ইবনে বতুতাঃ বিশ্বের সেরা পরিব্রাজকের আদ্যোপান্ত - প্রিয়লেখা

ইবনে বতুতাঃ বিশ্বের সেরা পরিব্রাজকের আদ্যোপান্ত

farzana tasnim
Published: September 15, 2017

ইবনে বতুতার নাম শোনেননি উপমহাদেশে এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুস্কর। বিশ্ব বিখ্যাত এ ভ্রমণ পিপাসু ঘুরে বেড়িয়েছেন আফ্রিকা থেকে ভারত, ভারত থেকে তুরস্ক পর্যন্ত। এমনকি বাংলাদেশেও পড়েছে তার পদ চিহ্ন। বিশাল এ পথ পাড়ি দিয়েছেন কখনো নদী পথে, কখনো উটের কাফেলায় আবার কখনো বা পায়ে হেঁটে। টানা ২৯ বছর বিশ্ব ভ্রমণ করে ক্ষান্ত হয়েছেন তিনি। এসময় তিনি যত দেশে গিয়েছেন তা সত্যিই কল্পনা করার মতো। মার্কো পোলোকে তার সমকক্ষ মনে করা হলেও পোলোর চেয়ে বতুতা বেশি অঞ্চল ভ্রমণ করেছেন। তাই অধিকাংশ ইতিহাসিবিদ ইবনে বতুতাকেই বিশ্বের সেরা ভ্রমণকারী হিসেবে স্বীকৃতি দেন।

মরক্কোর পর্যটক ইবনে বতুতার তাঁর পুরো নাম শেখ আবু আবদুল্লাহ মুহম্মদ। ১৩৪৬ খ্রিস্টাব্দে বাংলায় সফর করেন তিনি। বাংলায় সফরের উদ্দেশ্য তিনি নিজেই তাঁর ভ্রমন কাহিনীতে উল্লেখ করেছেন এবং তা ছিল কামরূপের পার্বত্য অঞ্চলে বিখ্যাত সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিনের (হযরত শাহজালাল মুজার্রদ-ই-ইয়েমেনী) দর্শন লাভ।

ইবনে বতুতা ১৩২৫ খ্রিস্টাব্দে একুশ বছর বয়সে বিশ্ব সফরে বের হন এবং আট বছরের মধ্যে সমগ্র উত্তর আফ্রিকা, আরব, পারস্য, ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীরবর্তী অঞ্চল ও কনস্টান্টিনোপল পরিভ্রমণ করেন। এরপর তিনি ভারতে আসেন। ১৩৩৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লিতে পৌঁছেন। সুলতান মুহাম্মদ বিন তুঘলক তাঁকে দিল্লির কাজী নিযুক্ত করেন। প্রায় আট বছর তিনি এ পদে বহাল ছিলেন। এরপর সুলতান তাঁকে চীনে রাষ্ট্রদূত করে পাঠান (১৩৪২)। পথে জাহাজডুবির ফলে তাঁর আর চীনে যাওয়া হয় নি। তিনি মালয় দ্বীপপুঞ্জে যান এবং সেখানে এক বছর বিচারক পদে কাজ করেন। ১৩৪৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি সিংহল অভিমুখে রওনা হন এবং সেখান থেকে দক্ষিণ ভারতে পৌঁছেন। মাদুরায় কিছুকাল অবস্থানের পর তিনি বাংলা অভিমুখে রওনা হন।

বাংলার যে শহরে ইবনে বতুতা প্রথম পৌঁছেন (৯ জুলাই ১৩৪৬) তার নাম তিনি উল্লেখ করেছেন সাদকাঁও (চাটগাঁও)। সেখান থেকে সরাসরি তিনি কামারু (কামরূপ) পার্বত্য অঞ্চল অভিমুখে রওনা হন। সাদকাঁও থেকে কামারু তাঁর বর্ণনায় এক মাসের পথ। এরপর সেখানে তিনি সুফিসাধক শেখ জালালউদ্দিনের সঙ্গে তাঁর খানকায় সাক্ষাৎ করেন। দরবেশের খানকায় তিন দিন অবস্থানের পর তিনি আন-নহর উল-আয্রাক (নীল নদী অর্থে) নদীর তীরবর্তী হবঙ্ক শহর অভিমুখে রওনা হন। এই নদীপথে ১৫ দিন নৌকায় ভ্রমণের পর তিনি সুনুরকাঁও (সোনারগাঁ) শহরে পৌঁছেন (১৪ আগস্ট ১৩৪৬)। সোনারগাঁ থেকে একটি চীনা জাহাজে করে তিনি জাভার উদ্দেশে রওনা হন।

সাদকাঁও (চট্টগ্রাম) শহরে উপস্থিতির সময় থেকে সুনুরকাঁও (সোনারগাঁ) ত্যাগ করে জাভার উদ্দেশে রওনা হওয়া পর্যন্ত সময়কালে বাংলায় ইবনে বতুতার সফরের মেয়াদ ছিল দুই মাসেরও কম সময় (১৩৪৬ সালের জুলাই ও আগস্ট মাস)।

ইবনে বতুতার ভ্রমণকাহিনী ১৩৫৫ খ্রিস্টাব্দে গ্রন্থাকারে লিপিবদ্ধ হয়। ১৩২৫ থেকে ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালে সফর সম্পন্ন করে ইবনে বতুতা তাঁর নিজ ভূমি মরক্কোতে ফিরে যান এবং জীবনের অবশিষ্ট সময় সেখানেই কাটান। মরক্কোর সুলতান আবু ইনান মারিনির নির্দেশে ইবনে বতুতা তাঁর সফরের অভিজ্ঞতা সুলতানের সচিব আবু আব্দুল্লাহ মুহম্মদ বিন মুহম্মদ ওরফে ইবনে জুযাইর নিকট বর্ণনা করেন। ইবনে জুযাই ভ্রমণবৃত্তান্ত আরবি ভাষায় লিপিবদ্ধ করে ‘রেহ্লা’ শিরোনামে সংকলন করেন। ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনী সম্বলিত এ গ্রন্থের পুরো নাম তুহফাতুন-নুজ্জার ফি গারাইবিল আমসার ওয়া আজাইবিল আস্ফার।

ইবনে বতুতার বিবরণ বাংলার কতিপয় সামাজিক বিষয়ের উপর আলোকপাত করে। তিনি উল্লেখ করেছেন হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের লোকের উপর সুফি-দরবেশদের প্রভাবের কথা। তিনি বলেছেন যে, দেশের মুসলিম ও অমুসলিম অধিবাসীরা শেখ জালালউদ্দিনের খানকায় সমবেত হতো, দরবেশের সাক্ষাৎ গ্রহণ করত এবং তাঁর জন্য নজর-নেওয়াজ নিয়ে আসত। এই উপহার সামগ্রী দিয়েই দরগায় আগত ফকির ও মুসাফিররা জীবন ধারণ করত। সুলতানের ফরমান অনুসারে নদী পারাপারের জন্য সাধক ফকিরদের কোনো অর্থ প্রদান করতে হতো না এবং স্থানীয় জনগণের কর্তব্য নির্ধারিত ছিল ফকির দরবেশদের বিনামূল্যে খাদ্য সরবরাহ করা। রাষ্ট্রীয় নির্দেশ মতে এমন রেওয়াজ ছিল যে, কোনো ফকির দরবেশ কোনো শহরে পৌঁছলে তাকে অর্ধ দীনার ভাতা প্রদান করতে হতো।

ইবনে বতুতা শেখ জালালউদ্দিনের জীবনাচরণ ও কর্মধারার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি দরবেশের দৈহিক গঠন, বয়স, তাঁর প্রতিদিনের আহার ও পরিধেয় বস্ত্র, অভ্যাস ও জীবনধারা, তপস্যা ও কৃচ্ছ্বসাধন, আধ্যাত্মিক শক্তি ও কেরামত, তাঁর আতিথেয়তা, সাফল্য ও জনপ্রিয়তা এবং তাঁর দরগাহের পারিপার্শিক অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন।

ইবনে বতুতার বিবরণ থেকে তখন বাংলায় দাসপ্রথার প্রচলনের সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। তাঁর সাক্ষ্যমতে তখন খোলাবাজারে দাস দাসী বেচাকেনা হতো। বাজারে দ্রব্যমূল্যের তালিকা প্রসঙ্গে তিনি উল্লেখ করেছেন যে, উপপত্নী হিসেবে ব্যবহারের যোগ্য এক সুন্দরী তরুণী বাজারে তাঁর সামনে এক স্বর্ণমুদ্রায় বিক্রি হয়েছে। তিনি নিজে প্রায় অনুরূপ মূল্যে আশুরা নামীয় এক যুবতী দাসী ক্রয় করেন। সে ছিল পরমা সুন্দরী। তাঁর এক সঙ্গী তখন লুলু (মুক্তা) নামে এক সুদর্শন দাস বালককে দুই স্বর্ণ দীনারে ক্রয় করেন।

ইবনে বতুতার বর্ণনায় ঐ সময়ে বাঙ্গালার অর্থনৈতিক অবস্থার বিবরণ পাওয়া যায়। দেশে খাদ্যশস্যের প্রাচুর্য এবং দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যের সস্তা দর উল্লেখ করে তিনি বলেছেন যে, পণ্যের এমন প্রাচুর্য ও সস্তা দর তিনি পৃথিবীর আর কোথাও দেখেন নি। তিনি দেশের অভ্যন্তরে ব্যবসার প্রসার এবং বাঙ্গালার অধিবাসীদের বৈদেশিক বাণিজ্য সম্পর্কের বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি নদীতে মানুষ ও ব্যবসায়ের পণ্যবাহী অসংখ্য নৌকা চলাচল করতে দেখেছেন বলে উল্লেখ করেন, নদীর তীরে বাজারের অবস্থানের কথা বলেছেন এবং সোনারগাঁ বন্দরে যাভা অভিমুখে যাত্রার জন্য অপেক্ষমান নোঙ্গর করা একটি বৃহৎ চীনা জাহাজের উল্লেখ করেছেন। তিনি মালয় দ্বীপপুঞ্জের সঙ্গে বাঙ্গালার ধানচালের ব্যবসায়ের কথাও উল্লেখ করেন।

ইবনে বতুতা বলেছেন, নদীতে পণ্য বোঝাই প্রতিটি নৌকায় একটি করে ঢাক রাখা হতো। দু’টি পণ্য বোঝাই নৌকা রাতে পরস্পরের কাছাকাছি এলে নৌকার মাঝিমাল্লারা ঢাক পিটিয়ে পারস্পরিক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করত। নৌকায় ঢাক বাজানোর এ রীতি সম্ভবত তখন ছিল দেশীয় বাণিজ্য-তরীর পরিচয় শনাক্তকরণের একটি সংকেত এবং নদীতে সম্ভাব্য জলদস্যুতা প্রতিরোধের উপায় হিসেবে ভিনদেশী বা আগন্তক নৌকা চিহ্নিত করণের একটি কৌশল।

ইবনে বতুতার বিবরণেই আমরা বাংলার অধিবাসীদের জীবন সম্পর্কে সর্বপ্রথম প্রত্যক্ষ জ্ঞান লাভ করি। তিনি তাঁর বিবরণের তথ্য সংগ্রহ করেছেন এদেশে তাঁর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা থেকে এবং আপামর জনগণের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ যোগাযোগের মাধ্যমে। তাঁর বিবরণ সংক্ষিপ্ত হলেও তাতে বাংলার মানুষের জীবনের প্রায় সকল দিক সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। প্রকৃতির সৌন্দর্য অবলোকনে তাঁর প্রাণবন্ত অনুভূতি, সূক্ষ্ম হূদয়াবেগ এবং তাঁর সাবলীল প্রকাশভঙ্গি নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্যের বর্ণনাকে প্রাণবন্ত করে তুলেছে। ১৩৬৮ সালে তিনি মারা যান। যে মানুষটি সারাবিশ্ব ঘুরে বেড়িয়েছেন, অবশেষে তিনি স্থির হয়ে গেলেন এক জায়গায়।