আল বিরুনীঃ এক জ্ঞানসাধকের উপাখ্যান - প্রিয়লেখা

আল বিরুনীঃ এক জ্ঞানসাধকের উপাখ্যান

farzana tasnim
Published: September 10, 2017

আবু রায়হান আল বিরুনি বা আবু রায়হান মোহাম্মদ ইবনে আহমদ আল বিরুনি (৯৭৩-১০৪৮। মধ্যযুগের বিশ্বখ্যাত আরবীয় শিক্ষাবিদ ও গবেষক। অত্যন্ত মৌলিক ও গভীর চিন্তধারার অধিকারী এই মহান জ্ঞানসাধক রুশীয় তুর্কিস্তানের খিওয়ায় একটি ছোট্ট শহরে বাস করতেন। শহরটি খাওয়ারিজিমের রাজধানীর কাছে ছিল। বর্তমানে শহরটি নদীতে বিলীন হয়ে গিয়েছে। এখন এ স্থানটি আল বিরুনি শহর নামে অভিহিত। এই মহান ব্যক্তির কথাই আমরা জানব আজকে।

তিনি ছিলেন গণিত, জ্যোতিপদার্থবিদ, রসায়ন ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে পারদর্শী। তাছাড়া ভূগোলবিদ, ঐতিহাসিক, পঞ্জিকাবিদ, দার্শনিক, চিকিৎসা বিজ্ঞান, ভাষাতত্ত্ববিদ ও ধর্মতত্ত্বের নিরপেক্ষ বিশ্লেষক হিসেবেও বহুল পরিচিত তিনি। স্বাধীন চিন্তা, মুক্তবুদ্ধি, সাহসিকতা, নির্ভীক সমালোচক ও সঠিক মতামতের জন্য যুগশ্রেষ্ঠ বলে স্বীকৃত আল বিরুনী। হিজরি চতুর্থ শতাব্দীর শেষার্ধ ও পঞ্চম শতাব্দীর প্রথমার্ধকে আল বিরুনির কাল বলে উল্লেখ করা হয়।

আল বিরুনী সর্বপ্রথম প্রাচ্যের জ্ঞানবিজ্ঞান, বিশেষ করে ভারতের জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রতি মুসলিম মনীষীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। অধ্যাপক মাপা বলেন, ‘আল বিরুনী শুধু মুসলিম বিশ্বেরই নয়, বরং তিনি ছিলেন সমগ্র বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জ্ঞানী ব্যক্তিদের একজন।’ অতি সাধারণ একটি ইরানি পারিবারে ৪ঠা সেপ্টেম্বর, ৯৭৩ খ্রিস্টাব্দে জন্ম গ্রহণ করেন আল-বিরুনী। জীবনের প্রথম ২৫ বছর তিনি স্বীয় জন্মভূমিতে অতিবাহিত করেন।

তিনি গণিতশাস্ত্র, আবু নাসের ইবন আলী ইবন ইরাক জিলানী এবং তাদের মতো আরো কিছু বিদ্বান ব্যক্তির কাছে শিক্ষা গ্রহণ করেন। অধ্যয়নকালেই তিনি তার কিছু প্রাথমিক রচনা প্রকাশ করেন এবং প্রখ্যাত দার্শনিক ও চিকিৎসাশাস্ত্রজ্ঞ ইবন সিনার সাথে পত্র বিনিময় করেন।

আল বিরুনীর মাতৃভাষা ছিল খাওয়ারিজিম বা আঞ্চলিক ইরানি ভাষা। কিন্তু তিনি তার রচনাবলী আরবীতে লিখে গেছেন। আরবী ভাষায় তার অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। তিনি আরবীতে কিছু কবিতাও রচনা করেন। অবশ্য শেষের দিকে কিছু গ্রন্থ ফার্সিতে অথবা আরবী ও ফার্সি উভয় ভাষাতেই রচনা করেন। তিনি গ্রিক ভাষাও জানতেন। হিব্রু ও সিরীয় ভাষাতেও তার জ্ঞান ছিল।

তিনি ১০০৮ খ্রিস্টাব্দে নিজ দেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং শাহ আবুল হাসান আলী ইব্‌ন মামুন কর্তৃক সসম্মানে গৃহীত হন। তিনি আলী ইব্‌ন মামুনের ইন্তেকালের পর তার ভাইয়ের পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করেন এবং অনেক নাজুক রাজনৈতিক কার্যকলাপ ছাড়াও রাজকীয় দূতের কাজের দায়িত্বেও নিয়োজিত থাকেন।

মামুন তার সৈন্যবাহিনী কর্তৃক ১০১৬-১৭ খ্রিস্টাব্দে নিহিত হওয়ার পর সুলতান মাহমুদ খাওয়ারিজম দখল করে নেন। গণিতবিদ আবু নাসের মানসুর ইবন আলী ও চিকিৎসক আবুল খায়ের আল-হুসাইন ইবন বাবা আল-খাম্মার আল-বাগদাদীর সাথে গজনি চলে যান। এখানেই তার জ্ঞানচর্চার স্বর্ণযুগের সূচনা হয়। তখন থেকে তিনি গজনি শাহী দরবারে সম্ভবত রাজ জ্যোতির্বিদ হিসেবে অবস্থান করতে থাকেন। তিনি কয়েকবার সুলতান মাহমুদের সাথে উত্তর-পশ্চিম ভারতে গমন করেছিলেন।

গজনির সুলতানের পৃষ্ঠপোষকতায় তিনি ভারতে প্রায় ১২ বছর অবস্থান করেন। এখানে সংস্কৃত ভাষা শেখেন এবং হিন্দু ধর্ম, ভারতীয় সভ্যতা ও সংস্কৃতি, দেশাচার, সামাজিক প্রথা, রাতিনীতি, কুসংস্কার ইত্যাদি বিষয়ে গভীর জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি ভারতীয় কিছু আঞ্চলিক ভাষাও রপ্ত করেছিলেন। এই এক যুগের অধ্যায় ও অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান দ্বারা রচনা করেন তার বিশ্ববিখ্যাত গ্রন্থ ‘কিতাবু তারিখিল হিন্দ’। বাংলায় এ গ্রন্থটি ‘ভারত-তত্ত্ব’ নামে প্রকাশিত হয়েছে।

ইউরোপীয় পণ্ডিতদের মতে, আল বিরুনী ছিলেন স্বয়ং বিশ্বকোষ, তার প্রত্যেকটি গ্রন্থ ছিল জ্ঞানের আঁধার। ভারতীয় পণ্ডিতরা আল-বিরুনীকে বলতেন জ্ঞানের সমুদ্র। কোনো অবস্থাতেই তার এসব অমূল্য গ্রন্থের পরিচয় কম কথায় দেয়া সম্ভব নয়। আল-বিরুনীর ভারত থেকে গজনি প্রত্যাবর্তন করার কিছু দিন পর সুলতান মাহমুদ ইন্তেকাল করেন। অতঃপর পুত্র সুলতান মাসউদ ১০৩০ খ্রিস্টাব্দে সিংহাসনে আরহণ করেন। তিনি ১০৩০-১০৪১ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সিংহাসনে ছিলেন। সুলতান মাসউদ আল-বিরুনীকে খুব সম্মান করতেন। আল বিরুনী তার অনুরক্ত হয়ে সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থের নাম সুলতানের নামানুসারে রাখেন ‘কানুন মাসুউদী’ এবং তা সুলতানের নামে উৎসর্গ করেন। সুবিশাল গ্রন্থখানা সর্বমোট ১১ খণ্ডে সমাপ্ত। গ্রন্থটির গুরুত্ব উপলব্ধি করে সুলতান মাসউদ অত্যন্ত খুশি হয়ে একটি হাতির ওজনের পরিমাণ রৌপ্য বৈজ্ঞানিক আল বিরুনীকে উপহার করেন। কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে বাহিক্য সন্তোষ প্রকাশ করে সব রৌপ্যই রাজকোষে ফিরিয়ে দেন। মন্তব্য করেন, তার এত ধনসম্পদের কোনো প্রয়োজন নেই।

গ্রন্থটির প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডে জ্যোতির্বিজ্ঞান, তৃতীয় খণ্ডে ত্রিকোণমিতি। এতে দুটি তালিকা দেয়া হয়েছে। এখানে জ্যোতির্বিজ্ঞান আলোচনার সাথে ত্রিকোণমিতিকে উচ্চস্তরে উন্নীত করার প্রচেষ্টায় তিনি যে সফলতা লাভ করেছেন তা প্রশংসনীয়। মাসউদের অনুরোধে অতি সরল পদ্ধতিতে সাধারণের বোধগম্য ভাষায় দিবারাত্রির পরিমাণ বিষয়ক একটি পুস্তকও তিনি প্রণয়ন করন। চতুর্থ খণ্ডে গোলাকার জ্যোতির্বিদ্যা (Spherical Astronomy); পঞ্চম খণ্ডে চন্দ্র, সূর্যের মাপ, গ্রহ এবং দ্রাঘিমা; ছষ্ঠ খণ্ডে সূর্যের গতি-প্রকৃতি; সপ্তম খণ্ডে চন্দ্রের গতি-প্রকৃতি; অষ্টম খণ্ডে চন্দ্রের দৃশ্যমানতা ও গ্রহণ; নবম খণ্ডে স্থির নক্ষত্র; দশম খণ্ডে পাঁচটি গ্রহ নিয়ে এবং একাদশ জ্যোতিষ বিজ্ঞান নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এখানে তিনি বহু মূল্যবান তথ্য উপস্থাপন করেছেন।

আল বিরুনীর সর্বমোট ১১৩টি গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে ১০৩টি গ্রন্থ সম্পূর্ণ হয়েছে এবং ১০টি অসম্পূর্ণ গ্রন্থের উল্লেখ রয়েছে। আবু নাসের মানসুর ১২টি, আবু সাহল আ-মাসিহি ১২টি, আবু সাহল আল-মাসিহি ১২টি, আবু আলী আল-হাসন ইবন আলী আল-জিলি একটি পুস্তক তার নামে আরোপিত করে উল্লেখ করেছেন। ফলে মোট সংখ্যা দাঁড়ায় ১৩৮টি।

উপরিউক্ত রিসালায় রচনার পরে তিনি আরো কিছু গ্রন্থ রচনা করেছেন। বিভিন্ন সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য থেকে বোঝা যায় যে, তার রচিত গ্রন্থের সংখ্যা মোট ১৮০টি। এগুলো তথ্য, তত্ত্ব ও পরিসরের দিকে থেকে বিভিন্ন রকমের। কোনোটি পুস্তক, কোনোটি গবেষণামূলক পত্র আবার কোনোটি বৃহদাকার গ্রন্থ, যাতে জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার ধারণ করা হয়েছে।

আল বিরুনী ৬৩ বছর বয়সে গুরুতর রোগে আক্রান্ত হন। তার পরও তিনি ১২ বছর বেঁচেছিলেন। ১৩ই ডিসেম্বর ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি মারা যান।