ইতিহাসবিখ্যাত মানুষের বিখ্যাত সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ - প্রিয়লেখা

ইতিহাসবিখ্যাত মানুষের বিখ্যাত সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ

ahnafratul
Published: October 4, 2017

নিজেদের শরীরকে আমরা কে না ভালবাসি? শরীরের নানা অংশের যত্নআত্তি করতে আমাদের আপোষের কোন শেষ থাকে না। ডাক্তারের কাছে গিয়ে চেক-আপ করাই, সামান্য একটু ব্যথা অনুভূত হলেই চিন্তা করতে থাকি। সে জন্যই হয়ত প্রবাদে আছে, ‘স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল’।
আচ্ছা, চিন্তা করে দেখুন তো, পৃথিবী বিখ্যাত মানুষ যারা, তারা বিখ্যাত হয়েছেন কোন কারণে? আরো স্পষ্টভাবে বলা যায়, কেউ হয়ত তার মেধার সাহায্যে, আবার কেউ বা তার শারীরিক সক্ষমতার সাহায্যে। এই যেমন ধরুন, উসাইন বোল্ট। বিশ্ববিখ্যাত এই দৌড়বিদের যদি শারীরিক কোন অঙ্গের সক্ষমতার কথা আপনাদের জিজ্ঞাসা করা হয়, তাহলে কি জবাব দেবেন? অবশ্যই, পা। তাই নয় কি?
এমনই আরো ইতিহাসবিখ্যাত মানুষেরা রয়েছেন, যাদের শারীরিক বিভিন্ন অঙ্গের কারণে তারা হয়েছেন বিখ্যাত। এমনকি মৃত্যুর পরেও তাদের অঙ্গ নিয়ে আগ্রহের কোন কমতি ছিল না কারো। এমন কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিবর্গের শারীরিক অঙ্গ প্রত্যঙ্গের গল্প নিয়েই প্রিয়লেখার এই আয়োজনঃ

১) ক্রমওয়েলের মাথার খুলিঃ


যখন জীবিত কারো অপরাধের বিচার করা সম্ভব না হয়, তখন কখনো কখনো হয়ত একটি লাশকেই ট্রায়ালে দোষী সাব্যস্ত করে শাস্তি দেয়া হয়। রাজা দ্বিতীয় চার্লস যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, অলিভার ক্রমওয়েলের শরীর তিনি কবর থেকে উঠিয়ে ফেলেন। এই ক্রমওয়েল ছিলেন প্রথম চার্লসের হন্তারক। ক্রমওয়েলের শরীর জনসম্মুখে ঝুলিয়ে রাখা হয় এবং ওয়েস্টমিনিস্টার হলে তার কর্তিত মস্তক দর্শকদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়। তখনকার দিনে কর্তিত মস্তক এমনভাবে সংরক্ষণ করে সাজিয়ে রাখা হত, যাতে অনেকদিন মানুষ তা দেখতে পারে। এমনই কিছু একটা হয়েছিল ক্রমওয়েলের কাটা মুন্ডুর সাথে।
এটি বিখ্যাত হওয়া শুরু করে যখন থেকে একজন গার্ড ক্রমওয়েলের কাটা মুন্ডু নিয়ে পালিয়ে গেল। সে কি পেয়েছিল এর মাঝে তা আজো জানা হয় নি ইতিহাসবিদদের মাঝে। ভালো করে সংরক্ষণ করে রাখবার কারণে প্রচুর মানুষের আগ্রহের কারণ হয়ে দাঁড়ায় এই মাথাটি। পৃথিবীবিখ্যাত নানা জাদুঘর এবং বিলিয়নেয়ার চেয়েছেন এই মাথা তাদের সংরক্ষণে রাখতে। ১৯৬০ সালে এই কাটা মাথাটি কেমব্রিজের একটি পুরনো কলেজে সংরক্ষণ করে রাখা হয়, যেখানে অলিভার ক্রমওয়েল পড়াশুনা করেছিলেন। ঠিক কোন জায়গায় এটি রাখা হয়েছে, তার হদিস আজো পাওয়া যায় নি। হয়ত হতভাগ্য ব্যক্তির মাথাটি নিয়ে আর যাতে কেউ কাঁটাছেড়া করতে না পারে, তাই হয়ত!

২) আলবার্ট আইনস্টাইনের মগজঃ


স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের মগজ বিংশ শতাব্দীর সবচাইতে জনপ্রিয় প্রত্যঙ্গ, এটি বলাই বাহুল্য। মেধার অপর নাম হিসেবে খ্যাত আইনস্টাইনের মগজ তার মৃত্যুর কয়েক ঘন্টার মাঝেই বের করে সংরক্ষণ করে রাখা হয়েছিল। বিখ্যাত সকল নিউরোসায়েন্টিস্ট তাদের গবেষণার “হটকেক” হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন এই মেধাবী বিজ্ঞানীর মগজকে। কেমন করে এত বুদ্ধিমত্তার অধিকারী হয়েছিলেন স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন, এটিই ছিল তাদের কাছে প্রশ্ন। পরীক্ষাও তাদের বিফলে যায় নি। সাধারণ মানুষের চাইতে আইনস্টাইনের মগজের মাঝে কিছু তারতম্য তারা খুঁজে পেয়েছিলেন। মজার ব্যপার হচ্ছে, মগজের কিছু অংশ গবেষণার জন্য গবেষকদের কাছে গেলেও বেশিরভাগ অংশ ছিল ডাক্তারদের কাছে, যারা আইনস্টাইনের মাথা থেকে মগজ খুলে বের করে রেখেছিলেন। বিংশ শতাব্দীর পদার্থবিজ্ঞানে অসামান্য বিপ্লব সাধন করা এই মগজকে নিয়ে লেখা হয়েছে নানা বই, তৈরি করা হয়েছে অসংখ্য তথ্যচিত্র।

৩) আইনস্টাইনের চোখঃ


আমাদের আলোচনায় আবারো বিখ্যাত বিজ্ঞানী স্যার আলবার্ট আইনস্টাইন। এবার রয়েছে তার চোখ। প্রাচীন যুগে বিখ্যাত কোন পণ্ডিত ব্যক্তি মারা গেলে তার শরীরের বিভিন্ন অংশ সংরক্ষণ করে রাখা হত। সম্মান জানানোর জন্য কিংবা অনুসারীদের কাছে এগুলো ছিল পূজনীয় অর্ঘ্য। স্যার আলবার্ট আইনস্টাইনের মৃতদেহও ছিল যেন ঠিক তাই। যে ডাক্তার তার শরীর কাঁটাছেড়া করেছিলেন, তিনি আইনস্টাইনের অক্ষিগোলকদুটোও খুলে রেখে দেন। আইনস্টাইনের মগজ বিজ্ঞানীদের কাছে গবেষণা করবার জন্য ছিল গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে তার অক্ষিগোলক ঠিক কোন কারণে খুলে নেয়া হয়েছিল, ইতিহাসে এ সম্পর্কে বিস্তারিত কোন বর্ণনা নেই। হাতবদল হতে হতে আইনস্টাইনের অক্ষিগোলকদুটি এক ডাক্তারের হাতেই এসে পৌঁছে। কথিত আছে যে, তিনি নিউ ইয়র্কের এক সেফ ডিপোজিট বাক্সে সযত্নে রেখে দিয়েছেন প্রিয় বিজ্ঞানীর এই অক্ষিগোলকদুটো। যখন তার কাছে জানতে চাওয়া হয় যে কেন তিনি এই কাজ করলেন, তিনি জবাব দেন, “আমার মনে হয় আইনস্টাইন যেন আমার সাথেই আছে।”

৪) গ্যালিলিওর আঙ্গুলঃ


পৃথিবী সূর্যের চারদিকে ঘোরে- এই সত্য প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গ্যালেলিও গ্যালিলির অনেক যাতনা সহ্য করতে হয়েছিল। তাকে চার্চের আদেশে তৎকালীন সময়ে গৃহবন্দী করে রাখা হয়েছিল। মৃত্যুর পর তাকে যে কবরে রাখা হয়, সেখান থেকে তার একজন ভক্ত ডান হাতের মধ্যাঙ্গুলিটি কর্তন করে নেন। তবে এই আঙ্গুলটি বর্তমানে ফ্লোরেন্সের হিস্টোরি অব সাইন্স নামক জাদুঘরে দেখতে পাওয়া যাবে। সংরক্ষণ করে রাখা গ্যালিলিওর এই আঙ্গুল তাকে চার্চের যত ধরণের অপবাদ রয়েছে, তার থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করেছে। এমনকি চার্চ কর্তৃপক্ষ ১৯৯২ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দুঃখপ্রকাশ ও ক্ষমাপ্রার্থনা করেছিলেন।

৫) গৌতম বুদ্ধের দাঁতঃ


গৌতম বুদ্ধ ষষ্ঠ শতকে ভারতে বৌদ্ধ ধর্ম প্রতিষ্ঠা করেন। অন্যান্য নানা ধর্মগুরুদের মত, গৌতম বুদ্ধের দেহাবসানের পর তার মতানুসারীরা মৃতদেহকে সর্বোচ্চ সম্মান প্রদর্শন করেছিল। তার দেহকে চন্দনের তৈরি চিতাইয় দাহ করা হয়েছিল এবং শুধুমাত্র একটি দাঁত ছাড়া সম্পূর্ন দেহাবশেষকে দাহ করা হয়েছিল। এই দাঁতকে একটি পবিত্র অংশ হিসেবে সংরক্ষণ করে রাখে তার অনুসারীরা। গৌতম বুদ্ধের এই দাঁতটি ইতিহাসের অন্যতম দামী সম্পদ হিসেবে ধারণা করেন প্রত্নতত্ত্ববিদরা। বর্তমানে এই দাঁতটি রাখা হয়েছে শ্রীলংকার কান্ডিতে।

ইতিহাসের অন্যতম এই বিখ্যাত এই অঙ্গগুলো নিয়ে মানুষের মাঝে আগ্রহ ও জানার কোন কমতি নেই। মৃত্যুর এত বছর পরেও কেন এই অংশগুলোকে রাখা হয়েছে, তা হয়ত মানুষের কাছে প্রশ্ন থাকবে। তবে একটি উত্তর কিন্তু আমরা ধরে নিতেই পারি। আর তা হচ্ছে, বিখ্যাত এই মানুষদের হয়ত চিরতরে পৃথিবী থেকে যেতে দিতে চান নি তাদের অনুসারী, ভক্তকূল।

আজ আর নয়, থাকুন প্রিয়লেখার সাথেই। এই ফিচারটি তৈরি করতে সাহায্য নেয়া হয়েছে এই সাইটটির