ইতিহাসের পাতা থেকেঃ করুণ পরিণতি বরণ করা বিখ্যাত পাঁচ জাহাজ - প্রিয়লেখা

ইতিহাসের পাতা থেকেঃ করুণ পরিণতি বরণ করা বিখ্যাত পাঁচ জাহাজ

ahnafratul
Published: August 12, 2017

আচ্ছা, আপনার কি কখনো নাবিক হতে ইচ্ছে করে? ইচ্ছে করে সমুদ্রের বুকে চলতে থাকা অবারিত ঢেউগুলোর মাঝে নিজেকে মিশিয়ে দিতে? মাঝি মাল্লাদের সাথে একসাথে বসে পান করতে? বিপদে একসাথে বুক চিতিয়ে লড়াই করতে?
অনেকেরই কিন্তু এই ইচ্ছেটা করে। কেউ কেউ তাদের মাঝে হয়েছেন জগদ্বিখ্যাত নাবিক। তাদের জাহাজগুলো শুধু সমুদ্রের বুকেই নয়, স্থান করে নিয়েছে মানুষের হৃদয়ের মাঝেও। তবে সব কিছুর উপসংহার যেমন সুখের হয় না, ঠিক তেমন কিছু কিছু জাহাজের ভাগ্যে নেমে আসে করুণ পরিণতি। বরণ করে নিতে হয় পরাজিত হবার স্বাদ; যেমন টাইটানিক। এই জাহাজের গল্প আমাদের সকলেরই জানা। তবে আজ টাইটানিক নয় বরং আমরা আপনাদের এমন কিছু জাহাজের করুণ পরিণতির ইতিহাসের কথাই বলব, যেগুলো কালে কালে বহন করে এসেছে রোমাঞ্চকর ইতিহাস আর অতীতের সাক্ষ্যঃ

বনহোম রিচার্ডঃ

বনহোম রিচার্ড নেভাল ইতিহাসে একটি অন্যতম জাহাজ। এটি পরিচিত তার যুদ্ধের কারণে। দেশমাতৃকার কারণে এই জাহাজটি দেয়া হয়েছিল ফ্রেঞ্চদের কল্যাণে। ১৭৭৯ সালে ক্যাপ্টেন জন পলের অধীনে এই জাহাজটি ছুটে চলেছিল ১৬টি ব্রিটিশ জাহাজ উদ্ধারের জন্য। ইংল্যান্ডের দক্ষিণ উপকূলে এটি এইচএমএস সেরাপিস ও আরেকটি নেভি জাহাজের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। সময়টা ছিল সেপ্টেম্বরের ২৩ তারিখ। প্রায় ৬ ঘণ্টার রক্তক্ষয়ী ও বিপুল এক সংঘর্ষের পর জন পল তার জাহাজের সাহায্যে সেরাপিসকে কব্জা করতে সমর্থ হন।

                                                                 শিল্পীর তুলিতে বনহোম রিচার্ড ও সেরাপিসের মাঝে ভয়ানক যুদ্ধ

কিন্তু বিপুল পরিমাণে আঘাত পাওয়ার কারণে বনহোমের নিচের খোলে বেশ কিছু ফুটো হয়ে যায় এবং জাহাজে পানি উঠতে থাকে। প্রায় ৩৬ ঘন্টা জাহাজকে বাঁচানোর প্রচুর চেষ্টা করেন জন কিন্তু পারেন নি। এরপর জন তার ক্রুদের নিয়ে জাহাজটি ডুবিয়ে দেন এবং অন্য একটি জাহাজে উঠে নিজেদের প্রাণ বাঁচান।
এর পর থেকেই ব্রিটিশদের কাছে এটি অন্যতম একটি আকর্ষণের বস্তু হয়ে ওঠে। এটিকে উদ্ধার করা আর সম্ভব হয় নি কিন্তু এখনো রয়্যাল নেভি ও নেভাল আর্কিওলজি ডিপার্টমেন্ট এই জাহাজ উদ্ধার করতে দক্ষিণ উপকূলে বেশ কিছু উদ্ধারকর্ম চালাচ্ছেন।

গ্রফিনঃ
গ্রেট লেকে ভেসে পড়া প্রথম জাহাজের নাম হচ্ছে গ্রফিন। ফরাসী পর্যটক রেনে-রবার্ট ক্যাভেলিয়া এবং সিউ দে লা সালে নামক দুই ব্যক্তি দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণের সময় এই জাহাজটি তৈরি করেছিলেন। লা সালে নায়াগ্রা জলপ্রপাত, লেক ইরি, লেক হুরন ও লেক মিশিগান পাড়ি দেবার জন্য এই জাহাজটি তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ১৬৭৯ সালে জাহাজটি গ্রীন বে তে ডুবে যায়। জাহাজে ছয়জন নাবিক ছিল এবং এক কার্গো উল ছিল। ব্যবসার উদ্দেশ্যে এগুলো নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। কিন্তু গ্রফিনকে উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি।

                                                                      শিল্পীর তুলিতে গ্রফিন দেখতে যেমন

গ্রফিনকে বলা হয় “লেকের হোলি গ্রেইল”। ২০১৪ সালে একজন দাবি করেন যে তিনি গ্রফিনের ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পেয়েছেন কিন্তু পরীক্ষা করে দেখা যায় যে তার এই দাবি সত্যি নয়।

এইচএমএস এন্ডেভারঃ

                                                                                        এন্ডেভার

ক্যাপ্টেন কুক তার প্রথম সমুদ্র যাত্রাপথে যে জাহাজটিতে চড়েছিলেন তার নাম হচ্ছে এইচএমএস এন্ডেভার। এই জাহাজে করেই তিনি পৃথিবী প্রদক্ষিণ বের হয়েছিলেন। সময়টা ছিল ১৭৬৮ সাল থেকে ১৭৭১। এন্ডেভার হচ্ছে প্রথম জাহাজ যেটি অস্ট্রেলিয়ার পশ্চিম উপকূলে ভীড়ে ছিল। এছাড়াও এটি নিউজিল্যান্ডের কিছু অঞ্চলে গিয়েছিল। দেশে ফিরবার কিছু পরে এটি একটি ব্যক্তি মালিকানাধীন হয়ে যায় এবং এটির নাম হয়ে যায় লর্ড স্যান্ডউইচ।
ব্রিটিশ রয়্যাল নেভির অধীনে এটি বেশ কিছু যুদ্ধে অংশও নিয়েছিল। আমেরিকান বিপ্লবের সময় এটি সহ আরো ১৩টি জাহাজ ইচ্ছাকৃতভাবে ডুবিয়ে দেয়া হয়। রোড আইল্যান্ডের মেরিন আর্কিওলজি প্রজেক্টের একটি অন্যতম আলোচনার বিষয়বস্তু হচ্ছে এই জাহাজটি কারণ এটির ধ্বংসাবশেষ এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয় নি। অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল মেরিটাইম মিউজিয়ামের একটি দল এই অঞ্চলেই কয়েকটি জাহাজ উদ্ধার করেছে কিন্তু এদের মধ্যে কোনটি ক্যাপ্টেন কুকের হারানো সে জাহাজ, তা তারা এখনো খুঁজে পায় নি।

ইন্ডিয়ানাপোলিসঃ
১৯৪৫ সালের ৩০ জুলাই। আমেরিকান একটি বেইজে অত্যন্ত সফলতার সাথে এই জাহাজটি পারমানবিক বোমার সকল উপাদান পৌছে দিয়েছিল। কিন্তু তাহলে কি হবে? জাপানিজ সাবমেরিন I-58 তার একটি টর্পেডো আঘাতের মাধ্যমে জাহাজটি ডুবিয়ে দেয়। ৩০০ জন হতভাগ্য নাবিক নিয়ে জাহাজটি সাথে সাথেই ডুবে যায়। বাকি ৯০০ জন নাবিক একটি হাঙর সংলগ্ন সমুদ্রে অসহায়ের মত হাবুডুবু খেতে থাকে।

                                                                                     ইন্ডিয়ানাপোলিস

একটি উদ্ধারকারী জাহাজ এসে তাদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। কিন্তু ৩০০ জন নাবিক নিয়ে যে ইন্ডিয়ানাপোলিস জাহাজ ডুবে যায়, তাকে আর উদ্ধার করা কখনও সম্ভব হয় নি। এটিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার একটি রহস্য বলে স্বীকৃতি দেয়া হয়। ধারণা করা হয় যে, ইন্ডিয়ানাপোলিস সমুদ্রের প্রায় ১২,০০০ ফিট নিচে ঘুমিয়ে আছে চিরনিদ্রায়।

ক্রিস্টোফার কলাম্বাসের সান্টা মারিয়াঃ
আমেরিকার আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাসের নাম আমরা সবাই জানি। কলম্বাস তার বিশ্ব ভ্রমণ করার মিশন তিনটি জাহাজ নিয়ে শুরু করেছিলেন- নিনা, পিন্টা ও সান্টা মারিয়া। কিন্তু স্পেনে নিরাপদে মাত্র দুটি জাহাজই পৌছতে পেরেছিল।

                                                                                              সান্টা মারিয়া

১৪৯২ সালের ক্রিস্টমাসের এক রাতে সান্টা মারিয়ার নাবিক জাহাজের হাল তুলে দিয়েছিলেন এক অদক্ষ কেবিন বালকের হাতে। সে বালক অপটু হাতে জাহাজকে চালনা করে হাইতির কাছাকাছি একটি কোরাল রীফে নিয়ে যায়। জাহাজটি প্রবালের সাথে সংঘর্ষে দ্রুতই ডুবতে বসে। জাহাজে যত মাঝি ছিল তারা স্থানীয়দের সাহায্যে তীরে উঠে পরে কিন্তু জাহাজটি আর বাঁচানো যায় না। গভীর অতলে জাহাজটি ডুবে যায়। তখন থেকেই এটি একটি অনাবিষ্কৃত রহস্য হয়ে আছে। এর কারণ হচ্ছে, সান্টা মারিয়ার দেহাবশেষ আর কখনোই পাওয়া যায় নি। চালানো হয়েছে নানা উদ্ধারকাজ ও উদ্ধারদল প্রেরণ। তবুও কিছুতেই কাজ হয় নি। স্রেফ হাওয়া হয়ে গিয়েছে এই জাহাজটি।
২০১৪ সালে একটি দাবি ওঠে যে সান্টা মারিয়াকে পাওয়া গিয়েছে কিন্তু ইউনেস্কো তাদের গবেষকদের টিম প্রেরণ করে দেখে যে সেটি সান্টা মারিয়া ছিল না। ১৭শ কিংবা ১৮ শতকের একটি অন্য জাহাজ ছিল সেটি।

আজ আর নয়। ভবিষ্যতে এমনই আরো রোমাঞ্চকর সব গল্প নিয়ে হাজির হব প্রিয়লেখায়। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন।