এই জীবের। অর্থাৎ, সুদানের পর সন্তান জন্মদানের জন্য আর কোন পুরুষ সঙ্গীকে পাচ্ছে না নাজিন আর ফাতু।

নর্দার্ন হোয়াইট রাইনো
নর্দার্ন হোয়াইট রাইনো

বিজ্ঞানীদের এখন একমাত্র আশা হচ্ছে, কৃত্রিম উপায়ে যদি ল্যাবরেটরীতে নর্দার্ন হোয়াইট রাইনর বংশধরদের বাঁচানো যায়! এ কারণে সাহায্য নেয়া হচ্ছে সাউদার্ন হোয়াইট রাইনো এবং নাজিন ও ফাতুর ডিম্বাণুর। উভয়ের সংমিশ্রণের ফলে হয়ত ল্যাবরেটরীতে পাওয়া যাবে সুদানের বংশধর। তবে রি-প্রোডাকটিভ ইন্সটিটিউশনের পরিচালক বারবারা ডুরান্ট বলেছেন প্রক্রিয়াটি সম্ভব, তবে খুব কঠিন ও সময়সাপেক্ষ। এছাড়া এতে ব্যর্থ হবারও সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ, দুই প্রজাতির প্রাণীর মাঝে এক ধরণের ফিউশন তৈরি করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেটি বেশ ব্যয়বহুলও বটে।

হয়ত শেষ পর্যন্ত সুদানের বংশধর হিসেবে আমরা আর কাউকে পাব না, হয়ত বিজ্ঞানীরা সমর্থ হলেও হতে পারেন তাদের গবেষণায়। আমরা কেবল প্রার্থনা করতে পারি। সাথে সাথে আমাদের ওপর এই দায়িত্বও বর্তায় যে অন্য যেসকল প্রাণী এমন হুমকির সম্মুখীনে আছে, তাদের দ্রুত রক্ষা করার ব্যবস্থা নেয়া।
প্রিয়লেখার সাথেই থাকুন।