অ্যাসাইনমেন্ট নয়, স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলতে আসা কিশোর পারেখের গল্প - প্রিয়লেখা

অ্যাসাইনমেন্ট নয়, স্বেচ্ছায় মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলতে আসা কিশোর পারেখের গল্প

farzana tasnim
Published: November 3, 2017

কিশোর পারেখ (১৯৩০-১৯৮২) ছিলেন একজন ভারতীয় ফটোগ্রাফার। ১৯৫৬ সালে কিশোর যুক্তরাষ্ট্রে ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন ক্যালিফোর্নিয়ায় ফিল্মে ভর্তি হন। ফিল্ম নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি ঝুঁকে পড়েন ফটোগ্রাফির দিকে। লাইফ ম্যাগাজিন এবং ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ফটোগ্রাফার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত ইন্টারন্যাশনাল ফটোগ্রাফি কনটেস্টে সাতটি ক্যাটাগরির মধ্যে ছয়টিতে পুরস্কার জিতে নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন।

১৯৬১ সালে শিক্ষা শেষে মাতৃভূমিতে ফিরে এসে তিনি চেষ্টা করেন তাঁর মেধা বোম্বের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রিতে কাজে লাগাতে। কিশোরের ধারণা ছিল দেশে আসার পরপরই বোম্বে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তাকে লুফে নেবে। কিন্তু তা হয়নি। তবে ভারতের প্রভাবশালী বিড়লা পরিবার কিশোরের মেধা দেখে তাঁকে কাজের সুযোগ করে দেন। কিশোর যোগ দেন তাদের পত্রিকা দি হিন্দুস্তান টাইমসের চিফ ফটোগ্রাফার হিসেবে। এর পর ছয় বছর কিশোর কাজ করেন ফটো জার্নালিস্ট হিসেবে। বদলে দেন ইনডিয়ান প্রেস ফটোগ্রাফির চেহারা।

৬১ থেকে ৬৭ সালকে বলা হয় ইনডিয়ান প্রেস ফটেগ্রাফির স্বর্ণযুগ। কিশোর ফটো রিপোর্টের গোটা ফরম্যাটই পাল্টে দেন। ডকুমেন্টেশন বাদ দিয়ে তিনি চলে যান সাবজেক্টের গভীরে। বিহারের দূর্ভিক্ষ কভার করতে গিয়ে তিনি তাঁর মেধার পূর্নাঙ্গ প্রতিফলন ঘটান। জওহরলাল নেহেরুর জীবনের সম্ভবত সবচেয়ে প্রাঞ্জল ডকুমেন্টেশন কিশোরের ছবি। নেহেরুর মৃত্যুর পর কিশোর পারেখের প্রদর্শনী ভারতীয়দের জন্য হয়ে ওঠে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীকে শ্রদ্ধা জানানোর স্থান।

৬৭ সালের পর কিশোর পারেখ ফটো জার্নালিজম ছেড়ে দেন। চলে যান সিঙ্গাপুর ও হংকং-এ। যোগ দেন দি এশিয়া ম্যাগাজিন-এ। সেখানে তিনি এক্সক্লুসিভ কিছু ফটো সিরিজ করেন । এরপর তিনি কাজ করেন দি প্যাসিফিক ম্যাগাজিন লিমিটেড-এ। এ প্রতিষ্ঠানে তিনি ছিলেন পিকচার এডিটর।

আগামী প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে পরিচয় ঘটানোর জন্য একজন ফটোগ্রাফার যে কতটা ভূমিকা রাখতে পারে তা কিশোর পারেখ এবং তাঁর ফটোগ্রাফ দেখলে সহজেই অনুমেয় হয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সম্মুখ সমর নয়, বরং সাধারণ মানুষের মুক্তিযুদ্ধে সম্পৃক্ততা এবং এতে তাদের অংশগ্রহণ, ত্যাগ ও প্রাপ্তির বিষয়টি যে ফটোগ্রাফার ক্যামেরায় ধারণ করে আমাদের উপহার দিয়ে গেছেন তিনি কিশোর পারেখ।

মুক্তিযুদ্ধের সময় বিশ্বের নানা দেশের নামী-দামী পত্র-পত্রিকার সাংবাদিক ও ফটো সাংবাদিক অ্যাসাইনমেন্ট নিয়ে বাংলাদেশে এসেছিলেন। এদের মধ্যে পারেখ ছিলেন ব্যতিক্রম। অফিসিয়াল কোনো অ্যাসাইনমেন্ট নয়, আর্থিক কোনো লাভ নয়, স্রেফ একটি যুদ্ধকে ইতিহাসের অংশ করে রাখার জন্যই কিশোর স্বেচ্ছায় বাংলাদেশে এসে যুদ্ধ আক্রান্ত এ দেশের মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময়ে কিশোর যখন ট্রাভেল এবং ফ্যাশন ফটোগ্রাফিতে ব্যস্ত, তখনই হুট করে সিদ্ধান্ত নেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসবেন। দ্রুত ৪০ রোল ফিল্ম জোগাড় করে তিনি ভারতে চলে আসেন। কিছুটা জোর করেই তিনি ৮ ডিসেম্বর ঢুকে পড়েন প্রেস হেলিকপ্টারে। কিশোর পারেখ ১৬ তারিখ বিজয় অর্জন পর্যন্ত বাংলাদেশে ছিলেন। মাত্র ৮ দিনে তাঁর তোলা ৬৭টি ছবি মুক্তিযুদ্ধের এক অসামান্য দলিল হয়ে আছে। এ ছবিগুলো অবলম্বন করে পরে তিনি ‘বাংলাদেশ: এ ব্রুটাল বার্থ’ নামে একটি ফটোগ্রাফি বই প্রকাশ করেন।

কিশোর পাকিস্তান আর্মির সরাসরি যুদ্ধ ক্ষেত্রের ছবি তুলেছিলেন। ঢাকায় অবস্থানকালীন সময় তাঁর পক্ষে একজন সিভিলিয়ান হয়ে সরাসরি যুদ্ধ ক্ষেত্রের ছবি তোলা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। তাই তিনি পাকিস্তান আর্মির পোশাক জোগাড় করে ঐতিহাসিক কাজগুলো সাহসিকতার সাথে সম্পন্ন করেছিলেন। এর জন্য তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরাও পড়েন। পড়ে অবশ্য বোঝাতে সক্ষম হন, তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং ফটো সাংবাদিক।

তার স্ত্রী সরোজ পারেখ তার স্মৃতিতে উল্লেখ করেছেন:

” ১৯৬৭ সালে হিন্দুস্তান টাইমসের চাকরি পরিত্যাগ করার পর কিশোর স্বপরিবারে হংকং চলে আসেন এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তারা হংকং এ অবস্থান করছিলেন। তিনি সমুদ্র সৈকতে ছবি আকতে পছন্দ করতেন। উপমহাদেশ যখন অগ্নিবলয়ে এবং যুদ্ধ কবলিত, এমতাবস্থায় বিবেকের তাড়নায় সিদ্ধান্ত নিলেন ভারত হয়ে বাংলাদেশে যেয়ে পুরো যুদ্ধটাকে ছবির মাধ্যমে কভার করার। ঢাকায় অবস্থানকালীন সময় তার পক্ষে একজন সিভিলিয়ান হয়ে সরাসরি যুদ্ধ ক্ষেত্রের ছবি তোলা খুব কঠিন ব্যাপার ছিল। তাই তিনি পাকিস্তান আর্মির পোশাক জোগাড় করে ঐতিহাসিক কাজগুলো সাহসিকতার সাথে সম্পন্ন করেছিলেন। এর জন্য তিনি ভারতীয় সেনাবাহিনীর হাতে ধরাও পড়েন। পড়ে অবশ্য বোঝাতে সক্ষম হন, তিনি ভারতীয় নাগরিক এবং ফটো সাংবাদিক। কোনো চাকুরিগত বাধ্যবাধকতা নয়, আর্থিক কোনো লাভ নয়, স্রেফ একটি যুদ্ধকে ইতিহাসের অংশ করে রাখার জন্যেই চলে আসেন যুদ্ধ আক্রান্ত এ দেশে।”

মুক্তিযুদ্ধের পর কিশোর ফিরে যান কমার্শিয়াল ফটোগ্রাফির পেশায়। ১৯৮২ সালে মাত্র ৫২ বছর বয়সে হিমালয় পবর্তে ছবি তোলার সময় হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এ অসামান্য প্রতিভাসম্পন্ন শিল্পী।