আপনি কি ভুগছেন ইন্টারনেট অ্যাডিকশনেঃ জানুন ফোমো, ফোবো, নোমো - প্রিয়লেখা

আপনি কি ভুগছেন ইন্টারনেট অ্যাডিকশনেঃ জানুন ফোমো, ফোবো, নোমো

Naseeb Ur Rahman
Published: September 1, 2017

বেড়েছে প্রযুক্তির ব্যবহার। স্বাভাবিক কোন জিনিস যদি সমভাবে আশীর্বাদ হয় তবে কেউ কেউ তার অভিশপ্ত ব্যবহারও করে থাকে। পাঠক মাত্র ভাবতেই পারেন আমি কিসের কথা বলে চলেছি- আমি কোন অস্ত্রের কথা বলছি না। তবে তার অপপ্রভাব ও বড় কম নয়। বলছিলাম আধুনিক জীবনের মূল্যবান হাতিয়ার ইন্টারনেটের কথা।

চিত্রঃ সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন

সত্যি কথা বলতে তারচেয়েও বেশী আমি বলতে চাইছি সোশ্যাল সাইটের বহুল ব্যবহারের কথা। জেনে অবাক হবেন বর্তমানে মনস্তাত্ত্বিকরা ক্রমবর্ধমান সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে ভীষণ ভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছে।তারা তাদের ভাবনা  প্রকাশ করেছেন বিভিন্ন অ্যাক্রোনিম দিয়ে। বিশ্বাস করুন এই এক্রোনিমের তালিকা অনেক দীর্ঘ। প্রিয়লেখার আজকের আয়োজন এমন কিছু অ্যাক্রোনিম নিয়ে।

FOMO, FOBO, NOMO এই তিনটি অ্যাক্রোনিম আজকের বিশ্বের মনস্তাত্ত্বিকদের মাথা ব্যাথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মানুষ যখনই তাদের সোশ্যাল মিডিয়ায় নিউজ ফিড  চেক করতে পারছে না তখনই এই তিনটি ফোবিয়ার যে কোন একটিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ছে।

 

অস্ট্রেলিয়ার ‘পার্থ’ এ গবেষণা-রত সাইকোলজিস্ট মার্ণি লিসম্যান বলছেন ,” প্রতিটি কাজের ফাঁকে যখনই খানিক বিরতি মিলছে আজকাল সবাই একবার হলেও সোশ্যাল মিডিয়া মাধ্যমগুলো যেমনঃ ফেসবুক, স্ন্যাপচ্যাট এগুলোতে এক নজর ঘুরে আসছে। মনে যেন সারাক্ষন এক অজানা অস্বস্তি বোধ কাজ করছে। কিছু কি মিস করলাম, কেউ কি আমাকে মেসেজ করলো ! যখনই কোন কাজে আপনি ব্যস্ত, আপনার হাতের কাছে নেই আপনার মুঠোফোন, অথবা আপনি মোবাইল নেটওয়ার্কের বাইরে রয়েছেন আপনি মানসিক চাপের মুখে থাকছেন।আর এখন যেহেতু প্রায় সকলেই স্মার্ট ফোন ব্যবহারকারী, সকালে ঘুম থেকে উঠে বিছানা ছাড়ার আগেই সর্বপ্রথম মাথায় খেলা করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘুরে আসার প্রবল তাড়না।”

ডঃ মার্ণি লিসম্যান একান্ত সাক্ষাতকারে (ছবি নেট থেকে সংগৃহীত)

লিসম্যান আরও বলেন, সবাই আজ কম বেশী তাদের স্মার্ট গেজেট ও ডিভাইসের প্রতি অ্যাডিকটেড। তার বিপক্ষে যুক্তি হলো বন্ধুদের শুভেচ্ছা বার্তা, প্রানবন্ত ছবি, তাদের সাথে চ্যাট করা জীবনকে উজ্জীবিত করে। কিন্তু কোথাও কি কারো মনে হয় না যে না আমি আমার বন্ধুদের মত ভালো নেই, সৃষ্টি কি করে না বিষণ্ণতা?

আসলে কি এই FOMO, FOBO, NOMO চলুন তবে জেনে নেওয়া যাক–   

FOMO = Fear of Missing Out

FOBO =  Fear of Being Offline

NOMO = No Mobile

কিশোর ও যুব সম্প্রদায়ের প্রতিভা কি খুঁজে পাচ্ছে সঠিক পথঃ

জানতে চান FOMO  বা Fear of Missing Out এর পরিস্থিতি তবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করা যাক ন্যূনতম ৪৩% শতাংশ স্মার্ট ডিভাইস ব্যবহারকারী ঘুম থেকে উঠার ৫ মিনিটের মধ্যে তাদের সোশ্যাল সাইট আপডেট দেখতে অথবা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে যাকে বলা হচ্ছে Breaking News Addiction। এবার চলুন অস্ট্রেলিয়ান সাইকোলজিক্যাল সোসাইটির একটি  মানসিক চাপ এবং ভালো থাকার উপায় সম্পর্কিত সমীক্ষার ফলাফল জেনে আসি, বিষয়বস্তু ছিলো “সোশ্যাল মিডিয়ায় অনুপস্থিতির ভয়  অথবা FOMO।”

সমীক্ষায় জানা যায়-

  • প্রাপ্ত বয়স্কদের প্রতিদিন ২.৫ ঘন্টা এবং কিশোর ২.৭ ঘন্টা প্রতিদিন সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযুক্ত থাকে।
  • ৫৬% শতাংশ কিশোর-কিশোরী সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যবহারকারী, যারা দিনে পাঁচবারেরও বেশি সময় সোশ্যাল মিডিয়ায় সংযুক্ত থাকে, ২৪% শতাংশ তো এমন যারা ২৪/৭ সংযুক্ত।
  • সোশ্যাল মিডিয়ার অবিচ্ছিন্ন সংযোগে ব্যস্ত থেকে ৬০% শতাংশ মানুষ তাদের সৃজনশীলতা হারাচ্ছে, নতুন ভাবনার ক্ষমতা, বই পড়ার মত মনোযোগ নষ্ট করছে এমন কি ধীরে ধীরে তাদের মনে রাখার ক্ষমতাও হ্রাস পাচ্ছে, যাকে গবেষকরা বলছেন Brain Burnout ।
  • স্মার্টফোনে শিশুদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটছে ও নিদ্রাহীনতা বাড়ছে এই ব্যাপারে গবেষণা চলছে।

লিশম্যান উল্লেখ করেন, “এই  যে বাচ্চারা সব সময়ই মুঠোবার্তা পাচ্ছে। যে মিনিটেই মেসেজ আসবে, সেই মেসেজে প্রাপ্ত তথ্য মস্তিষ্কে প্রতিক্রিয়া ঘটাবে, হতে পারে তা প্রয়োজনীয়, হতে পারে অপ্রয়োজনীয়, হতে পারে গেম রিকোয়েস্ট। কিন্তু যে কেউ তো সঙ্গেই সঙ্গেই  মেসেজটির রিপ্লাই দিবে, তখন মস্তিস্ক উত্তেজিত আপনার শরীরে অ্যাড্রেনলিনের প্রবাহ বাড়াবে সাথে কর্টিসলও, এসবই আপনার ঘুম তাড়াবে বহুদূর। “

FOBO – মস্তিষ্ককে নতুনভাবে ভাবাচ্ছে- ফিলিপা থর্নটন, রিলেশনশিপ সাইকোলজিস্ট এর রিসার্চ অনুসারেঃ

ফিলিপা থর্নটন

সিডনি-ভিত্তিক সম্পর্কের মনস্তাত্ত্বিক ফিলিপা থর্নটন  কুইন্সল্যান্ডে অনুষ্ঠিত অস্ট্রেলিয়া-নিউজিল্যান্ডের  জাতিসংঘ সম্মেলনে অনলাইনে থাকার যে নেশাগ্রস্ততা Online Addiction সে সম্পর্কে তার রিসার্চ তুলে ধরেছিলেন। থর্নটন বলেন, ইন্টারনেট গেমিং ডিসর্ডারের মতো, সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাডিকশন এখনো “মনোবিজ্ঞান এবং সে সংক্রান্ত রেফারেন্স এর বাইবেল বলে বিখ্যাত-ডিএসএম 5 “ এর অফিসিয়াল স্বীকৃতি না পেলেও সেখানে উল্লেখিত অনেক সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারের  সাথে ইন্টারনেট অ্যাডিকশনের নির্দিষ্ট মিল খুঁজে পাওয়া যায়।তিনি আরও বলেন,-“ফোবো [অফলাইন হওয়ার ভয়] সেই সব ফোবিয়ার মতই হতে যাচ্ছে, যেখানে আচরণ গত পরিবর্তন, অভ্যাসের পুনরাবৃত্তি এবং সোশ্যাল মিডিয়া ও ইন্টারনেট থেকে প্রাপ্ত তথ্য কে বিশ্বাস করে নিজের জ্ঞান ,শিক্ষা, প্রতিভা সহ যা কেউ জন্ম থেকে পেয়ে এসেছে তা ভুলে গিয়ে ,নতুন বিশ্বাস, ধারণা নিজের মস্তিষ্কে প্রতিস্থাপন করছে । 

“এটি যে কোন অভ্যাসের থেকে আলাদা ও ঝুঁকিপূর্ণ, কারণ আমি দাঁত ব্রাশ করতে পারি, আবার দাঁত ব্রাশ করতে ভুলেও যেতে পারি, কিন্তু একজন মানুষ হিসেবে আমি যে চারপাশে কোনো আবেগ অনুভব করতে পারবো না, পড়ে রইবো ইন্টারনেট হাতে এটি কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কার্যকলাপ হতে পারে না।”

মিস থর্নটন বলেন, সম্প্রতি নোমো ফোবিয়া বা  মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কের বাইরে থাকার ভয় নিয়েও রিসার্চ করছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি বলেন “অনেক অদ্ভুত গবেষণা আছে, মনোবৈজ্ঞানিকদের কাছে এখন ফোন এবং সোশ্যাল মিডিয়া আসক্ত ব্যক্তিরা আসছে। তারা বলছে সোশ্যাল মিডিয়া ও স্মার্ট ডিভাইস তাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন করার ক্ষমতা ও অভ্যস্ততায়  হস্তক্ষেপ করছে।”

সচেতন মাতাপিতার ‘ইন্টারনেট ব্যবহারের ১০ টি আদেশ তৈরির গল্পঃ

মিসেস থর্নটন বলেছিলেন যে কোন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে মেয়ের জীবনে বাবা-মা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।তিনি বলেন সুস্থ পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখতে হলে শৃঙ্খলা ও নিয়ম নীতি থাকা আবশ্যক।

” পরিবার এমন একটি ব্যবস্থাপনা যেখানে সবার জানা উচিত কোন কাজটি ঠিক এবং কোন কাজটি ঠিক নয়, ইন্টারনেট ব্যবহারের সীমাবদ্ধতা, অনুপযুক্ত সাইটগুলিকে প্রবেশে বাধা দান এবং একটি সুন্দর পারিবারিক পরিবেশ বজায় রাখা প্রত্যেক সদস্যের নৈতিক দায়িত্ব ও তার উদ্যােগ বাবা-মা’কেই নিতে হবে এবং বাবা-মা’র সেই ক্ষমতা আছে কারণ তাদের কাছে টাকা আছে। ইন্টারনেট সংযোগের জন্য কে টাকা দিচ্ছে? রাতারাতি মোডেম চালু করুন, অ্যাকাউন্টে একটি পাসওয়ার্ড আছে যা কেবল আপনি জানেন, যতক্ষণ না আমরা সীমা বেঁধে রাখি, অপ্রাপ্তবয়স্কদের মেধা ও মনন ক্ষতিগ্রস্ত হবার আশঙ্কা রয়েই যাবে। “

নাইজেল গর্ডন ৭ থেকে ১৩ বছর বয়সী চার সন্তানের বাবা-মা। তিনি এবং তার স্ত্রী লিজ বলেন যে তারা কেবলমাত্র ১০টি টি ইন্টারনেট ব্যহারের নিয়ম রেখেছেন এবং তাদের সন্তানদের অনলাইনে প্রবেশেরর সময়সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

ছবিতে নাইজেল গর্ডনের পরিবার যার প্রতি সদস্য অনুসরন করে ইন্টারনেট ব্যবহারের নির্ধারিত নিয়ম

মিঃ গর্ডন বলেন যে, তাদের পরিবারের জন্য “গেম চেঞ্জার” ছিল যখন তার বড় দুই ছেলে মেয়ে হাতে মোবাইল ফোন পেয়েছিল। আগে শৃঙ্খলা রক্ষা করা সহজ ছিলো, শুধু টিভি দেখার সময় সীমা নির্ধারণ করলেই হতো।

“আমরা প্রথমে স্মার্ট ফোনের ব্যবহার বন্ধ করার চেষ্টা করেছি, এবং চার্লি যখন প্রথম হাই স্কুল শুরু করে তখন তার ফোন ছিল না, তবে প্রথম সপ্তাহে, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদেরকে বলে ‘আপনার হোমওয়ার্কের জন্য প্রোজেক্টের ছবি তুলতে হবে ও সবার সাথে কানেক্টেড থাকতে হবে, তখন স্মার্ট ফোন না দিয়ে কোন উপায় নেই “

মিঃ গর্ডন তাদের সন্তানদের ফোন ব্যবহার বা টিভি দেখার অনুমতি সকাল ৭:৩০টার আগে এবং সন্ধ্যা ৬ঃ০০ টা  এবং ৭:৩০ টার মধ্যে কখনোই দেন না।

“তিনি বিশ্বাস করেন সকালে সারাটি দিন কেমন কাটবে তার পরিকল্পনা করা হয়, এবং সন্ধ্যায় সারাটি দিন কেমন কাটলো তা পরিবারের সবার সাথে ভাগ করে নেওয়া উচিত, কিছুটা সময় পরিবারের সকলকে দেওয়া সবার আবশ্যিক কর্তব্য, সেখানে কোন ডিভাইসের বা নেটওয়ার্কের জায়গা নেই।”

আমরা সবাই যেন কোন কাজে ব্যস্ত না থেকেও অনেক ব্যস্তঃ

মিসেস লিশম্যান বলেন, কোন দায়িত্ববান মানুষের এত সময় নেই যে সে  প্রতিদিনের দায়িত্ব বাদ দিয়ে বৃথা সময় কাটাবে।

তিনি বলেন, ” স্বাভাবিক মানুষের  কর্মবিরতির সময় কাটানো উচিত শরীর ও মনকে বিশ্রাম দিয়ে যেন ক্লান্তি কেটে যায়, কিন্তু সে বিশ্রামের সময়টুকু আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় কাটাচ্ছি যার চাপ ব্যবহারকারীর মস্তিষ্কে পড়ছে, এটি অনেকের প্রতিদিনের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে, তা শুধু মানসিক সমস্যার সৃষ্টি করছে”।

মিসেস থর্নটন  আরও বলেন, “আজকের প্রজন্ম ইনফরমেশন ওভারলোডে রয়েছে। তাদের যেন শ্বাস নেওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় নেই এবং এই তথ্যের মহাসমুদ্রের তো কোন শেষ নেই “।

আমরা এখন প্রযুক্তি ছাড়া কোন কাজ করতে পারছি না এবং ইন্টারনেটে অনেক ভাল কিছু আছে তাতে কোন সন্দেহ নেই, কিন্তু  ভার্চুয়াল সম্পর্কগুলো যদি প্রাকৃতিক বাস্তব সম্পর্কের জায়গা নিয়ে নেয় তবে মানবিকতা বাঁচবে কি !